ঢাকা: জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা করার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন অধ্যাপককে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একই সঙ্গে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা পূরণ না করেই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগে সংগীত বিভাগের এক সহযোগী অধ্যাপককেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এই চারটি বরখাস্তকেই ভিন্নমত দমন এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটের সভায় সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা করার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া তিন শিক্ষক হলেন শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এম ওয়াহিদুজ্জামান চাঁন, একই ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান এবং সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মশিউর রহমান।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগগুলো পর্যালোচনার জন্য তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালও গঠন করা হয়েছে।
‘মুক্তবুদ্ধি চর্চার পরিপন্থী’
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মশিউর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে মুক্তবুদ্ধি চর্চার পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছেন।
তার দাবি, যেসব অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে, সেগুলো ভিত্তিহীন।
মশিউর রহমান বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য দেননি। ফলে তার বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থার যৌক্তিকতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
‘ছাত্রদের পক্ষেই ছিলাম’
শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমানও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, একজন অধ্যাপক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন সিদ্ধান্তে তিনি হতাশ।
মাহবুবুর রহমানের দাবি, জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি শিক্ষার্থীদের পক্ষেই ছিলেন। এমনকি তার বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে জামিন করানোর জন্য তিনি থানায়ও গিয়েছিলেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সাত থেকে আট বছর আগের কিছু রাগ-ক্ষোভ টেনে এনে এখন তার বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
একই ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এম ওয়াহিদুজ্জামান চাঁনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
সংগীত বিভাগের শিক্ষকও বরখাস্ত
অন্যদিকে, পৃথক এক অভিযোগে সংগীত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. জিয়াউর রহমানকে (সায়েম রানা নামে পরিচিত) সাময়িক বরখাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে যে শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা পূরণ না করেই তিনি সংগীত বিভাগের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।
বিষয়টি আরও তদন্ত করতে তার বিরুদ্ধে একটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জিয়াউর রহমান ইসলামিক স্টাডিজে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি সংগীত বিষয়ে এমফিল ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
তবে সংগীত বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের যে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল, সেখানে প্রার্থীদের সংগীত বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক ছিল।
অভিযোগ রাজনৈতিক
চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার মধ্যে প্রথম তিনজনের বিষয়টি সরাসরি জিয়াউর রহমানের ঘটনার চেয়ে ভিন্ন।
অধ্যাপক মশিউর রহমান, অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান এবং অধ্যাপক এম ওয়াহিদুজ্জামান চাঁনের বিরুদ্ধে অভিযোগ মূলত জুলাই আন্দোলন নিয়ে তাদের অবস্থান বা ভূমিকা ঘিরে। অন্যদিকে, জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তার নিয়োগকালীন শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে।
তবে জুলাই আন্দোলন নিয়ে অভিযোগের মুখে থাকা অন্তত দুই শিক্ষক প্রকাশ্যে সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
শিক্ষকদের দমন!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এলো, যখন দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, জুলাই আন্দোলন নিয়ে অবস্থান এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক অভিযোগে তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক চলছে।
গত আগস্টে দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তিমূলক কার্যক্রমের অভিযোগ তুলে তা বন্ধের দাবি জানিয়েছিল বাংলাদেশ পাবলিক ইউনিভার্সিটি প্রগ্রেসিভ টিচার্স’ সোসাইটি। সংগঠনটির বক্তব্য ছিল, রাজনৈতিক পরিচয় বা আদর্শগত অবস্থানকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অসদাচরণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
এর কয়েক দিন পর বাংলাদেশ ও প্রবাসে থাকা ৩০ জন শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, সংস্কৃতিকর্মী ও পেশাজীবী যৌথ বিবৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও হয়রানির অভিযোগে উদ্বেগ জানান। তারা বলেন, রাজনৈতিক বা আদর্শগত মতপার্থক্যের কারণে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, একাডেমিক স্বাধীনতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অবশ্য তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটির সুপারিশের পর ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযোগ শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হবে কি না, সেটি ট্রাইব্যুনালের প্রক্রিয়া ও পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
তবে জুলাই আন্দোলনের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ নিজেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ কি না এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে কতটা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারবেন—তিন অধ্যাপকের সাময়িক বরখাস্ত সেই প্রশ্নটিকেই আবার সামনে এনেছে।

মন্তব্য