মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | Columbus |
| Columbus
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে গুলশানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে বড় মিছিল

- ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৩ অপরাহ্ন

শুক্রবার ঢাকার গুলশানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে বড় মিছিল করেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। শান্তিপূর্ণ মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ রবার বুলেট ব্যবহার করেছে।

সরকারি নিষেধাজ্ঞা এবং দীর্ঘদিন ধরে গ্রেপ্তার, মামলা, হামলা ও দমন-পীড়নের মধ্যেও রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রকাশ্যে এ মিছিল রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দলটির নেতাকর্মীদের বিশেষভাবে উজ্জীবিত করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বিপুলসংখ্যক মানুষকে একসঙ্গে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে মিছিল করতে দেখা যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিওতে সহস্রাধিক মানুষকে মিছিলে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়। তবে পুলিশ মিছিলকারীর সংখ্যা কয়েকশ বলে উল্লেখ করেছে।

আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর উত্তর শাখা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিছিলটি তাদের কর্মসূচি বলে নিশ্চিত করেছে।

পুলিশ মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করতে রাবার বুলেট ছোড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতেও পুলিশকে মিছিলকারীদের ধাওয়া করতে এবং রাবার বুলেট ছুড়তে দেখা গেছে।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বেলা পৌনে ১২টার দিকে গুলশান-১-এর ভোলা মসজিদ ও ৩ নম্বর সড়কসংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

পুলিশের রাবার বুলেট

গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দাউদ হোসেন বলেন, বেলা পৌনে ১২টার দিকে ভোলা মসজিদের সামনে থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মিছিল বের করার চেষ্টা করেন।

পুলিশ মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে গেলে দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওসি দাউদ হোসেন দাবি করেন, মিছিলকারীরাই ককটেল দুটির বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ দুই রাউন্ড রাবার বুলেট ছোড়ে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বিপুলসংখ্যক মানুষকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। একপর্যায়ে পুলিশ তাদের ধাওয়া করে এবং রাবার বুলেট ছুড়ে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

তবে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত ছিলেন, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের বক্তব্যের বাইরে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।

দুজন গ্রেপ্তার

ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। কয়েকটি প্রতিবেদনে তাদের একজনের নাম আব্দুর রহিম এবং অন্যজনের নাম আরাফাত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশ একই স্থান থেকে অবিস্ফোরিত পাঁচটি ককটেল উদ্ধারের দাবি করেছে। গুলশান থানার ওসি জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

গুলশানের মিছিলের পর শুক্রবার সন্ধ্যা ও রাতে একই এলাকায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে পাল্টা মিছিল বের করে ক্ষমতাসীন বিএনপি। তারা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক তৎপরতার বিরোধিতা করে স্লোগান দেয়।

ঢাকার বাইরেও মিছিল

শুক্রবার শুধু ঢাকায় নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মিছিলের ভিডিও ও সরাসরি সম্প্রচার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

বিভিন্ন পোস্টে এসব কর্মসূচিকে দলটির নেতাকর্মীদের নতুন করে প্রকাশ্যে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা হিসেবে তুলে ধরা হয়।

তবে ঢাকার বাইরের মিছিলগুলোর তথ্য সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমে প্রচার করা হয়নি।

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দলটির নেতাকর্মীদের অদম্য রাজনৈতিক তৎপরতার দৃষ্টান্ত হিসেবে এসব কর্মসূচীকে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এর আগে গত ১৮ জুন ঢাকার মহাখালীতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকশ নেতাকর্মী ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ এবং শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের পক্ষে স্লোগান দিয়ে মিছিল করেছিলেন। ওই মিছিলেও নারী নেতাকর্মীদের অংশ নিতে দেখা যায়। পুলিশ সেখান থেকেও কয়েকজনকে আটক করেছিল।

নিষেধাজ্ঞার মাঝে জমায়েত

শুক্রবারের গুলশান মিছিলের রাজনৈতিক তাৎপর্য তৈরি হয়েছে মূলত এর স্থান, অংশগ্রহণ এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে। গুলশান রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কূটনৈতিক এলাকা। কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকা একটি দেশের বৃহত্তম ও দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সেখানে প্রকাশ্যে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মিছিল এবং তার ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।

আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ২০২৪ সাল থেকে দলটির নেতাকর্মীরা ব্যাপক মামলা, গ্রেপ্তার ও হামলার মুখে পড়েছেন। দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন এলাকায় দলটির নেতাকর্মীরা সংগঠিত বা একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করলে হামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে।

মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে ফেব্রুয়ারিতে এক তরফা নির্বাচনের আয়োজন করে। আওয়ামী লীগ বিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসে। এরপর তারা সংসদে আইন পাশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে।

আওয়ামী লীগের দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা বিভিন্ন মামলায় তাদের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে কারাগারে রাখা হয়েছে। দলটির অনেক নেতাকর্মী দীর্ঘ সময় ধরে আটক রয়েছেন।

কারাগারে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের বহু নেতাকর্মীর মৃত্যুর ঘটনাও সামনে এসেছে, যা বন্দীদের উপর নির্যাতন, চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে মব হামলার ঘটনা ধারাবাহিকভাবে আলোচনায় রয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

দলটির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করলে তারা পুলিশি অভিযান এবং সরকারসমর্থক বিভিন্ন গোষ্ঠীর হামলার মুখে পড়ছেন।

এই পরিস্থিতিতে শুক্রবার গুলশানের মিছিলকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও দ্রুত সামনে আসে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা সারজিস আলম প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তোলেন, নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আওয়ামী লীগ কীভাবে গুলশানে মিছিল করতে পারল।

অন্যদিকে বিএনপির সহযোগী সংগঠনগুলো সন্ধ্যার পর একই এলাকায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে পাল্টা মিছিল করে।

ফলে গুলশানের শুক্রবারের ঘটনাটি শুধু একটি মিছিল ছত্রভঙ্গ করার ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। নিষেধাজ্ঞা, ব্যাপক গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিকভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে রাজপথে ফেরার বার্তাবহ বলে মনে করা হচ্ছে।

মন্তব্য

Scroll to Top