আগামীকাল ২৮ সেপ্টেম্বর বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় দিন। অর্থাৎ পাঁচ বারের সফল প্রধানমন্ত্রী এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ৮০তম জন্মদিন। যার দীর্ঘ দুই দশকের দূরদর্শী, সাহসী ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ পৌঁছেছিল এক অনন্য উচ্চতায় এবং সারাবিশ্বে স্বীকৃতি পেয়েছিল উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে। বঙ্গবন্ধুবিহীন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় আলোর মশাল হাতে কাণ্ডারির ভূমিকা পালন করেছেন জাতির পিতার জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র তথা মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি পঞ্চমবারের মতো অত্যন্ত সফলভাবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন শেখ হাসিনা। তাঁর দক্ষ নেতৃত্বে সামাজিক ও অর্থনীতির প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে গিয়েছে। সন্ত্রাস ও জঙ্গি দমনে তার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ও পদক্ষেপের কারণে ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছেন বিশ্ব নেতৃবৃন্দের। মিয়ানমারে জাতিগত সহিংসতায় পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমদের আশ্রয় দিয়ে সারা বিশ্বে হয়েছেন নন্দিত ও প্রশংসিত এবং অর্জন করেছেন “মাদার অফ হিউমিনিটি” খেতাব।
১৯৪৭ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জের মধুমতি নদীবিধৌত টুঙ্গিপাড়ায় স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ঘর আলোকিত করে জন্ম নেন বঙ্গবন্ধু পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান শেখ হাসিনা।
ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রবক্তা স্বপ্নদর্শী এই নেতা ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণের পর থেকে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে দলকে সুসংগঠিত করেন এবং ১৯৯৬ সালে প্রথম, ২০০৮ সালে দ্বিতীয় এবং ২০১৪ সালে তৃতীয়, ২০১৮ সালে চতুর্থ এবং ২০২৪ সালে পঞ্চম বারের মতো নির্বাচনে জয়লাভ করে দলকে দেশের নেতৃত্বের আসনে বসাতে সক্ষম হন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে আত্মমর্যাদাশীল দেশ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। তার নেতৃত্বের কারণে একসময়ের তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে বিবেচিত আজ সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।
দাদা শেখ লুৎফর রহমান ও দাদি সাহেরা খাতুনের অতি আদরের নাতনি শেখ হাসিনার শৈশব-কৈশোর কেটেছে টুঙ্গিপাড়ায়। শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রেহানা এবং শেখ রাসেলসহ তাঁরা পাঁচ ভাই-বোন। বর্তমানে শেখ হাসিনা ও রেহানা ছাড়া কেউই জীবিত নেই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে পিতা বঙ্গবন্ধু এবং মাতা ফজিলাতুন নেছাসহ সবাই ঘাতকদের নির্মম বুলেটে নিহত হন।
শেখ হাসিনার শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল টুঙ্গিপাড়ার এক পাঠশালায়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে পরিবারকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। তখন পুরনো ঢাকার রজনী বোস লেনে ভাড়া বাসায় ওঠেন তারা।
বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার সদস্য হলে সপরিবারে ৩ নম্বর মিন্টু রোডের বাসায় তারা বসবাস শুরু করেন। শেখ হাসিনাকে ঢাকা শহরে টিকাটুলির নারী শিক্ষা মন্দিরে ভর্তি করা হয়। এখন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি শেরেবাংলা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামে খ্যাত। শুরু হয় তার শহর বাসের পালা।
তিনি ১৯৬৫ সালে আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬৭ সালে ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজ (বর্তমান বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা মহাবিদ্যালয়) থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেন। ওই বছরেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্সে ভর্তি হন এবং ১৯৭৩ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
বঙ্গবন্ধুর আগ্রহে ১৯৬৮ সালে পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে শেখ হাসিনার বিয়ে হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের করাচিতে নিয়ে যাওয়ার পর গোটা পরিবারকে ঢাকায় ভিন্ন এক বাড়িতে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। অবরুদ্ধ বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ২৭ জুলাই শেখ হাসিনা গৃহবন্দী অবস্থায় তার প্রথম সন্তান ‘জয়’-এর মা হন। ১৯৭২ সালের ৯ ডিসেম্বর কন্যা সন্তান পুতুলের জন্ম হয়।
