শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬ | Columbus |
| Columbus
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

তিন বছরের সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতি: কেনো দুর্বল হয়ে পড়ছে প্রবৃদ্ধির ভিত?

- ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৩১ পূর্বাহ্ন

ঢাকা, ১২ আগষ্ট ।  বালাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন করে প্রচণ্ড চাপে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৩৪ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে আমদানি ব্যয় ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৭১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও রপ্তানি আয় প্রায় অপরিবর্তিত থেকে হয়েছে ৪৩ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার।

এই সংখ্যাগুলো শুধু বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধির চিত্র  তুলে ধরছে না; বরং দেশের অর্থনীতির ভেতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্যও সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা কিছুটা ফিরেছে বটে, অন্যদিকে বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে ফিরতে পারেনি।

আমদানি বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ কোথায়?

সাধারণভাবে একটি উন্নয়নশীল দেশের আমদানি বৃদ্ধিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার কারণ নেই। নতুন কারখানা, যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির মাধ্যমে উৎপাদন বাড়লে বড় বাণিজ্য ঘাটতিও ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

আসলে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির উদ্বেগের জায়গাটি হলো, আমদানি বাড়লেও সেই বৃদ্ধির সঙ্গে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের সমান গতি দেখা যাচ্ছে না। মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি এখনও দুর্বল এবং শিল্পের কাঁচামালের আমদানিও খুব শক্তিশালী নয়। ফলে আমদানি ব্যয়ের বড় অংশ জ্বালানি, খাদ্য, প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য ও অন্যান্য সরবরাহের ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত বলেই অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

অর্থাৎ অর্থনীতিতে চাহিদা কিছুটা স্বাভাবিক হচ্ছে, কিন্তু সেই চাহিদা এখনও বড় ধরনের নতুন বিনিয়োগ বা শিল্প সম্প্রসারণে রূপ পরিগ্রহ করছে না।

বৈশ্বিক অনিশ্চয়তারও বড় প্রভাব রয়েছে

বলাই বাহুল্য, বাংলাদেশের বাণিজ্য পরিস্থিতি শুধু অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ফল নয়। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতাও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছে।  জ্বালানির উচ্চমূল্য আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে অনেক। একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যুদ্ধজনিত সরবরাহ সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্য নীতি বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারে চাপ তৈরি করেছেই চলেছে।

ফলে, বাংলাদেশকে একদিকে বেশি দামে প্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানি কিনতে হচ্ছে, অন্যদিকে রপ্তানি আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। এই বৈপরীত্যই বাণিজ্য ঘাটতিকে আরও বৃদ্ধি  করছে।

শেখ হাসিনার আমলের অর্থনীতি: সাফল্য ও দুর্বলতার দুই দিক

বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে হলে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলের অর্থনৈতিক উত্তরাধিকারকে কিছুটা ফিরে দেখা প্রয়োজন। তাঁর সরকারের সময়ে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। করোনা মহামারির আগে কয়েক বছর প্রবৃদ্ধি ৭ থেকে ৮ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। তৈরি পোশাক রপ্তানি, প্রবাসী আয়, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্প্রসারণ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দ্রুত বড় হতে সাহায্য করেছিল।

পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামোর মতো বড় প্রকল্পগুলো দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটায়। শিল্প ও রপ্তানি খাতেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান বিশেষ পোক্তভাবে প্রকাশিত ছিলো।

তবে এটাও ঠিক, এতসব সাফল্যের পাশাপাশি শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষ কয়েক বছরে অর্থনীতির ভেতরে বেশ কিছু দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মূল্যস্ফীতি বাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হয়, টাকার অবমূল্যায়ন ঘটে, বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ব্যাংকিং খাতের নানা সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। অর্থাৎ শেখ হাসিনার সরকারের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি একদিকে প্রবৃদ্ধির হার ধরে রেখেছিল ঠিক, কিন্তু তার ভেতরেই বেশ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা জমা হচ্ছিল।

