বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | Amsterdam |
| Amsterdam
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

“আদিবাসী” স্বীকৃতির দাবি: সাংস্কৃতিক অধিকার নাকি বৃহত্তর রাজনৈতিক এজেন্ডা?

- ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১০ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশের সংবিধান, কিংবা সামাজিক বন্ধনের প্রেক্ষাপটে এদেশে আবহমানকাল হতে বসবাসরত বিভিন্ন উপজাতি বা নৃগোষ্ঠীর জাতিগত সংজ্ঞা নিয়ে অস্পষ্টতা নেই। তবুও পাহাড়ে বাস করছেন এমন কোনো উপজাতির শিক্ষিত জনসংখ্যার কারো কারো দাবি, তাদের সকলকে বাংলাদেশেরআদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতিপ্রদান একটি ন্যায্যতা। নিয়ে এখন টগবগে বিতর্ক চলমান। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ () ধারায় ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্র এই সকল জনগোষ্ঠীর অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন এবং বিকাশের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সংবিধানের এই ধারাটি আরও বলিষ্ঠ হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির মাধ্যমে। এখানে চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চলের জনগণের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা হয়েছে, যেখানে তাদের সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক অধিকারকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়াও হয়েছে।

তবুও কেন এমন দাবি? প্রাথমিক দৃষ্টিতে সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির জন্য এটি একটি নিরীহ দাবি বলে মনে হতে পারে, কিন্তু তা আসলে একটি বিস্তৃত এবং অনেক বেশি জটিল রাজনৈতিক চিন্তার প্রসূত এজেন্ডার অংশ বলেই প্রতিভাত। দাবির প্রতি নমনীয়তা বাংলাদেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং জাতীয় ঐক্যের জন্য একটি হুমকি সৃষ্টি করতে পারে বলে অনেক বিশেষজ্ঞের অভিমত। কেননা, এর ফলে এদেশে বাঙালি পাহাড়িদের মাঝে একটি প্রকট বিভাজন রেখার সৃষ্টি এবং এর সূত্র ধরে বাইরের হস্তক্ষেপের পথ সুগম হতে পারে।

জাতীয় পরিচয় সাংবিধানিক কাঠামোর প্রশ্ন

আসলে এটি কী শুধুমাত্র একটি সাংস্কৃতিক বা ঐতিহাসিক আলোচনা, না কী এর আড়ালে আইনগত চ্যালেঞ্জ, যা বাংলাদেশের একক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং সুপ্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক কাঠামোকে ভেঙে দেওয়ার আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে?

এই বিতর্কের মূল প্রতিপাদ্য হলোজাতীয় পরিচয়এবংআদিবাসীমর্যাদার দাবি কি সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য প্রকৃত স্বাধীন ইচ্ছা দ্বারা চালিত, নাকি এটি একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যা আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন অর্জন করতে বা সরাসরি বিচ্ছিন্নতার দিকে নিয়ে যেতে প্রাথমিক প্রক্রিয়ার অংশ? সেটিই প্রশ্ন হিসেবে উত্থাপিত।

১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিধি: ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার বিভাজনের ভিত্তি

জাতীয় পরিচয়এবংআদিবাসীমর্যাদার দাবি সংক্রান্ত এই বিতর্কের ভিত্তির উৎপত্তি ১৯০০ সালের চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টস বিধি, যা ব্রিটিশ উপনিবেশী শাসনের একটি উত্তরাধিকার। এই বিধির আওতায়, ব্রিটিশদের দ্বারা পৃথকভাবে পরিচালিত করতে এই অঞ্চলকে বাকি বাংলা থেকে আলাদা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

এই বিধির মূল বিধানসমূহ মতে, এটি পার্বত্য অঞ্চলকে একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে উপকমিশনারকে প্রধান প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার এখতিয়ার প্রদান করেছে। এর ফলে, এই এলাকার মধ্যে বিভিন্ন আইন বিধিনিষেধের প্রয়োগের বিষয়টিও নির্ধারিত। এখানে জমি ব্যবস্থাপনার জন্য বিধান রয়েছে, যার মধ্যে জনস্বার্থে জমি অধিগ্রহণ এবং বসতবাড়ির জন্য জমি অধিকরণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। বিচার ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এর মাধ্যমে, যার মধ্যে বিভিন্ন কর্মকর্তার ক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত।

