বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | Boydton |
| Boydton
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

যশোরে হোটেলে আগুন দিয়ে ২৪ হত্যা: ৭ আ.লীগ নেতার বিরুদ্ধে প্রমাণ নেই

- ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪১ অপরাহ্ন

যশোরের জাবির ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে লুটপাট ও ভয়াবহ অগ্নিসংযোগে ২৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় আওয়ামী লীগের সাত নেতা-কর্মীর সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পায়নি পুলিশ। দীর্ঘ তদন্ত শেষে তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন জানিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন যশোর শহরে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদারের মালিকানাধীন হোটেলটিতে লুটপাটের পর আগুন দেওয়া হয়। নিহতদের মধ্যে একজন ইন্দোনেশীয় নাগরিকসহ হোটেলের কর্মী ও অতিথিরা ছিলেন।

সমসাময়িক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলাকারীরা হোটেলটিতে আগুন দেওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও প্রথম দিকে আন্দোলনকারী সন্ত্রাসীদের বাধার কারণে উদ্ধার ও আগুন নেভানোর কাজ শুরু করতে পারেননি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও যশোর কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী বাবুল হোসেন দীর্ঘ তদন্ত শেষে সম্প্রতি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন।

বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বিভিন্ন সময়ে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার সাতজনের বিরুদ্ধে ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ কারণে তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত দেবেন আদালত।

অব্যাহতি প্রাপ্ত সাতজন হলেন মো. আব্দুল খালেক (৬৫), মো. এনামুল হক (৫৯), আব্দুর রহমান শাওন (৩৬), আইনজীবী সৈয়দ কবির হোসেন জনি (৪১), এস এম আজহার হোসেন স্বপন (৫২), কাজী রবিউল হোসেন ওরফে ভাইপো রবিউল (৩১) ও মো. ইমন কাজী (২৬)।

পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং সাক্ষীদের বক্তব্য পর্যালোচনা করেও হোটেলে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় দেশজুড়ে সহিংসতার মধ্যে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কোনো স্থাপনায় সংঘটিত সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটি ছিল জাবির ইন্টারন্যাশনাল হোটেলের ঘটনা।

শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের বাড়িঘর, দলীয় কার্যালয় ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বহু আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও সমর্থক মারধর ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। আন্দোলনকারীদের হামলায় বহু পুলিশ সদস্যও নিহত হন।

যশোর শহরের চিত্রা মোড়ে এম এম আলী রোডে অবস্থিত পাঁচ তারকা মানের আবাসিক হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালের মালিক যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদার।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, ৫ আগস্ট বেলা ৩টার দিকে অজ্ঞাত হামলাকারীরা গানপাউডার ও পেট্রোল নিয়ে হোটেলে প্রবেশ করে। প্রথমে ক্যাশ ভল্ট ভেঙে ৯০ লাখ টাকা লুট করা হয়। এরপর হোটেলের বিভিন্ন মূল্যবান সরঞ্জাম ও মালামাল নিয়ে যাওয়া হয়।

লুট হওয়া সামগ্রীর মধ্যে প্রায় ১০০টি ফ্রিজ, ১০০টি স্মার্ট টেলিভিশন, দুটি বড় জেনারেটর, আসবাবপত্র ও স্টোরের মালামাল, ট্রান্সফরমার ও সাবস্টেশনের সরঞ্জাম, প্রেসার পাম্প, সাইবার স্টেশনের সরঞ্জাম এবং অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম ছিল বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।

এরপর হামলাকারীরা হোটেলটিতে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। আগুন বহুতল ভবনটিতে ছড়িয়ে পড়লে ২৪ জনের মৃত্যু হয়।

নিহতদের মধ্যে একজন ইন্দোনেশীয় নাগরিক ছিলেন। হোটেলের কর্মী ও সেখানে অবস্থানরত অতিথিরাও নিহত হন। অন্তত আরও ২৩ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা সে সময় জানিয়েছিলেন, ঘটনাস্থলে থাকা জনতার বাধার কারণে তারা প্রথম দিকে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করতে পারেননি। পরে হোটেলের বিভিন্ন তলা থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতদের অনেকের মৃত্যু ধোঁয়ায় শ্বাসরোধে হয়েছিল বলে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছিল।

ঘটনার পর প্রকাশিত প্রতিবেদনে আন্দোলনকারী বা জনতার একটি অংশের বিরুদ্ধে হোটেলে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কথা বলা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্থানীয় একজন সমন্বয়কও প্রকাশ্যে বিষয়টি স্বীকার করেন।

আগুন থেকে বাঁচতে হোটেল থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা কয়েকজনকে বাইরে মারধর এবং এ ঘটনায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। তবে সে সময় ফায়ার সার্ভিসের ভাষ্য ও অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে হামলাকারীদের জনতা, আন্দোলনকারী, অজ্ঞাত অগ্নিসংযোগকারী বা হামলাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

ঘটনার ১৩ দিন পর, ১৮ আগস্ট শাহীন চাকলাদারের চাচাতো ভাই ও যশোর সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান তৌহিদ চাকলাদার ফন্টু বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ২০০ জনকে আসামি করা হয়।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, হোটেলের আলমারিতে রাখা শাহীন চাকলাদারের বিভিন্ন কোম্পানির মূল্যবান কাগজপত্র, আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, তিনটি লিফট, জানালার গ্রিল ও কাচের দরজার সাজসজ্জাসহ বিপুল সম্পদ আগুনে পুড়ে যায়। মূল ভবনেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়, যার আর্থিক পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

দীর্ঘ তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে আওয়ামী লীগের ওই সাত নেতা-কর্মীকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা বিনাদোষে দুই বছর যাবত জেল খাঁটছে। তদন্ত শেষে পুলিশ জানিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাদের অব্যাহতির আবেদন করার পাশাপাশি হামলার প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করে। এতে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের জন্য আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়। অধ্যাদেশ অনুযায়ী হত্যা ও অন্যান্য অপরাধের জন্য তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার করা যাবে না।

পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ বিহীন একতরফা সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা এপ্রিল মাসে অধ্যাদেশটি জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) আইন, ২০২৬ হিসেবে পাস করে।

এই আইনে স্বীকৃত আন্দোলনকারীদের আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে দায়ের করা দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহারের বিধান রাখা হয়েছে এবং আইনের সুরক্ষার আওতায় থাকা কর্মকাণ্ডের জন্য নতুন করে আইনি কার্যক্রম গ্রহণের ক্ষেত্রেও বাধা দেওয়া হয়েছে।

সরকার কোনো মামলাকে আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে সৃষ্ট মামলা হিসেবে প্রত্যয়ন করলে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ অন্যান্য অপরাধও আইনের সুরক্ষার আওতায় আসতে পারে।

জাবির ইন্টারন্যাশনাল হোটেলের ঘটনায় আন্দোলনকারীরা জড়িত হলেও মামলায় তাদের অভিযুক্ত না করে আসামী বানানো হয়েছিল আওয়ামী লীগের ৭ জন নেতাকে।

মন্তব্য

Scroll to Top