ঢাকা, ২১শে আগস্ট : তীব্র গ্যাস সংকটে দেশের শিল্পকারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। গ্যাসের চাপ এতটাই কমে গেছে যে রাজধানীর আশপাশের শিল্পাঞ্চলসহ নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন কারখানা উৎপাদন বন্ধ অথবা অর্ধেকেরও কম সক্ষমতায় চালাতে বাধ্য হচ্ছে। কোথাও শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়েছে, কোথাও মেশিন বন্ধ রেখে শ্রমিকদের দিয়ে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করানো হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী হলে শ্রমিক ছাঁটাই, রপ্তানি আদেশ বাতিল এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।
চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ অনেক কম
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও সর্বোচ্চ প্রায় ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ দিয়ে চাহিদা সামাল দিতে হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ আরও কমে ২ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি নেমে এসেছে। ফলে শিল্প, বিদ্যুৎ, আবাসিক ও পরিবহন—সব খাতেই গ্যাসের সংকট তীব্র হয়েছে।
এ সংকটের পেছনে বড় কারণ হিসেবে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্নকে দেখা হচ্ছে। ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের পর এক্সিলারেট এনার্জির একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ কমে যায়। পরবর্তী সময়ে আবহাওয়াজনিত সমস্যার কারণেও এলএনজি সরবরাহে বাধা তৈরি হয়েছে।
নরসিংদীতে শত শত কারখানা বন্ধ
গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত শিল্পাঞ্চলগুলোর একটি নরসিংদী। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, জেলায় ৩০০টির বেশি ছোট-বড় শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এসব কারখানার মধ্যে রয়েছে টেক্সটাইল, ডাইং, সাইজিং, স্পিনিং ও পোশাক কারখানা।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নরসিংদীতে ১০০টির বেশি কারখানা টানা তিন দিন বন্ধ ছিল। কিছু কারখানা উৎপাদন চালু রাখতে গ্যাসের পরিবর্তে কাঠ পুড়িয়ে বয়লার চালানোর চেষ্টা করছে। এতে প্রতিটি কারখানার প্রতিদিন অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, শুধু নরসিংদীতেই গ্যাস সংকটের কারণে দৈনিক প্রায় ৩০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে।
নরসিংদীতে গ্যাসনির্ভর প্রায় ৪০০টি কারখানা রয়েছে। স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য এসব প্রতিষ্ঠানে ১০ থেকে ১৫ পিএসআই চাপ প্রয়োজন হলেও সাম্প্রতিক সময়ে অনেক এলাকায় চাপ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে বলে শিল্পোদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।
ময়মনসিংহে শ্রমিকদের ছুটি
ময়মনসিংহের ভালুকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বৃহস্পতিবার গ্যাসের চাপ না থাকায় অন্তত ২০টি কারখানার শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো কারখানায় অর্ধেকের বেশি মেশিন বন্ধ রাখতে হয়েছে। এ অঞ্চলের প্রধান শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে।
শিল্প পুলিশের নথি অনুযায়ী, ভালুকা ও আশপাশে ২৯৩টি শিল্পকারখানা রয়েছে, যার ৯৯টি গ্যাসনির্ভর। স্পিনিং ও টেক্সটাইল কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কয়েক ডজন মেশিন একসঙ্গে বন্ধ রয়েছে, আবার কোনো কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে।
গাজীপুর ও আশুলিয়াতেও উৎপাদন ব্যাহতরাজধানীর পার্শ্ববর্তী গাজীপুর ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় কোনো কোনো কারখানায় গ্যাসনির্ভর মেশিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। কোথাও ডিজেল ব্যবহার করে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা চলছে, আবার কোথাও মেশিনের পরিবর্তে শ্রমিক দিয়ে হাতে কাজ করানো হচ্ছে।
গ্যাসের চাপ কম থাকায় গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় ডেনিমের প্রেসিংয়ের কাজ মেশিনের বদলে হাতে করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদনের গতি কমে যাচ্ছে এবং বাড়ছে খরচ। শিল্পোদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
চট্টগ্রামেও শিল্প উৎপাদনে ধাক্কা
চট্টগ্রামের রড, পোশাক, স্টিল, জাহাজভাঙা ও অন্যান্য শিল্পেও গ্যাস সংকটে উৎপাদন কমে যাচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গ্যাসের পাশাপাশি পরিবহন খাতেও সংকটের প্রভাব পড়েছে; সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে যানবাহনকে।
বিকল্প জ্বালানিতে বাড়ছে উৎপাদন খরচ
গ্যাস না পেয়ে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান ডিজেল, এলপিজি ও কাঠের মতো বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিষয়টি আরও উদ্বেগের, কারণ বাড়তি ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) জানিয়েছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে জুলাই-আগস্টে অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সংগঠনটি এই দুই মাসের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল ১২ মাসের কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছে।
শ্রমিক ছাঁটাইয়ের শঙ্কা
কারখানা বন্ধ থাকলেও শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি, সুদ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিলসহ নিয়মিত ব্যয় অব্যাহত থাকছে। ফলে দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে শ্রমিকদের বেতন দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
ইতোমধ্যে কিছু কারখানায় শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। কোথাও আবার উৎপাদন না থাকলেও শ্রমিক অসন্তোষ ঠেকাতে তাঁদের দিয়ে যন্ত্রপাতি পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করানো হচ্ছে। শিল্পোদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘায়িত হলে ছাঁটাইয়ের চাপ তৈরি হতে পারে।
রপ্তানি ও অর্থনীতিতে বড় ঝুঁকি
বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও পোশাকশিল্পের বড় অংশ গ্যাসনির্ভর। ফলে গ্যাস সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন হলে শুধু কারখানার উৎপাদন নয়, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়বে। উৎপাদন কমে গেলে সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহ করা কঠিন হবে; এতে ক্রেতার আস্থা ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে শিল্পকারখানাকে একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দ্রুত সমাধানের দাবি
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, সাময়িকভাবে কিছুটা গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও স্বাভাবিক চাপ ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না ফিরলে সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। গ্যাস সরবরাহ দ্রুত বাড়ানো, এলএনজি আমদানি ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক করা এবং শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তিতাস গ্যাসের নরসিংদী কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চাহিদা অনুযায়ী কারখানাগুলোকে গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পরিস্থিতির উন্নতি হলে আগামী সপ্তাহে সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
সব মিলিয়ে, দেশের শিল্পখাতে এখন গ্যাস সংকট শুধু উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে শ্রমিকের কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয়, বিনিয়োগ, ব্যাংকঋণ পরিশোধ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। দ্রুত ও টেকসই সমাধান না হলে সংকটের অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মন্তব্য