মূলত এই বিধি প্রথমে একটি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল, ক্ষমতায়ন নয়। কিন্তু এটি আজও বিভাজক নীতির ভিত্তি তৈরি করে রেখেছে। এটি কোনোভাবেই পাহাড়ি অঞ্চলের জনগণকে ক্ষমতাশালী করার জন্য ছিল না; বরং এটি ব্রিটিশদের একটি কৌশলগত অস্ত্র ছিল, যা সেই অঞ্চলে অন্যদের, বলা ভালো বিপ্লবীদের, প্রবেশাধিকার সীমিত করা এবং বিরোধী উপনিবেশিক মতামত ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ব্যবহৃত হতো। সেটিকেই আজকের এই বাংলাদেশেআদিবাসীস্বীকৃতির দাবির মূল ভিত্তি হিসেবে সামনে নিয়ে এসেছে কিছু কৌশলী মানুষ।

১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তি: প্রতিশ্রুতি, অপূর্ণতা নতুন বিতর্ক

সকলেই দেখেছি ১৯৯৭ সালে পার্বত্যচট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি সই হয়েছিল বাংলাদেশ সরকার এবং অঞ্চলের আদিবাসী জনগণের মধ্যে বছরের পর বছর চলা সশস্ত্র সংঘর্ষের অবসান ঘটাতে। চুক্তি অনুযায়ী স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার সংস্কার, ভূমির অধিকার সুরক্ষা এবং অঞ্চলের সামরিক বাহিনীর ধীরে ধীরে প্রত্যাহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

তবে, এই প্রতিশ্রুতিগুলির বাস্তবায়ন ছিল অসম্পূর্ণ এবং অপ্রতুল, যার ফলে আদিবাসী জনগণের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। চুক্তির মূল বিষয়গুলো, বিশেষত ভূমির অধিকার, সামরিক উপস্থিতি এবং স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত বিষয়গুলো সঠিকভাবে সমাধান না হওয়ায়আদিবাসীহিসেবে জাতিগত জনগণের স্বীকৃতি প্রাপ্তির জন্য তাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দাবির জন্ম হয়েছে।

তবে সামগ্রিক পরিধি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এই বিশেষ আইনি স্বীকৃতির দাবিটি সাংস্কৃতিক সংরক্ষণের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঐক্যকে চ্যালেঞ্জ করার এবং একটি আলাদা আইনি পরিচয় তৈরি করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত। এমন হওয়ার আশঙ্কাই প্রবল, যে এটি আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন বা এমনকি স্বাধীনতার দিকেও পরিচালিত হতে পারে বাইরের দেশের উসকানিতে।

আন্তর্জাতিক আইন, ভূরাজনীতি পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা

যদি জাতিসংঘ জারিকৃতআদিবাসী জনগণের অধিকার ঘোষণাপত্রএবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কনভেনশন ১৬৯ পর্যালোচনা করা হয়, তবে দেখা যায়, এই রেজুলেশনটি আদিবাসী জনগণের জন্য একটি আইনি সুরক্ষা প্রদান, তাদের আত্মনির্ধারণ, সমষ্টিগত ভূমির মালিকানা এবং সম্প্রদায়ের জন্য নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করেছে।

এর ফলে, “আদিবাসীমর্যাদা চাওয়ার মাধ্যমে, অঞ্চলের জাতিগোষ্ঠীগুলো তাদের পূর্বপুরুষদের ভূমি বহিরাগত শোষণ থেকে রক্ষা করতে পারবে। জাতীয় আইন অগ্রহণযোগ্য হলে তা এড়িয়ে চলতে পারবে। যদি এই হয় আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষা বিধান, তবে এখানে নিঃসন্দেহেই উল্লেখযোগ্য ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বিদ্যমান। এর ফলে আন্তর্জাতিক আইনের সুরক্ষা বলয়ে বাংলাদেশের অঞ্চলে বিদেশি হস্তক্ষেপ এবং নজরদারির পথ উন্মুক্ত করতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেখতেই পাচ্ছি, বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষে রাখাইন বিদ্রোহীদের এবং মিয়ানমার জান্তার মধ্যে ভয়াবহ সীমান্ত সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। তার সঙ্গে দেশের ভেতরে কেএনএফ গেরিলাদের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

মূলত, ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলটি সীমান্তবর্তী এলাকা উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল সেই ১৯৮০ এর দশকে, যখন ভারতের বিরুদ্ধে চাকমা বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ এবং গোলাবারুদ দিয়ে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ ছিল। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগণের ওপর চলমান সামরিক দমননীতির ফলে বাংলাদেশকে এখন প্রায় পনেরো লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বোঝা বহন করতে হচ্ছে।

