শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | Columbus |
| Columbus
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

কারাবন্দী সাংবাদিকদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের দাবি সাংবাদিক ফ্রন্টের

- ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩৫ পূর্বাহ্ন

কারাবন্দী সাংবাদিকদের অবিলম্বে মুক্তি, তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার এবং চাকরিচ্যুত সাংবাদিকদের পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্ট। সংগঠনটির অভিযোগ, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর যে দমন-পীড়ন শুরু হয়েছে, তা বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলেও অব্যাহত রয়েছে।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকালে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে এসব দাবি জানানো হয়।

মানববন্ধনে সাংবাদিক নেতারা অভিযোগ করেন, গত দুই বছরে সারা দেশে অন্তত ৫২ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪৪৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে এবং পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অন্তত ১১৮ জন সাংবাদিক শারীরিক হামলা ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন।

সংগঠনটির দাবি, এই সময়ে ১৫ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। শত শত সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন। অনেকের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে। সাংবাদিকদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা এবং ব্যাংক হিসাব জব্দের ঘটনাও ঘটেছে।

নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্টের আহ্বায়ক আকতার হোসেনের সভাপতিত্বে মানববন্ধন সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সদস্যসচিব শেখ জামাল।

দুই বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে চার সাংবাদিক

মানববন্ধনে সাংবাদিক শাকিল আহমেদ, ফারজানা রূপা, শ্যামল দত্ত ও মোজাম্মেল বাবুর দীর্ঘ কারাবাস নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বক্তারা।

তাঁরা জানান, ২০২৪ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে এই চার সাংবাদিক কারাগারে রয়েছেন।

দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁদের মুক্তি মেলেনি। দীর্ঘ কারাবাসে তাঁদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন সাংবাদিক নেতারা।

বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন কারাবন্দী সাংবাদিকদের পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের সন্তানদের জীবন ও ভবিষ্যৎও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সংগঠনটির অভিযোগ, একাধিক হত্যা মামলায় শত শত আসামির সঙ্গে এই সাংবাদিকদের নাম যুক্ত করা হয়েছে। অথচ এসব মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। এরপরও বারবার তাঁদের জামিনের আবেদন নাকচ করা হচ্ছে।

বক্তারা আরও জানান, শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।

তাঁদের দাবি, এসব অভিযোগের ভিত্তি হিসেবে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের সংবাদ পরিবেশন, সম্প্রচার এবং পেশাগত কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।

সাংবাদিক নেতারা বলেন, পেশাগত সাংবাদিকতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

ইউনূস সরকারের শুরু করা দমন-পীড়ন বিএনপি সরকারও চালাচ্ছে

মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের আগস্টে মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মুক্তমনা মানুষের পাশাপাশি সাংবাদিকদেরও দমন-পীড়নের লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে ইউনূস প্রশাসন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, শারীরিক হামলা, চাকরিচ্যুতি ও পেশাগত হয়রানির পথ তৈরি করে।

বক্তারা অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। শত শত সাংবাদিককে হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন মামলায় আসামি করা হয়েছে। অনেকের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন।

এমনকি সাংবাদিক হত্যার ঘটনায়ও ইউনূস সরকারের মদদ ছিল বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।

সাংবাদিক নেতারা বলেন, ইউনূস সরকার যে দমন-পীড়নের ধারা তৈরি করে গেছে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারও তা অব্যাহত রেখেছে।

৫২ সাংবাদিক গ্রেপ্তার, অনেকেই এখনো কারাগারে

নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্টের সদস্যসচিব শেখ জামাল বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে সারা দেশে ৫২ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এখনো কারাগারে রয়েছেন।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি শাহরিয়ার কবীর, মোজাম্মেল বাবু, শ্যামল দত্ত, শাকিল আহমেদ, ফারজানা রূপা, শেখ জামাল, মঞ্জুরুল আলম পান্না, আনিস আলমগীর, শেখ ইমন আহমেদ ও গাজী তুষার আহমেদের নাম উল্লেখ করেন।

শেখ জামাল বলেন, সাংবাদিক গাজী তুষার আহমেদ ও শেখ ইমন আহমেদের গ্রেপ্তার এবং তাঁদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা সাংবাদিক সমাজের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

