মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬ | Moscow |
| Moscow
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

৯ গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবি করে হাসিনাসহ ৭৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা, তদন্তে মিলল না ঘটনার সত্যতা

- ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৪৬ অপরাহ্ন

কথিত জুলাই আন্দোলনের সময় শরীরে নয়টি গুলি লেগে আহত হওয়ার দাবি করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৭৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন নূর হোসেন নামে এক যুবক। তবে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবির পক্ষে কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। এমনকি চিকিৎসার জন্য জমা দেওয়া কাগজপত্রও ভুয়া বলে প্রমাণ পেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

তদন্ত শেষে শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ। গত ২৯ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) উক্যমং রাখাইন এ প্রতিবেদন দাখিল করেন।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, বাদী ভুয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট ব্যবহার করে মামলা করেছেন। আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
মামলার আট আসামিকে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও তারা এ মামলায় গ্রেপ্তার হননি বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। তারা আগে থেকেই অন্য মামলায় কারাগারে ছিলেন। পরে এ মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হলে আদালত তা মঞ্জুর করেন।

বাদীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, জানতে চাইলে এসআই উক্যমং রাখাইন বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আদালত চাইলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেন।

২৭ বছর বয়সি নূর হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

এদিকে গত বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।

প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মিজানুর রহমান জানান, আদালত চূড়ান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বাদীর প্রতি নোটিশ জারির আদেশ দিয়েছেন। আগামী ১ ডিসেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।

যাদের অব্যাহতির সুপারিশ

এ মামলায় অব্যাহতির সুপারিশ করা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদ, সাবেক সহসভাপতি সলিম উল্লাহ পাটোয়ারী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সলিমুল্লাহ সলু, মিলন হোসেন এবং মহিলা লীগ নেত্রী ইসরাত জাহান তামান্না ও স্বপ্না খন্দকার।

চিকিৎসার কাগজপত্রে একাধিক অসংগতি

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নূর হোসেন মামলার এজাহারের সঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেওয়ার কিছু কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন। তবে তদন্তে দেখা যায়, ওই হাসপাতালে তিনি কোনো চিকিৎসকের কাছেই চিকিৎসা নেননি।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, জমা দেওয়া কাগজপত্রগুলো হাসপাতালের প্রকৃত নথি নয়। এর পক্ষে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি পাওয়া গেছে।

প্রথমত, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা কম্পিউটারে টাইপ করা ব্যবস্থাপত্র দেন না; তারা হাতে লিখে ব্যবস্থাপত্র তৈরি করেন। অথচ মামলায় জমা দেওয়া কাগজপত্র ছিল কম্পিউটারে টাইপ করা।

দ্বিতীয়ত, নূর হোসেনের জমা দেওয়া কাগজে থাকা ক্যাশ মেমো নম্বর যাচাই করে দেখা যায়, ওই নম্বরে ৫৪ বছর বয়সি আব্দুস সাত্তার নামে একজন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। অন্যদিকে, ব্যবহৃত আইডি নম্বরের বিপরীতে ৩২ বছর বয়সি জুয়েল নামে আরেকজন রোগীর তথ্য পাওয়া যায়।

এ ছাড়া জুলাই অভ্যুত্থান-২০২৪-এ আহত ব্যক্তিদের সরকারি গেজেটেও নূর হোসেনের নাম পাওয়া যায়নি।

এসব তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত কর্মকর্তা মনে করেন, নূর হোসেন প্রকৃতপক্ষে আহত হননি। বরং আহত হওয়ার একটি মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে তিনি মামলাটি করেছেন। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অভিযোগ মিথ্যা বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ আইনজীবীদের

মামলার আসামি মিলন হোসেনের আইনজীবী এ এইচ এম হাসিবুজ্জামান হাসিব বলেন, রাজনৈতিক চাপ ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের মামলা করা হয়েছে। এতে অনেক নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং কারাবরণ করেছেন।

তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন তারাও। এ আন্দোলনে সংঘটিত অপরাধের বিচার চান তারা। তবে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি নিরপরাধ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যদিকে, আইনজীবী জান্নাতুল বর্ণা সুমির ওকালতনামা ব্যবহার করে মামলাটি করা হয়েছিল। তিনি বলেন, অনেক সময় সিনিয়র আইনজীবীরা মামলায় জুনিয়রদের ওকালতনামা ব্যবহার করেন। জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মামলা বাণিজ্য হয়নি—এমন কথা বলা যাবে না। তবে তিনি নিজে এসবের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।

তিনি আরও বলেন, অনেক সময় মক্কেলরা আইনজীবীদের কাছে প্রকৃত ঘটনা গোপন করেন বা সত্য কথা বলেন না।

মামলার এজাহারে যা বলা হয়েছিল

মামলার এজাহারে নূর হোসেন দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে তিনি মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন ময়ূর ভিলা এলাকায় আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।

এ সময় আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ ও গুলি চালানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি অনুযায়ী, পিঠে ছয়টি, বাম পায়ের হাঁটুর ওপর দুটি এবং ডান পায়ের হাঁটুর পাশে একটি গুলি লাগে।

গুলিতে আহত হয়ে রাস্তায় পড়ে গেলে আসামিরা তাকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলেও আসামিদের ভয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এসব অভিযোগে হত্যাচেষ্টার মামলা হিসেবে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর শেখ হাসিনাসহ ৭৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন নূর হোসেন।

তবে পুলিশের তদন্তে বাদীর আহত হওয়ার দাবি ও চিকিৎসাসংক্রান্ত নথির সত্যতা না পাওয়ায় মামলাটির অভিযোগ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এখন আদালতের পরবর্তী শুনানিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন এবং বাদীর বক্তব্যের ভিত্তিতে মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।

মন্তব্য

Scroll to Top