ঢাকা/ফরিদপুর — ফরিদপুর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কর্মী ও আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তর মৃত্যুর ঘটনায় ১১ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি।
তদন্তে প্রান্তকে আটক করার প্রক্রিয়া, তার বিরুদ্ধে মাদক মামলা দায়ের, হেফাজতে মারধর এবং অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার কথিত দর-কষাকষিতে গুরুতর অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযুক্তদের মধ্যে তৎকালীন ফরিদপুর ডিবির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও রয়েছেন।
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট জানান, তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশ পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “অভ্যন্তরীণ তদন্তে ওসিসহ ডিবির ১১ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা শুরু এবং তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।”
এই তদন্তের ফলাফল প্রান্তকে আটকের পর পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক বক্তব্যের সঙ্গে গুরুতর অসামঞ্জস্য তুলে ধরেছে। গত ২০ জুন ডিবি পুলিশ দাবি করেছিল, প্রান্তকে ১০০ গ্রাম গাঁজাসহ আটক করা হয় এবং হেফাজতে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর পরদিন সকালে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
কিন্তু পরবর্তী তদন্তে ভিডিও ফুটেজ, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং প্রান্তর পরিবারের সদস্যদের জবানবন্দি পর্যালোচনা করে তদন্তকারীরা তার কাছে মাদক থাকার কোনো প্রমাণ পাননি। বরং অভিযানে অংশ নেওয়া ১১ পুলিশ সদস্যের প্রত্যেকের কোনো না কোনো ধরনের দায় রয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এদিকে ঘটনাটি এখন উচ্চ আদালতেও গড়িয়েছে। ৪ আগস্ট হাইকোর্ট এক রুলে জানতে চেয়েছেন, ডিবি হেফাজতে প্রান্তর মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে কেন পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের করা একটি রিট আবেদনের পর আদালত এ রুল জারি করেন।
১১ পুলিশ সদস্যের সবারই দায় পেয়েছে তদন্ত কমিটি
ফরিদপুর জেলা পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্তে বলা হয়েছে, যে ডিবি দলটি প্রান্তকে আটক করেছিল, সেই দলের প্রত্যেক সদস্যই কোনো না কোনোভাবে ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী দ্য ভয়েসকে বলেন, “ওই অভিযানে যারা অংশ নিয়েছিলেন, তারা কোনো না কোনোভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। সবারই কিছু না কিছু সংশ্লিষ্টতা ছিল। কার কতটুকু দায়, তা নির্ধারণ এবং সে অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিভাগীয় মামলার সুপারিশ করা হয়েছে।”
যে ১১ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, তারা হলেন—তৎকালীন ফরিদপুর ডিবির পরিদর্শক ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন, উপপরিদর্শক মো. আহাদুজ্জামান ও মোতাহার আলী, সহকারী উপপরিদর্শক মো. হাজিকুল ইসলাম, কনস্টেবল আবু সুফিয়ান, রাকিব মোল্লা, মনিরুজ্জামান, মো. রাকিবুল ইসলাম রিন্টু, ফরহাদ হোসেন মিয়া ও চম্পা হালদার এবং গাড়িচালক মো. সবুজ মোল্লা।
প্রান্তর মৃত্যু নিয়ে বিতর্কের পর এর আগেই ওই ১১ জনকে ফরিদপুর পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছিল।
তবে বিভাগীয় মামলা একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে কারও ফৌজদারি অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হয় না। বিভাগীয় প্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা নিজেদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাবেন। অন্যদিকে তাদের কোনো ফৌজদারি দায় থাকলে তা পৃথক তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হতে হবে।
বিকেলে আটক, পরদিন সকালে মৃত্যু
প্রান্তর বয়স ছিল ২৭ বছর। তিনি ফরিদপুর ল কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে ফরিদপুর সুগার মিলে কাজ করতেন। তার বাড়ি মধুখালী পৌরসভার পশ্চিম গন্ধারদিয়া এলাকায়।
২০ জুন বিকেল প্রায় ৫টার দিকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে বাড়ির কাছ থেকে ফরিদপুর গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা তাকে আটক করেন।