শেখ হাসিনার পরবর্তী ইতিহাস একবিংশ শতকের অভিযাত্রায় তিনি কীভাবে বাঙালি জাতির কাণ্ডারি হয়েছেন তারই ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখতেন সেই স্বপ্ন রূপায়নের দায়িত্ব নিয়ে বাঙালি জাতির আলোর দিশারী হওয়ার ইতিহাস। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক সম্মেলনে তাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। আর ঐ বছরেরই ১৭ মে দীর্ঘ ৬ বছর প্রবাস জীবনের অবসান ঘটিয়ে মাতৃভূমি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তিনি ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে দীর্ঘ ২১ বছর পর সরকার গঠন করে এবং সে বছরের ২৩ জুন প্রথমবারের মতো তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাকে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড নিক্ষেপ করে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়। তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও ওই হামলায় ২৪ জন নিহত এবং ৫০০ নেতা-কর্মী আহত হন।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে বিশাল বিজয় অর্জন করে। এই বিজয়ের মধ্যদিয়ে শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে তৃতীয়বার এবং ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে চতুর্থবার এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারীতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হয়ে পঞ্চম বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮১ সালে দেশে ফিরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার পরপরই তিনি শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন। তাকে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে। ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সামরিক সরকার তাঁকে আটক করে ১৫ দিন অন্তরীণ রাখে। ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি এবং নভেম্বর মাসে তাঁকে দু’বার গৃহবন্দী করা হয়। ১৯৮৫ সালের ২ মার্চ তাঁকে আটক করে প্রায় ৩ মাস গৃহবন্দী করে রাখা হয়। ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে তিনি ১৫ দিন গৃহবন্দী ছিলেন। ১৯৮৭ সালে ১১ নভেম্বর তাঁকে গ্রেফতার করে এক মাস অন্তরীণ রাখা হয়। ১৯৮৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনা গ্রেফতার হয়ে গৃহবন্দী হন। ১৯৯০ সালে ২৭ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে আবারও অন্তরীণ হতে হয়। সর্বশেষ ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে সংসদ ভবন চত্বরে সাবজেলে পাঠায়। প্রায় ১ বছর পর ২০০৮ সালের ১১ জুন তিনি মুক্তি পান।
শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য কমপক্ষে ১৯ বার সশস্ত্র হামলা করা হয়। এর মধ্যে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালনকালে তাঁকে লক্ষ করে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। এতে যুবলীগ নেতা নূর হোসেন, বাবুল ও ফাত্তাহ নিহত হন। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে তাঁকেসহ তাঁর গাড়ি ক্রেন দিয়ে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিংয়ের সামনে তাকে লক্ষ্য করে পুলিশ বাহিনী লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ করে। এ ঘটনায় শেখ হাসিনা অক্ষত থাকলেও ৩০ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী নিহত হন। ১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের উপ-নির্বাচন চলাকালে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। ১৯৯৪ সালে ঈশ্বরদী রেল স্টেশনে তাঁর কামরা লক্ষ্য করে অবিরাম গুলিবর্ষণ করা হয়। ২০০০ সালে কোটালীপাড়ায় হেলিপ্যাডে এবং শেখ হাসিনার জনসভাস্থলে ৭৬ কেজি ও ৮৪ কেজি ওজনের দু’টি বোমা পুতে রাখা হয়। বিএনপি সরকারের সময় সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট।
ঐদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে এক জনসভায় বক্তব্য শেষ করার পরপরই তাঁকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা করা হয়। ইতিহাসের ভয়ংকর ও লোমহর্ষক সেই হামলায় শেখ হাসিনা প্রাণে রক্ষা পেলেও আইভি রহমানসহ তাঁর দলের ২২ নেতাকর্মী নিহত হন এবং ৫শ’র বেশি মানুষ আহত হন। শেখ হাসিনা নিজেও কানে আঘাত পান।
শত বাধা-বিপত্তি এবং হত্যার হুমকিসহ নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা ভাত-ভোট এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য অবিচল থেকে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে। সামাজিক কর্মকান্ড, শান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য শেখ হাসিনাকে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা সম্মানিত করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সুদীর্ঘ ২৫ বছরের গৃহযুদ্ধ অবসানের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৮ সালে ইউনেস্কো তাঁকে হুপে-বোয়ানি শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ক্ষুধার বিরুদ্ধে আন্দোলনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ শেখ হাসিনাকে সম্মানজনক ‘সেরেস’ মেডেল প্রদান করে। এছাড়া ২০১৪ সালে ইউনেসকো তাঁকে ’শান্তির বৃক্ষ’ এবং ২০১৫ সালে উইমেন ইন পার্লামেন্টস গ্লোবাল ফোরাম নারীর ক্ষমতায়নের জন্য তাঁকে রিজিওনাল লিডারশীপ পুরস্কার এবং গ্লোবাল সাউথ-সাউথ ডেভলপমেন্ট এক্সপো-২০১৪ ভিশনারি পুরস্কারে ভূষিত করে। জাতিসংঘ পরিবেশ উন্নয়ন কর্মসূচি দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশ এবং টেকসই উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য লিডারশিপ ক্যাটাগরিতে শেখ হাসিনাকে তাদের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ-২০১৫’ পুরস্কারে ভূষিত করে।
শেখ হাসিনার দীর্ঘ দুই দশকের শাসনামলে (১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯-২০২৪) বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছিল।
অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত অগ্রগতি
• অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পায় এবং একসময়ের সাহায্যনির্ভর দেশটি নিম্ন-মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়।
• পদ্মা সেতু ও বড় প্রকল্প: নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়।
• ডিজিটাল বাংলাদেশ: তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রসার ও ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়।
সামাজিক ও মানবিক অর্জন
• দারিদ্র্য বিমোচন: সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা এবং গ্রামীণ অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে দারিদ্র্য হ্রাসের হার বৃদ্ধি পায়।
• রোহিঙ্গা আশ্রয়: মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দশ লক্ষাধিক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ বা মানবতার জননী হিসেবে প্রশংসিত হন।
শিল্প সংস্কৃতি ও সাহিত্যঅন্তপ্রাণ শেখ হাসিনা লেখালেখিও করেন। তাঁর লেখা এবং সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩০টিরও বেশি। প্রকাশিত অন্যতম বইগুলো হচ্ছে-শেখ মুজিব আমার পিতা, সাদা কালো, ওরা টোকাই কেন, বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম, দারিদ্র্য দূরীকরণ, আমাদের ছোট রাসেল সোনা, আমার স্বপ্ন আমার সংগ্রাম, সামরিকতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন, বিপন্ন গণতন্ত্র, সহেনা মানবতার অবমাননা, আমরা জনগণের কথা বলতে এসেছি, সবুজ মাঠ পেরিয়ে ইত্যাদি।
১৯৮১ সালের ১৭ মে ভারতে ছয় বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেছিলেন, আমি সবকিছু হারিয়ে আপনাদের মাঝে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তার আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির পিতার হত্যার বিচার করতে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই। বাংলার দুঃখী মানুষের সেবায় আমি আমার এ জীবনদান করতে চাই। আমার আর হারানোর কিছুই নেই। পিতা-মাতা, ভাই সবাইকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি, আমি আপনাদের মাঝেই তাদের ফিরে পেতে চাই। আপনাদের নিয়েই আমি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তা বাস্তবায়ন করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চাই, বাঙালি জাতির আর্থ-সামাজিক তথা সার্বিক মুক্তি ছিনিয়ে আনতে চাই।’ শেখ হাসিনা সেদিন জনগণকে দেওয়া সেই অঙ্গীকার পূরণে গত চার দশকের বেশি সময় ধরে প্রতিনিয়ত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে জনগণের ভাগ্যবদলে নিরলস প্রয়াস চালিয়ে গেছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টে দেশি-বিদেশি চক্রান্তের শিকার হয়ে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশ ত্যাগে বাধ্য হন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এবং আশ্রয় নেন প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে। তারপর থেকে গত দুইবছর যাবত বাংলাদেশের জনগণ প্রত্যক্ষ করছে চরম নৈরাজ্য, অরাজকতা ও হানাহানি। আইনশৃংখলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি, খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, মব সন্ত্রাস, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুত, সারের চরম সংকট, শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা ইত্যাদির কারণে দেশের মানুষ আজ সম্পূর্ণ দিশেহারা এবং এক প্রকার অসহায় দিন যাপন করছে। জনগণ এখন হাড়ে হাড়ে অনুভব করছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুপস্থিতি। বুঝে হোক না বুঝে হোক যারা ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন তাদের অনেকেই তাদের ভুল বুঝতে পেরেছেন এবং মনে করছেন ২০২৪ সালের আন্দোলন ছিলো মূলত একটা প্রতারণা। এই অবস্থায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতা-কর্মীদের নিয়ে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন এবং বিদেশে অবস্থানরত দলের লাখো নেতাকর্মীরাও ইতোমধ্যে দেশে ফেরার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। তারা মনে করেন ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা যেভাবে দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা নিয়ে মাথা উঁচু করে দেশে ফিরেছিলেন ঠিক একই দৃশ্যের অবতারণা হবে আগামী ডিসেম্বরে যখন তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করবেন।
কৃষক, শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষ মনে করছেন শেখ হাসিনার বিকল্প কোনো নেতৃত্ব এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি এবং একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব দেশকে এই চরম সংকটের হাত থেকে রক্ষা করে বিশ্বের দরবারে আবারও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করা। দেশকে আবারও গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যতদিন বেঁচে থাকবেন, আমাদের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেবেন, ততদিন দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত থাকবে, দেশ উন্নয়নের সিঁড়ি পথেই হাঁটবে, ততদিন গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি বিকশিত হতেই থাকবে, ততদিন গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে থাকবে। বাংলাদেশ হবে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা।

মন্তব্য