বর্তমান সরকারের সময়ে ভিন্ন এক চিত্র

বর্তমান অর্থনীতির সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলো, বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি লাভ করলেও, বৈদেশিক খাতে তাৎক্ষণিক কোনো বড় সংকট তৈরি হয়নি। এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রবাসী আয়।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। এর ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে এবং সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে প্রায় ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে।

অর্থাৎ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতিতে একটি স্বস্তির জায়গা তৈরি হয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও প্রবাসী আয়ের শক্তিশালী প্রবাহ সেই চাপের বড় অংশ সামলে দিচ্ছে।

কিন্তু এখানেই বর্তমান অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্যটি রয়েছে।

বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরছে, অথচ বিনিয়োগ উৎপাদনের গতি এখনও সেই অনুপাতে ফিরছে না।

প্রবাসী আয় কতটা ভরসা দিতে পারে?

রেকর্ড প্রবাসী আয় নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় শক্তি। এটি বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়াচ্ছে, আমদানি ব্যয়ের চাপ সামলাতে সাহায্য করছে এবং অর্থনীতিকে তাৎক্ষণিক ভারসাম্যহীনতা থেকে রক্ষা করছে।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শুধু প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভর করে অর্থনীতির কাঠামোগত শক্তি বাড়ানো সম্ভব নয়। একটি শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, শিল্পে নতুন বিনিয়োগ, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন পণ্যের প্রবেশ।

এখানেই বাংলাদেশের সামনে বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়ে ।

জ্বালানি ব্যয়ও বড় ঝুঁকি

বাণিজ্য ঘাটতির সঙ্গে জ্বালানি বাজারের সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়। একই সঙ্গে দেশে বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার ফলে শিল্প উৎপাদনের খরচও বেড়ে যায়।

র্থাৎ জ্বালানির উচ্চমূল্য একই সঙ্গে দুটি চাপ ‍সৃষ্টি করে। এটি একদিকে বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ায়, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।

বর্তমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আসল চ্যালেঞ্জ বাণিজ্য ঘাটতি নয়, উৎপাদন বাড়ানো

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন শুধু ২৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাণিজ্য ঘাটতি নয়। বরং প্রশ্ন হলো, এই আমদানি কি আগামী দিনের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াচ্ছে?

যদি আমদানি মূলত যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও শিল্পের কাঁচামালের জন্য বাড়ে, তাহলে বড় বাণিজ্য ঘাটতিও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির বিনিয়োগ হতে পারে। কিন্তু আমদানি বাড়ার বিপরীতে রপ্তানি স্থবির থাকে এবং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ দুর্বল থাকে, তাহলে সেই ঘাটতি অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপই তৈরি করবে।

বর্তমান তথ্য গুলো তাই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি অসম পুনরুদ্ধারের ছবি । বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী হচ্ছে, প্রবাসী আয় রেকর্ড করছে, কিন্তু বিনিয়োগ ও রপ্তানির গতি এখনও সেই মাত্রায় ফিরছে না।

সামনে অর্থনীতির আসল পরীক্ষা

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তাৎক্ষণিক বৈদেশিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীল প্রবৃদ্ধির মধ্যে একটি সেতু তৈরি করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ যে প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো ও রপ্তানি সক্ষমতা তৈরি করেছিল, তার শক্তিশালী দিকগুলো ধরে রাখার পাশাপাশি সেই সময়ের শেষ দিকে জমে ওঠা আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠাই বর্তমান  বিএনপি সরকারের বড় পরীক্ষা।

কারণ, শেষ পর্যন্ত একটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তি শুধু রিজার্ভ বা প্রবাসী আয়ের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না। বিনিয়োগ কতটা বাড়ছে, শিল্প কতটা সম্প্রসারিত হচ্ছে, কত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে এবং রপ্তানি কতটা প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে, তার ওপরই নির্ভর করে অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি।

বাংলাদেশ আপাতত বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তির জায়গায় ফিরেছে। এখন সেই স্বস্তিকে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করা যায় কি না, সেটিই আগামী দিনের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

 

মন্তব্য

Scroll to Top