এর ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে, ২১ জুন সকালে ডিবি হেফাজতে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
প্রান্তর পরিবারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই অভিযোগ করা হয়েছিল, তাকে হেফাজতে নির্যাতন করা হয়েছে। পুলিশ প্রথমে এ অভিযোগ অস্বীকার করে।
তৎকালীন ডিবি ওসি আলমগীর হোসেন প্রান্তর মৃত্যুর পর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তাকে গাঁজাসহ আটক করা হয়েছিল এবং ২১ জুন ভোরে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার পর ফজরের নামাজের পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে প্রান্তকে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে সকাল ৮টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
তবে পরবর্তী সময়ে ভিডিও ফুটেজ এবং পুলিশের নিজস্ব তদন্তেই এই বক্তব্যের বিভিন্ন অংশ প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
মাদক মামলার বর্ণনার সঙ্গে ভিডিওর মিল নেই
প্রান্ত মারা যাওয়ার দিন, ২১ জুন, ডিবির উপপরিদর্শক আহাদুজ্জামান বাদী হয়ে মধুখালী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা করেন।
এজাহারে বলা হয়, রাত প্রায় ২টার দিকে পুলিশ প্রান্তর বাড়িতে যায়। পুলিশ দেখে তিনি পালানোর চেষ্টা করেন এবং পরে দুই সাক্ষীর উপস্থিতিতে তাকে আটক করা হয়।
মামলার বর্ণনা অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদের সময় প্রান্ত নিজের কাছে গাঁজা থাকার কথা স্বীকার করেন এবং নিজেই তার পরনের প্যান্টের ডান পকেট থেকে পলিথিনে মোড়ানো ১০০ গ্রাম গাঁজা বের করে দেন।
কিন্তু আটকের একটি ভিডিও ফুটেজ ওই বর্ণনার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ভিডিওতে দেখা যায়, প্রান্তকে রাত ২টায় নয়, দিনের আলোয় আটক করা হচ্ছে। ভিডিওতে তার পরনে প্যান্ট নয়, লুঙ্গি দেখা যায়। ভিডিও সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তল্লাশির সময় ডিবি সদস্যদের প্রান্তর মাথায় আঘাত করতে দেখা যায়।
একপর্যায়ে একজন পুলিশ সদস্য প্রান্তকে যেখানে তল্লাশি করা হচ্ছিল, সেখান থেকে কয়েক ফুট দূরে মাটিতে থাকা একটি বস্তুর দিকে ইঙ্গিত করেন।
তদন্ত কমিটি প্রান্তর কাছে মাদক থাকার কোনো প্রমাণ পায়নি।
তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির একজন সদস্য দ্য ভয়েসকে বলেন, “মাদক মামলাটি মিথ্যা ছিল, কারণ তদন্তে আমরা তার কাছে কোনো মাদক থাকার প্রমাণ পাইনি।”
একই কর্মকর্তা জানান, প্রান্তকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তার পরিবারের সঙ্গে অর্থ নিয়ে দর-কষাকষি হয়েছিল—এমন প্রমাণও তদন্তে পাওয়া গেছে।
সাক্ষীরা ঘটনাস্থলেই ছিলেন না
পুলিশের মাদক মামলায় কথিত মাদক উদ্ধারের সাক্ষী হিসেবে দুই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। তারা হলেন মো. আলমগীর হোসেন ও বিনয় সাহা।
কিন্তু তদন্তে তারা জানান, কথিত মাদক উদ্ধারের সময় তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই দুই ব্যক্তি দাবি করেন, পরে তাদের ভয় দেখিয়ে বা বিভ্রান্ত করে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল।
এতে মাদক মামলায় পুলিশের দাবি আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কারণ মামলার এজাহারে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, দুই সাক্ষীর উপস্থিতিতেই প্রান্তকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তার কাছ থেকে গাঁজা উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী অবশ্য তদন্তে পাওয়া প্রতিটি অসঙ্গতি নিয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত বক্তব্য দিতে চাননি। আটকের সময়, কথিত মাদক উদ্ধার, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং পরিবারের কাছ থেকে অর্থ দাবির অভিযোগ—এসব বিষয়ে পৃথকভাবে বিস্তারিত মন্তব্য করা থেকে তিনি বিরত থেকেছেন।
ছেলেকে ছাড়াতে এক লাখ টাকা নিয়ে গিয়েছিলেন মা
প্রান্তর মা খাদিজা আক্তারের অভিযোগ, তার ছেলে আটক হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ডিবি পুলিশের অর্থ নিয়ে দর-কষাকষি হয়েছিল।
তিনি জানান, তাদের আত্মীয় সোহেল মুন্সী ডিবি সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে প্রথমে বলা হয়, ৬৫ হাজার টাকা দিলে প্রান্তকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
