গত ১৯ মাসে বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনকালে হামলায় এক হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এর মধ্যে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই আহত হয়েছেন ৪৪১ জন। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা প্রায় প্রতি মাসেই ঘটছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে ৬৩ জন পুলিশ সদস্য হামলায় আহত হয়েছেন। সন্দেহভাজন আসামিকে হাতকড়াসহ ছিনিয়ে নেওয়া, থানায় হামলা, সড়কে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক পুলিশকে মারধর এবং অপরাধ দমনে অভিযান চালানোর সময় হামলার মতো ঘটনা রয়েছে এই তালিকায়।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ১৯ মাসে হামলায় মোট ১ হাজার ৪২ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। গত বছর আহত হন ৬০১ জন। আর চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে এই সংখ্যা ৪৪১।
চলতি বছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সবচেয়ে বেশি পুলিশ সদস্য আহত হন। দুই মাসেই ৮২ জন করে আহত হয়েছেন। মার্চে ৬৩, এপ্রিলে ৬৬, মে মাসে ৫৫, জুনে ৫১ এবং জুলাইয়ে ৪২ জন পুলিশ সদস্য হামলায় আহত হন।
আমিনবাজারে পুলিশ কর্মকর্তাকে পিটিয়ে হত্যা
পুলিশের ওপর হামলার সর্বশেষ প্রাণঘাতী ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে সাভারের আমিনবাজারে।
সেখানে পুলিশের বিশেষ শাখার উপপরিদর্শক আলতাব হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
এ ঘটনায় একটি ব্যক্তিগত গাড়ির চালক জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয় পর্যায়ে যুবদলের একটি ওয়ার্ডের নেতা।
ঘটনাটি আবারও সামনে এনেছে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
গত বছর আহত হন ৬০১ পুলিশ সদস্য
২০২৫ সালেও প্রায় প্রতি মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, ওই বছরের জানুয়ারিতে ৩৮ জন পুলিশ সদস্য হামলায় আহত হন। ফেব্রুয়ারিতে আহত হন ৩৭ জন।
মার্চে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ৯৬-এ। এপ্রিলে ৫২, মে মাসে ৬২, জুনে ৪৪ এবং জুলাইয়ে ৩৯ জন আহত হন।
আগস্টে আহত হন ৫১ জন। সেপ্টেম্বরে ৪৩, অক্টোবরে ৬৯ এবং নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ৪১ জন করে পুলিশ সদস্য আহত হন।
সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে হামলায় আহত পুলিশ সদস্যের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬০১।
মহানগর পুলিশগুলোর মধ্যে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ঢাকা মহানগর পুলিশে সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এ সময়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের ৪২ সদস্য হামলায় আহত হন।
২০২৫ সালে ঢাকা মহানগর পুলিশের ৮৯ সদস্য হামলায় আহত হয়েছিলেন।
পুলিশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ঢাকা অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি সদস্য আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিয়মিত দায়িত্ব পালনেও হামলা
শুধু অপরাধী ধরতে গিয়ে পুলিশ সদস্যরা হামলার শিকার হয়েছেন, এমন নয়। নিয়মিত দায়িত্ব পালনের সময়ও পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে।
২০২৫ সালের ১০ মার্চ নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দায়িত্ব পালনকালে ট্রাফিক পুলিশ সদস্য শাহীন হোসেন হামলার শিকার হন। নিজেদের ‘সমন্বয়ক’ পরিচয় দেওয়া কয়েকজনের বিরুদ্ধে ওই হামলার অভিযোগ ওঠে।
একই দিন সাভারে এক নারী পুলিশ সদস্যকে লোহার রড দিয়ে মারধর করা হয়।
এর আগে গত বছরের ১ মার্চ যশোরে দায়িত্ব পালনকালে ট্রাফিক কনস্টেবল কে এম শরিফুল ইসলামের নাকে ঘুষি মারার অভিযোগ ওঠে। রাজনৈতিক নেতা শাওন ইসলাম সবুজের বিরুদ্ধে ওই হামলার অভিযোগ করা হয়।
গত বছরের ৫ অক্টোবর নরসিংদীতে পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি বন্ধে কাজ করার সময় পুলিশের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হামলার শিকার হন।
আরও সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলামসহ চার পুলিশ সদস্য সড়কে হামলার শিকার হন।
এসব ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, গ্রেপ্তার অভিযান বা সংঘর্ষের মতো উচ্চঝুঁকির পরিস্থিতির বাইরেও দৈনন্দিন দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যরা হামলার মুখে পড়ছেন।
পুলিশের মনোবল নিয়ে উদ্বেগ
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশের ওপর বারবার হামলার প্রভাব শুধু আহত সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পুরো বাহিনীর মনোবলের ওপর পড়তে পারে।
পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালনে নিরাপত্তাহীনতা বোধ করলে আইন প্রয়োগেও তার প্রভাব পড়তে পারে। এতে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ পেতে পারে বলে তাঁরা মনে করেন।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক আশরাফুল হুদার মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সৃষ্ট পরিস্থিতির ধাক্কা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি পুলিশ।
তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ের সদস্যদের সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটানো উচিত। তাঁদের উৎসাহ দিতে হবে এবং পাশে থাকার বার্তা দিতে হবে।
তাঁর মতে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এমন উপস্থিতি সাধারণ পুলিশ সদস্যদের মধ্যে আস্থা তৈরি করবে। তাঁরা মনে করবেন না যে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁরা একা হয়ে পড়েছেন।
‘অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে দেখার সাহস দিতে হবে’
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদও পুলিশকে স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তাঁর মতে, পুলিশ সদস্যদের পুলিশ প্রবিধান অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে সক্রিয় থাকতে হবে।
পুলিশকে এমন আত্মবিশ্বাস দিতে হবে, যাতে কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তাঁর পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে তাঁকে অপরাধী হিসেবেই দেখা যায়।
নূর মোহাম্মদের মতে, পুলিশ যদি ঘুরে দাঁড়াতে না পারে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর প্রভাব পড়বে সামগ্রিক সমাজের ওপর।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানও সেই উদ্বেগের ব্যাপকতা তুলে ধরছে। ১৯ মাসে এক হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য হামলায় আহত হয়েছেন। এর মধ্যে চলতি বছরের সাত মাসেই আহত হয়েছেন ৪৪১ জন।

মন্তব্য