মুন্সিগঞ্জে গলাকাটা অবস্থায় চার বছরের এক শিশুর মরদেহ উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা পর হাসপাতালে মারা গেছেন তার বাবা। আগের রাতে দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন তিনি। জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে বাবা ও মেয়ের ওপর এই হামলা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছে পুলিশ।
নিহত দুজন হলেন সিরাজদিখান উপজেলার রামকৃষ্ণদী গ্রামের গোলাপ হোসেন (৩২) ও তাঁর মেয়ে তাওবা (৪)।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল ৯টার দিকে একটি ইটভাটার কাছে কাশবনের ভেতর থেকে শিশুটির গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে বেলা দেড়টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান গোলাপ।
এ ঘটনায় জমিসংক্রান্ত বিরোধে জড়িত সোহরাব হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পুলিশ। অন্য সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
বাড়ি ফেরার পথে বাবা-মেয়ের ওপর হামলা
পুলিশ ও স্বজনদের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে মেয়ে তাওবাকে নিয়ে রামকৃষ্ণদী গ্রামে নিজের বাবার বাড়িতে যান গোলাপ।
এশার নামাজের পর মেয়েকে নিয়ে একই ইউনিয়নে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা হন তিনি। পথে একটি ইটভাটার কাছে তাঁদের গতিরোধ করে একদল দুর্বৃত্ত। পরিবারের অভিযোগ, হামলাকারীরা সোহরাব হোসেনের সহযোগী।
হামলায় গুরুতর আহত হন গোলাপ। এ সময় মেয়ে তাওবা তাঁর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আহত অবস্থায় কোনোভাবে বাড়ি ফিরতে সক্ষম হন গোলাপ। কিন্তু তাওবার আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।
স্বজনেরা প্রথমে গোলাপকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে তাঁকে কেরানীগঞ্জের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এদিকে সারা রাত খোঁজাখুঁজি করেও তাওবার সন্ধান পায়নি পরিবার। পরদিন সকালে স্থানীয় লোকজন ইটভাটার কাছে কাশবনের মধ্যে শিশুটির মরদেহ দেখতে পান। তার গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল।
অন্যদিকে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে গোলাপের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে আবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর তাঁর মৃত্যু হয়।
হামলার বিষয়ে তদন্তকারীরা আরও একটি বিবরণ পেয়েছেন। ওই বিবরণ অনুযায়ী, রামকৃষ্ণদী বাজারে চা পান করার পর পাথরঘাটা গ্রামের কাছে কয়েকজন মুখোশধারী ব্যক্তি বাবা-মেয়ের পথরোধ করে। তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে গোলাপকে আঘাত করে এবং তাঁর মেয়েকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়।
গোলাপকে জোর করে বিষজাতীয় কিছু খাওয়ানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে। তাঁর চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিতে শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি এমন অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে অভিযোগটির সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মৃত্যুর আগে কেরানীগঞ্জের বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গোলাপের সঙ্গে কথা বলেছিল পুলিশ। হামলার সুনির্দিষ্ট সময় এবং ওই দিন বাবা-মেয়ের চলাচলের কিছু বিবরণ নিয়ে প্রকাশিত তথ্যে অমিল রয়েছে।
দীর্ঘদিনের জমিবিরোধ
গোলাপ হোসেন ছিলেন লতব্দী ইউনিয়নের রামকৃষ্ণদী গ্রামের জয়নাল আবেদিনের ছেলে। পেশায় দিনমজুর গোলাপ বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে তিনি একই ইউনিয়নের দোসরপাড়া এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন। গোলাপ তাঁর মামাতো বোনকে বিয়ে করেছিলেন। ফলে তাঁর নানাবাড়ি ও শ্বশুরবাড়ি একই জায়গায়।
গোলাপের মামাদের সঙ্গে সোহরাব হোসেনের পরিবারের দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে উভয় পক্ষ আদালতে মামলা করেছে। বিরোধের জেরে এর আগেও একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
গোলাপের মা হাসু বেগম অভিযোগ করেন, সোহরাব ও তাঁর সহযোগীরা তাঁর ভাইদের জমি দখল করেছেন। এ নিয়ে মামলা করায় পরিবারের সদস্যদের বারবার হুমকি ও মারধর করা হয়েছে।
তাঁর দাবি, জমিবিরোধের কারণে গোলাপকে আগেও কয়েকবার মারধর করা হয়েছিল। এমনকি তাঁকেও একাধিকবার হামলার চেষ্টা করা হয়েছে।
সামান্য জমির জন্য সোহরাব ও তাঁর সহযোগীরা ছেলে ও নাতনিকে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ করেন হাসু বেগম। তিনি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।
তবে সোহরাব ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
একজন আটক, অন্যদের খুঁজছে পুলিশ
মুন্সিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরান হাসান জানান, প্রাথমিকভাবে জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে বাবা-মেয়ের ওপর হামলা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মৃত্যুর আগে গোলাপ হামলায় জড়িত হিসেবে সোহরাবসহ কয়েকজনের নাম জানিয়েছিলেন।
এরপর সোহরাবকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ। অন্য সন্দেহভাজনদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। পুলিশ হেফাজতে থাকায় অভিযোগের বিষয়ে সোহরাবের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তদন্তকারীরা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি ও যোগাযোগের তথ্য যাচাই করছেন। পাশাপাশি দুই পরিবারের জমিসংক্রান্ত মামলা এবং আগের সংঘর্ষের ঘটনাগুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিরোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন এর আগে কারাভোগ করেছেন বলেও জানা গেছে।
শিশু তাওবার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। গোলাপের মরদেহেরও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
হামলার পর গোলাপ কীভাবে দুর্বৃত্তদের হাত থেকে ফিরে এলেন, তাঁর মেয়ে কোথায় ছিল এবং পরদিন সকালে কীভাবে শিশুটির মরদেহ পাওয়া গেল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করার প্রস্তুতি চলছিল। সিরাজদিখান থানা-পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক দল জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কাজ করছে।
তবে হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং ঘটনায় জড়িত সবার পরিচয় এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।

মন্তব্য