পরে পুলিশ প্রান্তর রাজনৈতিক পরিচয় জানতে পেরে টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে এক লাখ টাকা দাবি করে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ঘটনার পর জুন মাসে সাংবাদিকদের খাদিজা বলেন, “আমি সকালে এক লাখ টাকা নিয়ে ফরিদপুরে যাই। পরে শুনি, আমার ছেলেকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালে গিয়ে দেখি আমার ছেলের লাশ। আমাদের সামনে থেকে জীবিত ছেলেকে নিয়ে গেল, পরে আমি তার লাশ পেলাম।”
পরবর্তী সময়ে পুলিশ তদন্ত কমিটির কাছেও তিনি একই অভিযোগ করেন বলে জানা গেছে।
অভ্যন্তরীণ তদন্তে প্রান্তর পরিবার ও পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অর্থ নিয়ে আলোচনা বা দর-কষাকষির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে প্রকাশিত তদন্ত-তথ্যে ওই অর্থ শেষ পর্যন্ত পুলিশকে দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করা হয়নি।
হেফাজতে মারধরের প্রমাণ
পুলিশের তদন্তে প্রান্তকে ডিবি হেফাজতে শারীরিকভাবে মারধর করার প্রমাণও পাওয়া গেছে।
তবে তদন্তকারীরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি যে ওই মারধরই একমাত্র তার মৃত্যুর কারণ ছিল।
তদন্ত কমিটির একজন সদস্য দ্য ভয়েসকে বলেন, “তাকে মারধর করা হয়েছিল, কিন্তু শুধু মারধরের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে—এটা আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না।”
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কারণে সৃষ্ট স্ট্রোককে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তকারীরা বিবেচনায় নিয়েছেন যে মারধর, আটক থাকা, মিথ্যা মাদক মামলার অভিযোগ এবং অর্থ নিয়ে দর-কষাকষির চাপ—সব মিলিয়ে প্রান্ত তীব্র শারীরিক বা মানসিক চাপের মধ্যে পড়েছিলেন কি না। তবে ঠিক কোন ধারাবাহিকতায় এসব ঘটনা তার মৃত্যুর কারণ হয়েছে, তা তারা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করতে পারেননি।
অর্থাৎ, তদন্তে অসদাচরণ, হেফাজতে মারধর এবং মাদক মামলার অভিযোগের অসত্যতা পাওয়া গেলেও প্রান্তর মৃত্যু শুধু শারীরিক নির্যাতনের কারণেই হয়েছে—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি কমিটি।
এক মাসের তদন্ত
প্রান্তর মৃত্যুর পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে ২২ জুন ফরিদপুর জেলা পুলিশ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে।
কমিটির প্রধান ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ফাতেমা ইসলাম। অন্য দুই সদস্য ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশনস) মো. শামসুল আজম এবং তৎকালীন জেলা বিশেষ শাখার ওসি মোশাররফ হোসেন।
কমিটিকে প্রথমে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তদন্ত শেষ হতে এক মাসেরও বেশি সময় লাগে। ২৭ জুলাই কমিটি ফরিদপুরের পুলিশ সুপারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।
ফাতেমা ইসলাম দ্য ভয়েসকে বলেন, “আমরা তদন্ত শেষ করেছি এবং পুলিশ সুপারের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।”
পরবর্তী সময়ে ১১ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশসহ প্রতিবেদনটি পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়।
প্রান্ত নিহত হওয়ায় মধুখালীতে বিক্ষোভ
প্রান্তর মৃত্যুর পর তার নিজ এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
২২ জুন তার মরদেহ পশ্চিম গন্ধারদিয়ায় নেওয়া হলে শত শত মানুষ, যাদের মধ্যে অনেক নারীও ছিলেন, বিচার দাবিতে প্রায় ৪০ মিনিট ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করেন।
প্রান্তর জানাজায় স্থানীয় বিএনপি নেতারাও অংশ নেন।
সেদিন বিকেলে মধুখালী কেন্দ্রীয় ঈদগাহে জানাজাপূর্ব সমাবেশে মধুখালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ প্রান্তর মৃত্যুকে “হত্যা” বলে আখ্যা দেন এবং জবাবদিহি দাবি করেন।
তিনি বলেন, “কেউ কোনো অপরাধে জড়িত থাকলে আইনি প্রক্রিয়ায় তার বিচার হওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই একজন অভিযুক্তকে পিটিয়ে হত্যা করা গ্রহণযোগ্য নয়।”
অন্যদিকে ফরিদপুর ছাত্রলীগ প্রান্তকে সংগঠনের একজন নিবেদিত কর্মী হিসেবে উল্লেখ করে। যদিও ঘটনার পর প্রকাশিত কয়েকটি প্রাথমিক স্বাধীন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সে সময় তার রাজনৈতিক পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ কেন নয়?
