কুড়িগ্রামের দুই উপজেলায় সার নিয়ে কৃষকদের ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। রৌমারীতে সার বিতরণে দেরির অভিযোগে এক ডিলারের গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে ইউরিয়া সার নিয়ে গেছেন ক্ষুব্ধ কৃষকেরা। একই দিনে ভূরুঙ্গামারীতে চাহিদামতো সার না পেয়ে কৃষকেরা সড়ক অবরোধ করেন। কিছু সময়ের জন্য উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকেও অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।
জেলায় পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে বলে কৃষি বিভাগ দাবি করলেও মাঠের পরিস্থিতি ভিন্ন। কয়েকটি এলাকায় বারবার বিক্ষোভ হচ্ছে। কোথাও গুদাম ভাঙচুর হচ্ছে, কোথাও সড়ক অবরোধ করছেন কৃষকেরা। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ভূরুঙ্গামারীর কোনো না কোনো ইউনিয়নে প্রায় প্রতিদিনই সার নিয়ে বিক্ষোভ হচ্ছে।
সোমবার সকালে রৌমারী উপজেলার বন্দবেড় বাজারে মেসার্স মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজের গুদামে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, সার পাওয়ার আশায় রোববার দিবাগত রাত দুইটা থেকেই তাঁরা গুদামের সামনে লাইনে দাঁড়াতে শুরু করেন। রাত পেরিয়ে সকাল হলেও সার বিতরণ শুরু হয়নি। এতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকা কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে কয়েকজন কৃষক গুদামের টিনের বেড়া ও দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। এরপর তাঁরা সারের বস্তা নিয়ে বেরিয়ে যান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কয়েকজনকে গুদাম থেকে সারের বস্তা বের করতে দেখা যায়। কেউ মাথায় করে, কেউ ভ্যানে করে সার নিয়ে যাচ্ছিলেন।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
কৃষি কর্মকর্তার অস্বীকার, গুদাম কর্তৃপক্ষ বলছে ঘটনা সত্য
রৌমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম বসুনিয়া অবশ্য গুদাম থেকে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা অস্বীকার করেছেন।
তাঁর দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি ভুয়া। বন্দবেড় ইউনিয়নে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।
তিনি বলেন, রৌমারী উপজেলায় ৪২ হাজার কৃষক রয়েছেন। সবাই সঠিকভাবে সার পাচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে গুদাম কর্তৃপক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন।
মেসার্স মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি সত্য। ঘটনার সময় গুদামে ৭৫০ বস্তা সার ছিল।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার সকালে প্রায় এক হাজার কৃষক গুদামের সামনে জড়ো হন। কে আগে সার নেবেন, তা নিয়ে একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে গুদাম কর্তৃপক্ষের লোকজন থানা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে সহায়তা চাইতে যান।
সাইফুল ইসলামের দাবি, এই সুযোগে কৃষকেরা গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। তাঁরা আনুমানিক ১০০ থেকে ১৫০ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে যান।
তবে ঠিক কত বস্তা সার নেওয়া হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। গুদামের হিসাব শেষ হলে সঠিক পরিমাণ জানা যাবে বলে তিনি জানান।
পরে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় গুদামে থাকা অবশিষ্ট সার বিতরণ শুরু হয়।
রৌমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাওসার আলী বলেন, সার বিতরণের আগে পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়নি। পরে কৃষকদের ক্ষোভ ও উত্তেজনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
ভূরুঙ্গামারীতে সড়কে আগুন, কৃষি কর্মকর্তা অবরুদ্ধ
একই দিন সকালে ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সোনাহাট এলাকাতেও সার নিয়ে কৃষকদের ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগে কৃষকেরা সড়ক অবরোধ করেন। সড়কে আগুন জ্বালিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন তাঁরা।
খবর পেয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে যান।
এ সময় ক্ষুব্ধ কৃষকেরা তাঁকে কিছু সময় অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে।
ভূরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজিম উদ্দিন বলেন, উপজেলার কোনো না কোনো ইউনিয়নে প্রায় প্রতিদিনই সার নিয়ে কৃষকদের বিক্ষোভ হচ্ছে।
কোথাও কোথাও কৃষকেরা সড়কও অবরোধ করছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে নিয়মিত মাঠে নামতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কৃষি বিভাগের দাবি, পর্যাপ্ত সার রয়েছে
কৃষকদের ধারাবাহিক বিক্ষোভের মধ্যেও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, কুড়িগ্রামে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।
অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুনের মতে, আগাম ভুট্টা ও বেগুন চাষের জন্য অনেক কৃষক প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সার সংগ্রহ করছেন।
এ কারণে কিছু এলাকায় সাময়িক সংকট তৈরি হচ্ছে বলে তাঁর দাবি।
তবে কৃষি বিভাগের এই বক্তব্যের বিপরীতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় সার বিতরণ ঘিরে কৃষকদের ক্ষোভ বারবার প্রকাশ্যে আসছে। কৃষকদের অভিযোগ মূলত সময়মতো এবং চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়াকে ঘিরে।
আগের দিনও গুদামে ভাঙচুর
কুড়িগ্রামে সার নিয়ে কৃষকদের এমন বিক্ষোভ নতুন নয়।
রোববার নাগেশ্বরীর কচাকাটা বাজারে সার বিতরণে দেরির অভিযোগে এক পরিবেশকের গুদামে ভাঙচুর করেন কৃষকেরা।
একই দিনে ভূরুঙ্গামারীতেও সারের দাবিতে সড়ক অবরোধ করা হয়।
এর আগে গত ২৩ আগস্ট ভূরুঙ্গামারীর শিলখুড়ি ইউনিয়নের ধলডাঙ্গা বাজারে একই ধরনের ঘটনা ঘটে।
সেখানে এক ডিলারের গুদামের বেড়া ভেঙে কৃষকেরা ২২৫ বস্তা সার নিয়ে যান।
পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হলে ১১৫ বস্তা সার ফেরত দেওয়া হয়।
ওই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ডিলারের বিরুদ্ধে কৃষকদের সময়মতো সার না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ক্যাশমেমোতেও অসংগতির অভিযোগ ছিল।
পরে ওই প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
কুড়িগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক ঘটনা সারের মজুত ও কৃষক পর্যায়ে তা পৌঁছানোর মধ্যে ব্যবধানের প্রশ্ন সামনে এনেছে। একদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, জেলায় পর্যাপ্ত সার রয়েছে। অন্যদিকে সার পেতে রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও খালি হাতে ফেরার অভিযোগ করছেন কৃষকেরা। সেই ক্ষোভই এখন কোথাও গুদাম ভাঙচুর, কোথাও সড়ক অবরোধে রূপ নিচ্ছে।

মন্তব্য