মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | Washington |
| Washington
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

আমার সন্তান কোথায়?

মানবাধিকার | ২ দিন আগে

আমার সন্তান কোথায়?

- ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০১ অপরাহ্ন

ঢাকা — কারও হাতে সন্তানের ছবি। কারও চোখে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার ক্লান্তি। কেউ মাসের পর মাস, কেউ বছরের পর বছর ধরে খুঁজছেন সন্তানকে। রোববার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এমন প্রায় ৪০টি পরিবারের সদস্য একত্র হয়েছিলেন একটাই প্রশ্ন নিয়ে—“আমার সন্তান কোথায়?”

নিখোঁজ শিশুদের পরিবারগুলোর এই আয়োজনে ছিল কান্না, হতাশা, ক্ষোভ এবং ফিরে পাওয়ার শেষ আশাটুকু আঁকড়ে থাকার গল্প। জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সহায়তায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে একে একে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন অভিভাবকেরা।

কেউ আট দিন ধরে সন্তানকে খুঁজছেন। কেউ কয়েকশ দিন। আবার কারও সন্তানের খোঁজ নেই কয়েক হাজার দিন ধরে।

মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলতে গিয়ে অনেকেই কেঁদে ফেলেন। কেউ সন্তানের ছবি বুকে জড়িয়ে রাখেন। কেউ আবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সরকারের কাছে সন্তানকে খুঁজে দেওয়ার আবেদন জানান।

‘আমার মেয়েটাকে কেউ দেখেছেন?’

স্বপ্না আক্তারের তিন বছরের মেয়ে রূপা আক্তার গত বছরের ২৯ আগস্ট ঢাকার পল্লবী এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়।

বাড়ির কাছের একটি দোকানের সামনে থেকে শিশুটিকে নিয়ে যেতে দেখা যায় এক তরুণকে। আশপাশের নজরদারি ক্যামেরার দৃশ্যেও সেই মুহূর্ত ধরা পড়ে।

কিন্তু এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও রূপার কোনো খোঁজ মেলেনি।

রোববার স্বপ্না আক্তার তাঁর ১০ বছরের ছেলে মো. সিয়ামকে সঙ্গে নিয়ে অনুষ্ঠানে আসেন। সিয়ামের হাতে ছিল ছোট বোন রূপার ছবি।

স্বপ্নার স্বামী মো. রাজন ভ্যানে করে শিশুদের খেলনা বিক্রি করেন।

রূপা নিখোঁজ হওয়ার পর পল্লবী থানায় সাধারণ ডায়েরি করে পরিবার। এরপর অনেক জায়গায় খোঁজ করেছেন তাঁরা। তবু কোনো সন্ধান মেলেনি।

কাঁদতে কাঁদতে স্বপ্না বলেন, “আমার মেয়েটা বেঁচে আছে, না মারা গেছে, সেটাও জানি না।”

তিনি আরও বলেন, গ্রামের বাড়িতে তাঁর ছোট একটি ভিটে আছে। কেউ যদি তাঁর মেয়েকে ফিরিয়ে দিতে পারেন, সেই সম্পত্তিও তিনি দিয়ে দিতে প্রস্তুত।

স্বপ্নার আবেদন, মানুষ যেন নিখোঁজ শিশুদের ছবি ও ভিডিও বেশি করে ছড়িয়ে দেন। হয়তো কোথাও কেউ রূপাকে চিনে ফেলবেন।

তিনি বলেন, “মরার আগে অন্তত একবার আমার সন্তানকে দেখতে চাই।”

ছেলেকে খুঁজতে সারা দেশ ঘুরেছেন বাবা

মো. নজরুল ইসলাম পুলিশের একজন অবসরপ্রাপ্ত কনস্টেবল।

তাঁর ছেলে মো. তামিম, ডাকনাম আবদুল্লাহ, রাজবাড়ীর পাংশার সরিষা প্রেমটিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিল।

গত বছরের ২০ মে বাড়ি থেকে স্কুলের উদ্দেশে বের হয়েছিল ১৫ বছরের তামিম।

এরপর আর বাড়ি ফেরেনি।

বাবা নজরুল ইসলাম ছেলের খোঁজে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গেছেন।

একসময় হতাশা তাঁকে এমন জায়গায়ও নিয়ে গেছে, যেখানে সাধারণভাবে মানুষ যায় না। কেউ পরামর্শ দিয়েছেন কবিরাজের কাছে যেতে, কেউ আবার কথিত অলৌকিক উপায়ে খোঁজ নেওয়ার কথা বলেছেন।

ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় তিনি সবই করেছেন।

তামিম তাঁর দুই সন্তানের মধ্যে ছোট।

নজরুল বলেন, “আমার যা আছে সব দিয়ে দেব। রাস্তায় থাকব। শুধু আমার সন্তানকে ফেরত চাই।”

পাঁচ মিনিটের মধ্যে হারিয়ে গেল দুই বছরের শিশু

২২ বছর বয়সী তাহুরা ইসলামের ছেলে মো. তোহা আদনানের বয়স দুই বছর।

এক মাস ২০ দিন ধরে সে নিখোঁজ।

তাহুরা জানান, তিনি নবাবগঞ্জের দোহারে শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন।

ছেলেকে একটি কক্ষে মোবাইল ফোন দিয়ে বসিয়ে পাশের কক্ষে যান।

পাঁচ মিনিট পর ফিরে এসে দেখেন, ছেলে নেই।

মোবাইল ফোনটি বিছানাতেই পড়ে ছিল।

পরে তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। কিন্তু এখনো শিশুটির কোনো সন্ধান মেলেনি।

এক যমজ বোন অপেক্ষায় আরেকজনের জন্য

সবুজ মিয়া ও তাঁর স্ত্রী চম্পা বেগম তাঁদের মেয়ে লামিয়াকে নিয়ে অনুষ্ঠানে এসেছিলেন।

লামিয়ার যমজ বোন সামিয়া নিখোঁজ আড়াই বছর ধরে।

বাড়ির সামনে খেলতে গিয়ে সে হারিয়ে যায়।

চম্পা বেগম এক প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে অপহরণের মামলা করেছিলেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি তিন মাস পর জামিনে মুক্ত হন।

কিন্তু সামিয়া আর ফেরেনি।

চম্পা জানান, ছয় মাস আগে একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওতে এক শিশুকে দেখে তাঁর মনে হয়, সে-ই সামিয়া।

পরে জানতে পারেন, শিশুটি যশোরে একটি পরিবারের সঙ্গে রয়েছে।

তিনি সেখানে যান।

চম্পার অভিযোগ, মেয়েটিকে ফিরিয়ে আনতে তিনি পুলিশের যথেষ্ট সহায়তা পাননি। পুলিশ জানায়, ওই শিশুটি সামিয়া নয়।

তবু পরিবারটির খোঁজ থামেনি।

কারও সন্তান নিখোঁজ কয়েক মাস, কারও কয়েক বছর

চাঁদপুরের ছয় বছরের খাদিজা পাশের বাড়িতে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিল।

তার খোঁজ নেই ১ হাজার ৯৭৪ দিন ধরে।

ঢাকার ধামরাইয়ের পাঁচ বছরের গণেশও পাশের বাড়ির কাছে খেলতে গিয়ে হারিয়ে যায়।

সে নিখোঁজ ৩৩৩ দিন ধরে।

দিনাজপুরের মনিরুজ্জামান মনির আট বছরের মেয়ে মানতাশা গত বছরের মে মাসে বাড়ির সামনে থেকে নিখোঁজ হয়।

মেয়েকে ফেরত পাওয়ার আশায় মুক্তিপণের টাকাও নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু মেয়েকে ফেরত পাননি।

রোববার অনুষ্ঠানে মেয়ের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

মেয়ে ফিরেছে, কিন্তু অপেক্ষা করতে পারেননি মা

অন্য পরিবারগুলোর গল্প যখন অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তায় ভরা, তখন আজাদ রহমানের গল্পে আছে ফিরে পাওয়ার আনন্দও।

তাঁর সাত বছরের মেয়ে আশফিয়াকে গত মাসে পাওয়া গেছে।

এক বছর নিখোঁজ থাকার পর মেয়েটি বাবার কাছে ফিরেছে।

আজাদের অভিযোগ, গত বছরের জুলাইয়ে টঙ্গীর বাসার সামনে থেকে পুরোনো কর্মস্থলের বিরোধের জেরে তাঁর মেয়েকে অপহরণ করা হয়েছিল।

ফিরে আসার পর আশফিয়া বাবাকে জানায়, কেউ তাকে পপকর্ন খেতে দিয়েছিল। এরপর একটি ট্রেনে তুলে দেয়।