প্রান্তর হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাটি এখন পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলামূলক প্রক্রিয়ার বাইরেও বিচারিক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
হাইকোর্ট সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চেয়েছেন, প্রান্তর পরিবারকে কেন পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের করা রিট আবেদনের পর এ রুল জারি করা হয়। সংস্থাটি প্রান্তর মৃত্যুর বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং তার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আবেদন করেছে।
রিটের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেওয়া আইনজীবী মো. শাহিনুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, আইনসচিবসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলেছেন আদালত।
তিনি বলেন, “মির্জা ইশতিয়াকের পরিবারকে পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রশ্নে আদালত রুল জারি করেছেন।”
তবে হাইকোর্টের এই রুলের অর্থ এখনই পরিবারকে পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে—এমন নয়। বরং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যাখ্যা করতে হবে, কেন শেষ পর্যন্ত এমন নির্দেশ দেওয়া হবে না।
হেফাজতে নির্যাতন রোধে আইন
প্রান্তর মৃত্যু বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন প্রতিরোধের আইনি কাঠামোকেও নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
২০১৩ সালে বাংলাদেশে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন প্রণয়ন করা হয়। এই আইনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন এবং নির্যাতনের ফলে মৃত্যুর জন্য ফৌজদারি শাস্তির বিধান রয়েছে।
তবে এ আইনে মামলা ও দণ্ডের নজির তুলনামূলকভাবে বিরল।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, আইনটি কার্যকর হওয়ার সাত বছর পর ২০২০ সালে প্রথমবারের মতো এ আইনে কারও দণ্ড হয়।
সেই মামলাটি ছিল ২০১৪ সালে ঢাকার পল্লবী থানায় নির্যাতনের পর ইশতিয়াক হোসেন জনির মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে। ওই মামলায় বিচারিক আদালত পুলিশ সদস্যদের দোষী সাব্যস্ত করেন। পরে ২০২৫ সালের আগস্টে হাইকোর্ট দুই পুলিশ কর্মকর্তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও বাংলাদেশে হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে কার্যকর প্রতিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। ২০২৪ সালের জুনে এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছিল, জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদ অনুমোদন এবং ২০১৩ সালের আইন থাকার পরও বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনার জবাবদিহি সীমিত।
বিভাগীয় ব্যবস্থা কি যথেষ্ট?
প্রান্তর ঘটনায় পুলিশের নিজস্ব তদন্তের সুপারিশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করেছে—যে অভিযানে তাকে আটক করা হয়েছিল, সেখানে গুরুতর অনিয়ম ঘটেছিল বলে পুলিশ কর্তৃপক্ষ নিজেই স্বীকার করছে।
তদন্তে বলা হয়েছে, প্রান্তকে মারধর করা হয়েছিল, তার কাছে মাদক থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তাকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে পরিবারের সঙ্গে অর্থ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল এবং অভিযানে অংশ নেওয়া ১১ পুলিশ সদস্যের প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো পর্যায়ে দায় রয়েছে।
তবে শুধু বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে ঘটনাটির সব আইনি প্রশ্নের নিষ্পত্তি হবে না।
তদন্তের ফলাফল থেকে কথিত মিথ্যা মামলা, প্রমাণ সাজানোর অভিযোগ, অর্থ দাবি, হেফাজতে মারধর এবং শেষ পর্যন্ত প্রান্তর মৃত্যুর জন্য সম্ভাব্য ফৌজদারি দায়—এসব নিয়ে পৃথক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র বিচার বিভাগীয় তদন্ত চাওয়ায় হাইকোর্টের মামলাটিও ঘটনাটির ওপর আরও বিস্তৃত বিচারিক নজরদারির সুযোগ তৈরি করতে পারে।
প্রান্তর পরিবারের জন্য ঘটনাটি শুরু হয়েছিল ২০ জুন, যখন বাড়ির কাছ থেকে একজন ২৭ বছর বয়সী তরুণকে জীবিত অবস্থায় পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। এক দিনেরও কম সময় পরে তার মা হাসপাতালে গিয়ে ছেলের মরদেহ দেখতে পান।
ঘটনার ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় পর পুলিশের নিজস্ব তদন্ত এখন বলছে, অভিযানে জড়িত ১১ সদস্যের সবার বিরুদ্ধেই বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তবে এই তদন্তের পর ফৌজদারি মামলা হবে কি না, প্রান্তর পরিবার ক্ষতিপূরণ পাবে কি না এবং তার মৃত্যুর ঘটনায় বৃহত্তর জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কি না—তা এখন নির্ভর করছে পুলিশ সদর দপ্তর, আদালত এবং ভবিষ্যতে হওয়া যেকোনো স্বাধীন বা বিচারিক তদন্তের ওপর।