এটি শুধু শরণার্থীর বোঝা বহন নয়, এর মাধ্যমে পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চল প্রবল সামাজিক এবং দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা সংক্রান্ত নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এসব কারণে সুস্পষ্টতই সেই অঞ্চল থেকে সামরিক বাহিনী সরিয়ে আনার সুযোগ বিদ্যমান নয়। এখনো সেখানে ক্যান্টনমেন্ট আছে বলেই বাংলাদেশের অংশ হিসেবে পার্বত্যচট্টগ্রাম টিকে আছে।

সমাধানের পথ: ভূমির অধিকার, ন্যায়বিচার জাতীয় ঐক্য

এই যে এত বিতর্ক, তার উত্তর হলো, বাঙালি ও পাহাড়ি মিলে একটি বোধ, এই দেশ আমাদের সকলের।

সুতরাং এখানে পাহাড়ি জনগণের ভূমি অধিকারের প্রতি সঠিক আইনি ভিত্তি প্রদান করা অবশ্য কর্তব্য। একারণে “আদিবাসী” মর্যাদা স্বীকৃতির মাধ্যমে জাতিগত বিশেষত্বের পথে না গিয়ে, পার্বত্যচট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ হওয়া উচিত আরও অধিক হারে সেখানে ন্যায়বিচার এবং সমতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় আইনের প্রয়োগ।

সরকারকে ১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তির অধীনে করা বাস্তবায়নযোগ্য প্রতিশ্রুতিগুলোর সুরক্ষা দিতে হবে। মূলত, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার এবং স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত সমস্যাগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান দিতে হবে।

সামরিক উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর দ্বারা যেন কোনোভাবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে সেনাবাহিনীকে কঠোর নজর রাখতে হবে।

একটি নিয়মিত কর্মপ্রবাহের মতো করে একই সময়ে সরকারকে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে অঞ্চলের সব জাতিগত সম্প্রদায় নিজেদের মূল্যবান এবং বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত মনে করে, যেমন মনে করে এসেছে।

সাংস্কৃতিক অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া, ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা সমর্থন করা এই প্রক্রিয়ার অপরিহার্য উপাদান। তবে এই পদক্ষেপগুলোকে জাতীয় ঐক্য এবং বাংলাদেশের সংবিধানের অখণ্ডতার প্রতি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একত্রিত প্রতিশ্রুতি হিসেবে আরও বিকশিত করতে সঠিক সহায়তামূলক সামাজিক বোধ সৃষ্টিতে উৎসাহ জোগাতে হবে।

এক বাংলাদেশ, বহু জাতিসত্তা, অভিন্ন জাতীয় পরিচয়

বলা বাহুল্য, এখন সময় এসেছে বাংলাদেশের জন্য এমন একটি পথ চিহ্নিত করার, যেখানে দেশের সকল নাগরিক একটি অখণ্ড আবেগে জাতীয় পরিচয়ে নিজেকে বাঁধবে। যেখানে জনগণ অনুভব করবে তারা সকলেই রাষ্ট্রপ্রণীত আইন দ্বারা সুরক্ষিত এবং তাদের জন্য সকল প্রকার নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত সুনিশ্চিত।

সময় হয়েছে আবারও বলার, চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, ত্রিপুরা, গারো, ওঁরাও, তঞ্চ্যঙ্গা, ম্রো, বম, পাংখো, চাক, খেয়াং, খুমি, লুসাই, কোচ, ডালু, কুকি, রাখাইন, মণিপুরী, হাজং, খাসিয়া, মং, বর্মন, মালপাহাড়ি, মুন্ডা, কোল, কন্দ, পাঙন, লাওরা, মুরং, রাজবংশী, পাত্র, বাগদী, ভিল, টিপরা, রনজোগী, হদি, খারিয়া ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠীর সকলে মিলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির বুকের ধন।

সকল বাঙালি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠীর ভাইবোনকে ভালোবাসার বন্ধনে আলিঙ্গনে ধরে রাখবে। সকল প্রকার ভালোবাসায় যেমন শত শত বছর ধরে চলে আসা বন্ধন ছিল, সেই একই ধারায় সকলে মিলে পরস্পর বাস করবে।

এমন করেই সকলেই নির্মাণ করবে বাংলাদেশে জীবন প্রবাহের সৌন্দর্যের আসল রূপ।

লেখক:  মুজতবা আহমেদ মুরশেদ একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কবি কথাসাহিত্যিক  

মন্তব্য

Scroll to Top