ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরিকল্পনার কেন্দ্রে যে ভারত ক্রমেই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. পল কাপুরের সাম্প্রতিক বক্তব্যে তারই স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, ওয়াশিংটন শুধু একটি শক্তিশালী ভারত চায় না; তারা এমন একটি ভারত চায়, যে নিজস্ব কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রেখেও চীনের আঞ্চলিক প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।
বাংলাদেশের জন্য এখানেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ দক্ষিণ এশিয়াকে এখন আর কেবল ভারত-পাকিস্তান প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সীমান্ত নিরাপত্তা কিংবা আঞ্চলিক অর্থনীতির বিচ্ছিন্ন কাঠামোর মধ্যে দেখার সুযোগ নেই। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর, মিয়ানমার, বাংলাদেশ এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক এখন একই কৌশলগত মানচিত্রের অংশ। ফলে ওয়াশিংটনের ভারতকেন্দ্রিক ইন্দো-প্যাসিফিক নীতি ঢাকার জন্যও সরাসরি ভূরাজনৈতিক নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।
কাপুরের বক্তব্যে আসল বার্তা কোথায়
পল কাপুরের বক্তব্যের মূল সুর হলো—চীনের আধিপত্য ঠেকাতে ইন্দো-প্যাসিফিকে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন ভারত প্রয়োজন। এটি নিছক ভারতকে নিয়ে মার্কিন প্রশংসা নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর এশিয়া কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
চীন দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবকাঠামো, বাণিজ্য, ঋণ, বন্দর, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে যে প্রভাববলয় তৈরি করছে, তার মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে সব জায়গায় উপস্থিত থাকতে পারবে না। ফলে ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামরিক শক্তি এবং আঞ্চলিক প্রভাবকে কাজে লাগানো ওয়াশিংটনের কাছে স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয়।
কিন্তু এখানেই একটি সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই একটি ‘স্বাধীন ভারত’ চায়, তাহলে সেই ভারতকে কেবল মার্কিন কৌশলের আঞ্চলিক বাহক হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। ভারতের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক, ইরান, মধ্য এশিয়া, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং চীনের সঙ্গে সীমান্ত বাস্তবতা—সবকিছুকে বিবেচনায় রেখেই নয়াদিল্লি সিদ্ধান্ত নেবে।
অর্থাৎ ওয়াশিংটন-নয়াদিল্লির সম্পর্ক যত গভীরই হোক, ভারত কখনোই পুরোপুরি মার্কিন কৌশলের অধীন রাষ্ট্রে পরিণত হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ?
এই নতুন সমীকরণে বাংলাদেশের গুরুত্ব কমছে না, বরং অন্যভাবে বাড়ছে।বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতীয় উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর, বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক যোগাযোগ, মিয়ানমার সীমান্ত, রোহিঙ্গা সংকট এবং দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সম্ভাব্য সংযোগ—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অবস্থানে রয়েছে।
তাই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশ শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় অংশীদার নয়; বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অন্যদিকে চীনের কাছেও বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের উপস্থিতি ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। ফলে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে যেখানে ভারত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র—তিন পক্ষের স্বার্থ কোনো না কোনোভাবে এসে মিলছে।
এখানে ঢাকার সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ হলো তার ভূগোল ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা।
ভারতকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি কোথায়
একটি শক্তিশালী ভারত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যেমন চীনের ভারসাম্য রক্ষার উপাদান, বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি ততটা সরল নয়।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের মধ্যে সহযোগিতা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং রাজনৈতিক আস্থার মতো জটিল প্রশ্ন।
ফলে ওয়াশিংটন যদি চীনের মোকাবিলায় ভারতের আঞ্চলিক ভূমিকা বাড়াতে চায়, তাহলে বাংলাদেশের স্বার্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারতের স্বার্থের সঙ্গে একাকার হয়ে যাবে—এমন ধারনার পুরো বাস্তবতাও নেই, তবে এর মাঝে বাংলেদেশের জন্যে কৌশলী কূটনীতির খেলা বিদ্যমান।
ঢাকার জন্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে একটি প্রশ্ন: ভারতকে শক্তিশালী করার মার্কিন কৌশল কি বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসরকে শক্তিশালী করবে, নাকি পরোক্ষভাবে সংকুচিত করবে?
