বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | Ashburn |
| Ashburn
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

তুরাগ নদে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট (অব.) তাহসিফ সাউরির মরদেহ

- ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৪ পূর্বাহ্ন

রাজধানীর তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মরদেহ উদ্ধার করেছে নৌ পুলিশ। নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর বুধবার (২৮ অক্টোবর) তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়। অল্প বয়সে সাবেক এই সামরিক কর্মকর্তার মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মরদেহ বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে রাজধানীর উত্তরখান এলাকার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায়।

তাঁর মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। তাঁকে হত্যা করা হয়েছে বলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা সামরিক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো তথ্য নিশ্চিত করা হয়নি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উড়োজাহাজে করে দেশত্যাগের একটি ভিডিওর সঙ্গে তাহসিফের নাম জড়িয়ে থাকায় তাঁর মৃত্যু বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।

তবে ওই ভিডিও ধারণ বা ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে তাহসিফের সংশ্লিষ্টতা স্বাধীনভাবে তদন্ত করে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ভিডিওটির সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর কোনো সম্পর্কও এখন পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি।

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় পুলিশ

মাত্র ২৮ বছর বয়সে বিমানবাহিনীর সাবেক এই কর্মকর্তার মৃত্যু ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও নানা সন্দেহ তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ পরিকল্পিত হত্যা কিংবা গুমের আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। তবে তদন্তকারীরা এখন পর্যন্ত এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেননি।

নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন দ্য ভয়েসকে বলেন, ‘তাঁর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে উত্তরখান থানার ডিউটি অফিসার শাহীনুর জামান মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, বুধবার বিকেলে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা তুরাগ নদ থেকে সাবেক ওই বিমানবাহিনী কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধার করেন। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত উত্তরখান থানায় এ ঘটনায় কোনো অভিযোগ দায়ের হয়নি। প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেবে নৌ পুলিশ।

‘আমার ভাইকে মার্ডার করা হয়েছে, কী দোষ ছিল তার?’

তাহসিফ সাউরিকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর খালাতো বোন মোশফেকা জাহান। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও শেয়ার করার কারণে তাঁকে দীর্ঘদিন মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল বলেও দাবি করেছেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে মোশফেকা অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও শেয়ার করার পর থেকে তাহসিফকে দিনের পর দিন মানসিক চাপে রাখা হয়েছিল। বিমানবাহিনী থেকে অবসরে পাঠানোর পরও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা তাঁকে নিয়মিত অনুসরণ করতেন। বিষয়টি তাহসিফ নিজেই তাঁকে জানিয়েছিলেন বলে দাবি করেন মোশফেকা।

ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমার ভাইকে মার্ডার করা হয়েছে, কী দোষ ছিল তার? হাসিনার পালানো ভিডিও শেয়ার করা? যেটি তিনি নিজেও ধারণ করেননি, নাগরিক হিসেবে শেয়ার করেছেন। তার কলিগদের কেউ করেছেন।’

তিনি আরও লেখেন, ‘অবসরে দেওয়া হয়েছে, দিনের পর দিন মানসিক যন্ত্রণা দেওয়ার পরও তাদের শান্তি হয়নি। মেরেই ফেলতে হলো তাকে।’

তাহসিফের মৃত্যুর জন্য যাঁদের দায়ী মনে করছেন, তাঁদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে মোশফেকা প্রশ্ন তোলেন, দেশপ্রেমিক হওয়ার কারণেই কি তাঁর ভাইকে এমন পরিণতির শিকার হতে হয়েছে?

তিনি আরও অভিযোগ করেন, সুস্থ অবস্থায় তাহসিফকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনে তাঁর খালার রাজপথে অংশ নেওয়ার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন মোশফেকা। তিনি প্রশ্ন করেন, তাঁর খালার অপরাধ কী ছিল যে তাঁকে এমন দুর্ভোগের শিকার হতে হলো?

মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে পরিচয় শনাক্ত

টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন জানান, বুধবার বিকেলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়।

উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে ভাসমান অবস্থায় মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের সময় তাঁর পরিচয় জানা যায়নি।

প্রাথমিক সুরতহাল পরীক্ষার সময় পুলিশ দেখতে পায়, মরদেহের পরনে ছিল সাদা পায়জামা ও কালো জামা। হাতে একটি ঘড়ি ছিল। পকেট থেকে একটি আইফোনও উদ্ধার করা হয়।

ওই মোবাইল ফোনের তথ্যের সূত্র ধরে পুলিশ তাঁর পরিচয় শনাক্ত করে। তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি।

তাহসিফের বাবার নাম কে এম এনায়েতুর। তিনি পরিবারের সঙ্গে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের ১৪/বি নম্বর সড়কে বসবাস করতেন।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাত থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন বলে জানা গেছে।

মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ঘিরে প্রশ্ন

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সময় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে এর আগেও আলোচনায় এসেছিল তাহসিফ সাউরির নাম।

ভিডিওটিতে গণ-আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কুর্মিটোলা বিমানবন্দর এলাকা থেকে উড়োজাহাজে করে বাংলাদেশ ছাড়তে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক আলোচনায় দাবি ওঠে, তাহসিফ নিজেই ভিডিওটি ধারণ করেছিলেন অথবা সেটি প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তবে এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। তিনি নিজে ভিডিওটি ধারণ করেছিলেন, নাকি অন্য কারও ধারণ করা ভিডিও ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সরকার পরিবর্তনের পর তাহসিফ বাংলাদেশ বিমানবাহিনী থেকে অবসরে যান। বিভিন্ন সূত্রে তাঁর এই অবসরকে বাধ্যতামূলক অবসর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৫ সালের ৪ আগস্ট আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে জানায়, তাহসিফকে প্রাতিষ্ঠানিক বিধিবিধান অনুযায়ী ভিন্ন পরিস্থিতিতে অবসরে পাঠানো হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল না বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

তবে তাঁর অবসরের সঙ্গে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিওর কোনো সম্পর্ক ছিল বলে সামরিক কর্তৃপক্ষের ওই বিবৃতিতে নিশ্চিত করা হয়নি।

তাহসিফের মৃত্যুর পর ভিডিওটি নতুন করে আলোচনায় আসায় তাঁর সামরিক চাকরি, অবসর এবং নিখোঁজ হওয়ার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক পুলিশ এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি।

দেশের নদ-নদী থেকে শত শত মরদেহ উদ্ধার

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশের বিভিন্ন নদ-নদী ও জলাশয় থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগ রয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশের বিভিন্ন নদীতে মরদেহ পাওয়ার ঘটনা বারবার আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত নৌ পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে ৯৭১টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

এসব মরদেহের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের পাশাপাশি দুর্ঘটনাজনিত পানিতে ডুবে মৃত্যু এবং আত্মহত্যার ঘটনাও রয়েছে।

নৌ পুলিশের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, অপরাধের আলামত গোপন এবং গ্রেপ্তার এড়াতে অপরাধীরা কখনো কখনো হত্যার পর মরদেহ নদী বা জলাশয়ে ফেলে দেয়।

দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে মরদেহে পচন ধরলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ক্ষেত্রেও এমন কিছু ঘটেছে বলে এখন পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি।

তদন্তকারীদের সামনে এখন প্রধান প্রশ্ন, বিমানবাহিনীর সাবেক এই কর্মকর্তার মৃত্যু কীভাবে হলো, তাঁকে সর্বশেষ কোথায় দেখা গিয়েছিল এবং মঙ্গলবার নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে বুধবার বিকেলে মরদেহ উদ্ধার পর্যন্ত কী ঘটেছিল।

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে তাঁর মৃত্যু পানিতে ডুবে, শারীরিক আঘাতে নাকি অন্য কোনো কারণে হয়েছে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাবিষয়ক তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মন্তব্য

Scroll to Top