সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | DeKalb |
| DeKalb
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

শুভ জন্মদিন শেখ হাসিনা: দ্য লিডার অব ট্রাস্ট

- ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১২ পূর্বাহ্ন

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬। আজ শেখ হাসিনার  জন্মদিন। আশিতে রাখলেন পা। অথচ এই জন্মদিনে তিনি বাংলাদেশে নেই। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। সময় বদলেছে, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল পাল্টেছে, ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে; কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার নামটি এখনও আগের মতোই উচ্চারিত হয়—কখনও গভীর আবেগে, কখনও তীব্র বিতর্কে, আবার কখনও ফিরে আসার প্রত্যাশা ও আশঙ্কার সমান্তরাল আলোচনায়।

যাঁরা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক নেতৃত্বে আস্থা রেখেছেন, তাঁদের কাছে শেখ হাসিনা এখনও “Leader of Trust”—আস্থার নেতা। তাঁদের চোখে তাঁর দীর্ঘ শাসনকাল মানেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, অবকাঠামোগত রূপান্তর, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থার সম্প্রসারণ, সামাজিক উন্নয়ন এবং জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দৃঢ় রাষ্ট্রীয় অবস্থান।

কিন্তু ২০২৬-এর বাংলাদেশ সেই বাংলাদেশ নয়, যে বাংলাদেশে তিনি দীর্ঘদিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪-এর অভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী সরকার, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশ নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। নির্বাচনের পর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি এবং  ইউনুস সরকার গায়ের জোরে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ রয়েছে।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতার মধ্যেই শেখ হাসিনা রয়েছেন ভারতের মাটিতে। কিন্তু তাঁর কণ্ঠ থেমে নেই। ২০২৬ সালে তিনি একাধিকবার দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরে আইনের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতির কথাও বলেছেন। অর্থাৎ, নির্বাসনের জীবনকে তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায় হিসেবে দেখছেন না।

তাঁর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনও উত্তপ্ত ও বিভক্ত। শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন; তিনি বিচারপ্রক্রিয়া ও রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাতেও বিভিন্ন সাজা হয়েছে। অন্যদিকে তাঁর সমর্থকেরা এসবকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে দেখছেন। ফলে তাঁর দেশে ফেরা এখন শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনীতি, বিচার, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন।

কিন্তু আজকের শেখ হাসিনাকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৮১ সালের সেই বিকেলে।

মে মাসের এক মায়াময় বিকেল। দীর্ঘক্ষণ আকাশে চক্কর দেওয়ার পর ভারতীয় এয়ারলাইন্সের একটি বিমান দিল্লি ও কলকাতা হয়ে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানবন্দরের রানওয়েতে অবতরণ করল। বিমান থেকে নামলেন শেখ হাসিনা—বুকে গভীর শোক, চোখে অশ্রুর স্মৃতি, আর মনে এক কঠিন অঙ্গীকার।

তিনি ফিরেছিলেন এমন এক দেশে, যে দেশ তখনও বহন করছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত ক্ষত। তাঁর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হারিয়ে তিনি তখন একা। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত শোককে তিনি ধীরে ধীরে রূপ দিলেন রাজনৈতিক অঙ্গীকারে।

কুর্মিটোলা থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত জনস্রোত নেমেছিল ঢাকার রাজপথে। হাজার হাজার মানুষ ছুটে এসেছিল তাঁদের নেত্রীকে একবার চোখের দেখা দেখতে। সেই প্রত্যাবর্তন ছিল শুধু বঙ্গবন্ধুকন্যার দেশে ফেরার ঘটনা নয়; ছিল একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা।

এর কয়েক মাস আগেই, ১৯৮১ সালের ১৪ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতেই দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছিল। ১৭ মে দেশে ফিরে তিনি যে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করেছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক নেত্রীতে পরিণত করে।

সেই যাত্রা ছিল কখনও মসৃণ নয়। ছিল ঝড়, রক্ত, ষড়যন্ত্র, আন্দোলন, নির্বাচনী সংঘাত, প্রাণনাশের চেষ্টা এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতা। কিন্তু প্রতিটি ধাক্কার পর তিনি আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলাই তাঁর সমর্থকদের কাছে শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় পরিচয়—প্রতিকূলতার মধ্যেও অটল থাকার ক্ষমতা।

তাঁর দীর্ঘ শাসনামলের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত রূপান্তরের একটি বড় অধ্যায়ও জড়িয়ে আছে।

পদ্মা সেতু, ঢাকা মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র—একটির পর একটি বড় প্রকল্প বাংলাদেশের উন্নয়ন-আখ্যানের দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পদ্মা সেতু তাঁর সরকারের আত্মবিশ্বাস ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে সমর্থকদের কাছে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ, ভিশন ২০২১, ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ এবং ভিশন ২০৪১—এসব পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে একটি অধিক সমৃদ্ধ, প্রযুক্তিনির্ভর ও সক্ষম রাষ্ট্রে পরিণত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছিল।

শেখ হাসিনার সময়ের অর্থনৈতিক গল্পটিও তাই একমাত্রিক নয়। একদিকে দারিদ্র্য হ্রাস, তৈরি পোশাক রপ্তানি, প্রবাসী আয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো সম্প্রসারণ বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছে। অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগের স্থবিরতা, রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা এবং মূল্যস্ফীতিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে এখন।