কীভাবে বাড়ি ফিরতে হবে, তা সে মনে করতে পারেনি।

পরিবার মাসের পর মাস জানতেই পারেনি, শিশুটি কোথায় আছে।

কিন্তু মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আগেই ঘটে আরেক ট্র্যাজেডি।

আশফিয়া নিখোঁজ হওয়ার পাঁচ মাস পর তার মা শামসুন্নাহার মারা যান।

আজাদ রহমানের ভাষ্য, মেয়েকে হারানোর শোক তাঁর স্ত্রীকে ভেঙে দিয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত গত মাসে পুলিশ আশফিয়াকে পুবাইলের একটি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে খুঁজে পায়।

বাবা-মেয়ের পুনর্মিলন হয়।

কিন্তু সেই মুহূর্ত দেখার জন্য আশফিয়ার মা আর বেঁচে ছিলেন না।

চলতি বছরও নিখোঁজ দুই হাজারের বেশি শিশু

রোববারের অনুষ্ঠানে তুলে ধরা তথ্য অনুযায়ী, শিশু নিখোঁজের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নিখোঁজ শিশুদের বিষয়ে ১৭ হাজার ৮০৮টি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল।

২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৪১৪।

২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২২ হাজার ৫৫০-এ।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে নিখোঁজ শিশুদের বিষয়ে ১৫ হাজার ৭১৭টি সাধারণ ডায়েরি হয়েছে।

এদের বেশির ভাগকে পরে উদ্ধার করা হয়েছে।

তবে ২ হাজার ৩৮ জন শিশুর এখনো কোনো খোঁজ মেলেনি।

সব নিখোঁজের ঘটনাই অপহরণ বা পাচারের ঘটনা নয়। বিভিন্ন কারণে শিশুরা হারিয়ে যেতে পারে।

কিন্তু যেসব পরিবারের সন্তান এখনো ফেরেনি, তাদের কাছে কারণের চেয়ে বড় হয়ে আছে অপেক্ষা।

নিখোঁজ শিশু খুঁজতে জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা

জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. সাদাত রহমান জানান, ২০২৪ সালে সিলেটে মুনতাহা নামের এক শিশু নিখোঁজ ও পরে নিহত হওয়ার ঘটনার পর দেশে দ্রুত সতর্কতা ব্যবস্থা চালুর দাবি জোরালো হয়।

এক লাখ মানুষের স্বাক্ষরসংবলিত আবেদনে নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত খুঁজে বের করতে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত ‘অ্যাম্বার অ্যালার্ট’-এর মতো ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হয়।

এর ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি পরীক্ষামূলকভাবে মিসিং আরজেন্ট নোটিফিকেশন বা মুন অ্যালার্ট চালু করা হয়।

বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের সহায়তায় এবং জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ জন্য ১৩২১৯ নম্বরের একটি সহায়তা সেবাও চালু করা হয়েছে।

বর্তমানে সারা দেশে নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করা এবং শিশু নিখোঁজ প্রতিরোধে এই ব্যবস্থা ব্যবহারের উদ্যোগ চলছে।

পরিবারগুলোর দাবি—পুরোনো মামলাও নতুন করে দেখা হোক

রোববারের অনুষ্ঠানে নিখোঁজ শিশুদের পরিবারগুলো সরকারের কাছে কয়েকটি দাবি জানায়।

তাঁরা চান, নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত খুঁজে বের করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক।

পুরোনো ও অমীমাংসিত ঘটনাগুলোর তদন্ত নতুন করে শুরু করা হোক।

দীর্ঘদিন ধরে চলা মামলার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হোক।

শিশু নিখোঁজ ও পাচার ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

এ ছাড়া সন্তান হারিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক কষ্টে থাকা পরিবারগুলোকেও সহায়তার আওতায় আনার দাবি জানান তাঁরা।

স্বপ্না আক্তারের কাছে অবশ্য সব দাবি এসে থামে একটি জায়গায়।

তিনি জানেন না, রূপা কোথায় ঘুমায়। কার সঙ্গে আছে। নিরাপদে আছে কি না। এমনকি বেঁচে আছে কি না, তাও জানেন না।

তবু অপেক্ষা থামেনি।

এক বছরেরও বেশি সময় পরও তিনি একই প্রশ্ন করছেন—

“আমার সন্তান কোথায়?”

মন্তব্য

Scroll to Top