এই প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে কীভবে তার কূটনৈতিক কৌশল প্রণয়ন করবে, নেতৃত্ব দিতে আগ্রহী হবে, সেই দক্ষতার উপর এটি দাঁড়িয়ে।
‘ভারসাম্য’ শব্দটির ভেতরের ভূরাজনীতি
পল কাপুরের বক্তব্যে ‘ভারসাম্য’ ও ‘সার্বভৌমত্ব’ রক্ষার কথা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো শক্তি যখন আঞ্চলিক ভারসাম্যের কথা বলে, তখন সেই ভারসাম্য কার স্বার্থে এবং কোন কাঠামোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হবে—সেটিও বিবেচনা করতে হয়।
চীনের প্রভাব ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র যদি ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য অংশীদারকে নিয়ে একটি বিস্তৃত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কাঠামো শক্তিশালী করে, তাহলে ইন্দো-প্যাসিফিকের ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর সামনে নতুন সুযোগ যেমন তৈরি হবে, তেমনি নতুন চাপও আসবে।
বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো কোনো একটি শক্তির প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠা নয়; বরং সব পক্ষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক রেখে নিজের জাতীয় স্বার্থের জায়গাটি পরিষ্কার রাখা।
চীনের সঙ্গে সম্পর্কও তাই নতুনভাবে দেখতে হবে
বাংলাদেশের চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু ‘চীনপন্থা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেমন ভুল, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে ‘চীনবিরোধী অবস্থান’ হিসেবে দেখাও অতিসরলীকরণ।
বাংলাদেশের প্রয়োজন অবকাঠামো, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, বাজার, জ্বালানি নিরাপত্তা, সামুদ্রিক অর্থনীতি এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা। এসব ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু সেই সহযোগিতা যেন কোনো একক শক্তির ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশে পরিণত না হয়, সেটিই মূল বিষয়।
ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির শক্তি হওয়া উচিত বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, সিদ্ধান্ত নিজের স্বার্থে—এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ।
ওয়াশিংটনের জন্যও বাংলাদেশের গুরুত্ব আলাদা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার এবং নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহকে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দৃষ্টিতে দেখলে পুরো ছবিটি ধরা পড়বে না।
বাংলাদেশের অবস্থান বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে। মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা সংকট, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংযোগ—এসবই যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
সুতরাং ঢাকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা এখন শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; তা বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত।
আসল ‘ম্যাজিক’ সম্ভবত ভারত নয়, ভারসাম্য
‘পল কাপুর ম্যাজিক’ কথাটি রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়, কিন্তু কাপুরের বক্তব্যের গভীরে গেলে দেখা যায়, ম্যাজিকটি আসলে ভারতকে ঘিরে নয়; ভারতকে ব্যবহার করে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ভারসাম্য তৈরির মার্কিন প্রচেষ্টায়।
চীনকে ঠেকাতে ভারতকে শক্তিশালী করা হবে, কিন্তু ভারতকে স্বাধীনও থাকতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ছোট রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষার কথাও বলা হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
ঢাকাকে এমন কোনো ভূরাজনৈতিক শিবিরে আটকে পড়া উচিত নয়, যেখানে অন্য শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে ছাপিয়ে যায়। আবার ‘ভারসাম্য’ রক্ষার নামে কোনো বড় শক্তির চাপকেও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের সামনে তাই প্রয়োজন কৌশলগত ভারসাম্য, সক্রিয় কূটনীতি এবং দৃঢ় সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমন্বয়।
শেষ পর্যন্ত ইন্দো-প্যাসিফিকের ভবিষ্যৎ শুধু যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতায় নির্ধারিত হবে না। বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলো কতটা নিজেদের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখতে পারে, সেটিও এই নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠবে।
আর পল কাপুরের বার্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সম্ভবত এটাই,- চীনের উত্থান ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে যতটা প্রয়োজন মনে করছে, ততটাই প্রয়োজন একটি এমন দক্ষিণ এশিয়া, যেখানে ছোট রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম সিদ্ধান্তের জায়গাটিও অক্ষুণ্ণ থাকে। বাংলাদেশের জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—এই পরিবর্তনশীল ভারসাম্যের মধ্যে নিজের জায়গাটি অন্যের হাতে ছেড়ে না দিয়ে নিজেই নির্ধারণ করা।

মন্তব্য