বাংলাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৪৯২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৯ জনে।
বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগে ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগে একজন করে মোট চারজন মারা গেছেন।
নতুন রোগী ভর্তির দিক থেকে সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে ঢাকা বিভাগে। গত ২৪ ঘণ্টায় এই বিভাগে ৩২৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
খুলনা বিভাগে ২৮৪ জন, চট্টগ্রামে ২০২, বরিশালে ১৭৮, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৫১ এবং রাজশাহীতে ১২২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৮১ জন, ময়মনসিংহে ৮০, রংপুরে ৫৪ এবং সিলেটে ১৩ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
ঢাকায় মৃত্যু সবচেয়ে বেশি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট ১৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এর মধ্যে দুই সিটি করপোরেশনসহ ঢাকা বিভাগেই মারা গেছেন ৭১ জন। অর্থাৎ এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর অর্ধেকের বেশি ঘটেছে ঢাকা বিভাগে।
এর বাইরে খুলনা বিভাগে ২৫ জন, ময়মনসিংহে ১৪, বরিশালে ১২, চট্টগ্রামে ৯ এবং রাজশাহীতে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। রংপুর ও সিলেট বিভাগে একজন করে মারা গেছেন।
সেপ্টেম্বরের ১০ দিনেই ৪২ মৃত্যু
চলতি মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর গতি উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ বছর ডেঙ্গুতে ১৩০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরের প্রথম আট দিনেই মারা যান ৩৩ জন।
এরপর বুধবার আরও তিনজন এবং বৃহস্পতিবার ছয়জনের মৃত্যু হওয়ায় সেপ্টেম্বরের প্রথম ১০ দিনেই মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪২ জনে।
হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম আট দিনে ৯ হাজার ৬২৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। বুধবার আরও ১ হাজার ৪৬৩ এবং বৃহস্পতিবার ১ হাজার ৪৯২ জন ভর্তি হওয়ায় মাসের প্রথম ১০ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৫৮৪ জনে।
জুন থেকে দ্রুত বাড়ছে ডেঙ্গু
দেশে জুন মাস থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বাড়তে শুরু করে। জুনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২০৬ জনে।
আগস্টে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। ওই মাসে হাসপাতালে ভর্তি হন ২০ হাজার ৫৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী। অর্থাৎ জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে রোগী ভর্তির সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়।
সেপ্টেম্বরের প্রথম ১০ দিনের পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, ডেঙ্গুর উচ্চ সংক্রমণ এখনো অব্যাহত রয়েছে।
সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নিয়ে বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আগেই সতর্ক করেছেন, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর বাংলাদেশে ডেঙ্গুর জন্য ঐতিহাসিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। এ সময়ে এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়ায় সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু পূর্ণবয়স্ক মশা নিধন করলেই হবে না। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার পাশাপাশি আক্রান্ত রোগীকে যেন মশা কামড়ে ভাইরাস অন্য মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে না পারে, সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি মশার প্রজননস্থল, মশার ঘনত্ব ও ডেঙ্গু রোগীর তথ্যের ভিত্তিতে সমন্বিত ও তথ্যনির্ভর জাতীয় কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীও দেশজুড়ে সমন্বিতভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত একই সময়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে নির্বাচিত কীটনাশক ব্যবহারের পাশাপাশি বছরব্যাপী কার্যক্রম চালাতে হবে।
সরকার তিন মাসের একটি দেশব্যাপী ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ১২ সেপ্টেম্বর এই কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা। এতে সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মাত্র দুই দিন আগে এক দিনে ডেঙ্গুতে নয়জনের মৃত্যুর খবর এসেছিল। এরপর নতুন করে আরও ছয়জনের মৃত্যু এবং প্রায় দেড় হাজার রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের উচ্চঝুঁকির সময় সামনে রেখে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

মন্তব্য