২০২৬-এর বাংলাদেশে সেই অর্থনৈতিক বাস্তবতা আরও সুস্পষ্ট।

আইএমএফের হিসাবে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ২০২৩ অর্থবছরের ৫.৮ শতাংশ থেকে ২০২৪-এ ৪.২ শতাংশ এবং ২০২৫-এ ৩.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২৬ অর্থবছরে ৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস থাকলেও মূল্যস্ফীতি ৮.৯ শতাংশের মতো উচ্চ পর্যায়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের চাপ, দুর্বল রাজস্ব আহরণ ও বিনিয়োগের মন্থরতা অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েনি; আবার আগের উচ্চ প্রবৃদ্ধির গতিতেও নেই। দেশ এখন এক কঠিন পুনর্গঠন ও সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আইএমএফের জুলাই ২০২৬-এর মূল্যায়নেও মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব, ব্যাংকিং খাত ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপের কথা বলা হয়েছে।

এই অর্থনৈতিক বাস্তবতাই শেখ হাসিনার উত্তরাধিকারের বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। তাঁর সমর্থকদের কাছে তাঁর সময়ের বাংলাদেশ ছিল উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও বড় স্বপ্ন বাস্তবায়নের বাংলাদেশ। তাঁর সমালোচকেরা একই সময়ের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন, মানবাধিকার এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শেখ হাসিনার মূল্যায়ন তাই শুধু উন্নয়নের পরিসংখ্যান দিয়ে যেমন সম্পূর্ণ হবে না, তেমনি শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক দিয়েও নয়।

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর সরকারের অবস্থানও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জঙ্গিবাদ দমনে কঠোর রাষ্ট্রীয় নীতি গ্রহণের ফলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক পর্যায়ে সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে একটি দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছিল। একই সময়ে মানবাধিকার সংগঠন ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে গুরুতর অভিযোগও তুলেছে। ফলে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে বুঝতে হলে উন্নয়ন ও বিতর্ক—দুই বাস্তবতাকেই পাশাপাশি দেখতে হয়।

এখন কেমন  আছে রাজনৈতিক বাংলাদেশ?

২০২৬ সালের নির্বাচনের পর দেশে নতুন সরকার এসেছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে; আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক পরিসরের বাইরে। এই নতুন বাস্তবতায় শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করেও বাংলাদেশের রাজনীতির আলোচনায় রয়ে গেছেন। তাঁর দেশে ফেরার ঘোষণা, তাঁর বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক—সবকিছুই যেন একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।

শেখ হাসিনা নিজেও বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি অনির্দিষ্টকাল দেশের বাইরে থাকতে চান না। দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার, কারাবাস কিংবা আইনি পরিণতি—এসবের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতির কথাও তিনি বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

তাঁর প্রত্যাবর্তন কবে, কীভাবে এবং কোন রাজনৈতিক ও আইনি বাস্তবতায় হবে—তা এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: শারীরিকভাবে বাংলাদেশ থেকে দূরে থাকলেও শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপস্থিতি এখনও অদৃশ্য হয়নি।

বরং ভারতের নির্বাসন থেকে তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে অনিশ্চিত অধ্যায়ের মুখোমুখি।

যাঁরা তাঁকে “Leader of Trust” বলে মনে করেন, তাঁদের কাছে তাঁর অনুপস্থিতি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতি নয়। তাঁদের কাছে এটি এমন এক নেত্রীর অনুপস্থিতি, যাঁকে ঘিরে একটি প্রজন্ম বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্বপ্ন দেখেছে, রাজনৈতিক আস্থা তৈরি করেছে এবং উন্নয়নের একটি নির্দিষ্ট ধারাকে প্রত্যক্ষ করেছে।

১৯৮১-এর সেই তরুণী শেখ হাসিনা আজ ৭৯ বছরে। কুর্মিটোলার রানওয়ে থেকে শুরু করে গণভবন, পদ্মা সেতু থেকে ভিশন ২০৪১, ক্ষমতার শীর্ষ থেকে ভারতের নির্বাসন—তাঁর রাজনৈতিক জীবন যেন আধুনিক বাংলাদেশেরই এক দীর্ঘ, নাটকীয় ও বিতর্কময় কাহিনি।

আজ তাঁর জন্মদিনে তাই শুধু একজন নেত্রীর বয়সের আরেকটি বছর পূর্ণ হওয়ার কথা নয়; মনে পড়ছে তাঁর ফিরে আসার সেই বিকেল, তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, তাঁর সাফল্য, তাঁর বিতর্ক, তাঁর উত্তরাধিকার এবং তাঁর অসমাপ্ত রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষার কথাও।

বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ হাসিনার অধ্যায় শেষ হয়েছে কি না—তার উত্তর আজই দেওয়া সম্ভব নয়।

কারণ ইতিহাসের কিছু চরিত্র ক্ষমতা থেকে সরে গেলেও ইতিহাস থেকে সরে যান না।  শেখ হাসিনা তেমনই এক চরিত্র।

শুভ জন্মদিন, শেখ হাসিনা।

আপনার রাজনৈতিক যাত্রা আধুনিক বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে যে, আপনাকে ঘিরে বিতর্ক, ভালোবাসা, বিরোধিতা কিংবা প্রত্যাশা—কোনোটিই সহজে শেষ হওয়ার নয়।

মন্তব্য

Scroll to Top