নেত্রকোনায় সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানান তিনি।

একই সঙ্গে এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান শেখ জামাল।

১৫ সাংবাদিক হত্যার অভিযোগ, হামলার শিকার ১১৮ জন

শেখ জামাল অভিযোগ করেন, গত দুই বছরে দেশে ১৫ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে।

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি মেহেদী হাসান, শাকিল হোসেন, তাহির জামান, এটিএম তুরাব, প্রদীপ কুমার ভৌমিক, সোহেল আখঞ্জি, আজাহার আলী ও লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের নাম উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় অন্তত ১১৮ জন সাংবাদিক শারীরিক হেনস্তা ও হামলার শিকার হয়েছেন।

হামলার শিকার সাংবাদিকদের মধ্যে সুমন্ত চক্রবর্তী, মেহেদী মামুন, আব্দুর রহমান, প্রবীর দাস, শ্যামল নন্দী, মেহেরুল সুজন ও মাহফুজুর রহমান শিশিরের নাম উল্লেখ করেন তিনি।

এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান সাংবাদিক নেতারা।

৪৪৬ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা

মানববন্ধনে শেখ জামাল অভিযোগ করেন, জাতীয় দৈনিক ও টেলিভিশন চ্যানেলের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকসহ সারা দেশে ৪৪৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে।

এসব মামলা এখনো বহাল রয়েছে বলে জানান তিনি।

তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক, টেলিভিশন চ্যানেলের বার্তাপ্রধান, সাংবাদিক এবং দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদদাতাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় পদ দখল করার অভিযোগও করেন তিনি।

শেখ জামাল বলেন, বিটিভি, একাত্তর টিভি, সময় টিভি, ডিবিসি, গান বাংলা, এটিএন নিউজ, এটিএন বাংলা, মাইটিভি, বিজয় টিভি ও নিউজ২৪-এর মতো টেলিভিশন প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, আমাদের অর্থনীতি, আমাদের নতুন সময়, দৈনিক মুখপাত্র, কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ডেইলি সান, বাংলানিউজ, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

৭০০ সাংবাদিকের প্রেসক্লাব সদস্যপদ বাতিল বা স্থগিত

সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার সংকুচিত করার অভিযোগও তুলে ধরেন নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্টের নেতারা।

শেখ জামাল বলেন, নজিরবিহীনভাবে সাংবাদিকদের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে।

জাতীয় প্রেসক্লাবসহ দেশের বিভিন্ন প্রেসক্লাবের প্রায় ৭০০ সাংবাদিকের সদস্যপদ স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

এসব সিদ্ধান্ত এখনো বহাল রয়েছে বলে জানান সংগঠনটির সদস্যসচিব।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, অর্ধশতাধিক সাংবাদিকের দেশত্যাগে বেআইনিভাবে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ৪৭ জন সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাব বেআইনিভাবে জব্দ করে রাখা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা এবং ব্যাংক হিসাব জব্দের সিদ্ধান্তগুলো এখনো কার্যকর রয়েছে।

কারাবন্দীদের মুক্তি ও চাকরিচ্যুতদের পুনর্বহালের দাবি

মানববন্ধন থেকে কারাবন্দী সাংবাদিকদের অবিলম্বে মুক্তি এবং তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।

একই সঙ্গে চাকরিচ্যুত সাংবাদিকদের পুনর্বহাল, বাতিল করা অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড ও প্রেসক্লাবের সদস্যপদ পুনর্বহাল এবং সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা।

সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার দাবিও জানায় সংগঠনটি।

মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্টের যুগ্ম আহ্বায়ক জাকির হোসেন ইমন, সদস্য সাজেদা হক, এ কে এম ওবায়দুর রহমান, রাগেবুল রেজা, ওয়ারেছুন্নবী খন্দকার, নাঈমুর রহমান স্বপন, হাসনাত শাহিন, রহিমা খানম, শফিউর রহমান, মাজেদুল ইসলাম পাপেল, সুজিত সজীব ও রমজান আলীসহ অন্যরা।

মন্তব্য

Scroll to Top