বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্রবল বাতাসের মুখে উপকূলীয় জনপদের প্রাকৃতিক ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বরগুনার টেংরাগিরি ও নলবুনিয়া বনাঞ্চলে মাত্র চার দিনে প্রায় ৯০০ গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রশ্রয়েই সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে মূল্যবান গাছ কেটে পাচার করছে।
প্রতিবাদ করতে গেলেও স্থানীয়দের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য, গাছ কাটার বিরুদ্ধে কথা বললে উল্টো তাদেরই বন বিভাগের মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। ফলে চোখের সামনে বন উজাড় হতে দেখেও অনেকে মুখ খুলতে সাহস পান না।
অভিযোগের পর বন বিভাগ সরেজমিনে গিয়ে অবৈধভাবে গাছ কাটার সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছে এবং মামলা করেছে। এদিকে ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটিও গঠন করেছে উপজেলা প্রশাসন।
চার দিনে প্রায় ৯০০ গাছ
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে টেংরাগিরি বনাঞ্চল এবং সেখান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার উত্তরে শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকত-সংলগ্ন নলবুনিয়া বনাঞ্চলে গাছ কাটা শুরু করে দুর্বৃত্তরা।
১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই বনাঞ্চল থেকে প্রায় ৯০০ গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে টেংরাগিরি বন থেকেই প্রায় ৪০০ এবং শুভসন্ধ্যা-সংলগ্ন নলবুনিয়া বনাঞ্চল থেকে প্রায় ৫০০ গাছ কাটা হয়েছে। কেটে নেওয়া গাছের মধ্যে রেইনট্রি, কেওড়া, গেওয়া, ঝাউ ও জিলাপি গাছ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রিফাত, বাবুল হাওলাদারসহ কয়েকজন জানান, দীর্ঘদিন ধরেই সংঘবদ্ধ চক্র বন থেকে গাছ চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে।
তাদের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছ থেকেই উল্টো গাছ কাটার মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি আসে। এ কারণে বন ধ্বংস হতে দেখেও অনেকে প্রতিবাদ করার সাহস পান না।
‘বন বিভাগের লোকজন জড়িত’
সোনাকাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ড. কামরুজ্জামান বাচ্চুও গাছ কাটার ঘটনায় বন বিভাগের লোকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন।
তিনি বলেন, ‘গাছ কাটার সঙ্গে বন বিভাগের লোকজন জড়িত। তারা জড়িত না থাকলে এতদিন বসে চোরেরা গাছ কাটে, আর তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি?’
গাছ কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, চক্রের সদস্যরা সাধারণত রাতের আঁধারে কাটা গাছ পাচার করে। অনেক সময় গাছ কেটে তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে না নিয়ে বনের ভেতরেই ফেলে রাখা হয়। পরে সুবিধাজনক সময়ে সেগুলো নিয়ে যাওয়া হয়।
এমনকি গাছ কাটার প্রমাণ মুছে ফেলতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গাছের শিকড় পর্যন্ত উপড়ে ফেলা হয় বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
বিট কর্মকর্তা বললেন, ‘কিছু জানি না’
গাছ কাটার অভিযোগের বিষয়ে বন বিভাগের নলবুনিয়া বিট কর্মকর্তা মো. শাওন বলেন, ‘গাছ কাটার বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’
এরপর তিনি আর কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
তবে তালতলী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. জিয়াউল ইসলাম জানিয়েছেন, অভিযোগ পাওয়ার পর বন বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং অবৈধভাবে গাছ কাটার সত্যতা পেয়েছেন।
এ ঘটনায় মামলা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
একই বিভাগের দুই কর্মকর্তার এমন ভিন্ন বক্তব্যের মধ্যেই স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীরা অভিযোগ তুলেছেন, বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের একটি অংশের সহযোগিতা ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে এভাবে গাছ কেটে পাচার করা সম্ভব নয়।
ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল
টেংরাগিরি বন বরগুনার তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নে অবস্থিত। বন বিভাগের হিসাবে এর আয়তন ১৩ হাজার ৬৪৪ একর।
একসময় এই অঞ্চল সুন্দরবনের অংশ ছিল। ১৯৬০ সালের ১২ জুলাই এলাকাটিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করা হয়। পরে ১৯৬৭ সালে এর নামকরণ হয় টেংরাগিরি বনাঞ্চল।
বনের প্রধান গাছের মধ্যে রয়েছে গেওয়া, জাম, ধুন্দল, কেওড়া, সুন্দরী, বাইন, করমচা, কেওয়া, তাল, কাঁকড়া, বনকাঁঠাল, রেইনট্রি, হেতাল, তাম্বুলকাটা ও গরান।
এই বন বিভিন্ন প্রজাতির বন্য প্রাণীরও আবাসস্থল। এখানে কাঠবিড়ালি, বানর, সজারু, বুনো শূকর, কচ্ছপ, শিয়াল, বনমোরগ এবং প্রায় ৪০ প্রজাতির সাপসহ বিভিন্ন প্রাণীর বিচরণ রয়েছে।
উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানের কারণে টেংরাগিরি ও আশপাশের বনাঞ্চলের গুরুত্ব শুধু জীববৈচিত্র্য রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্রবল বাতাসের বিরুদ্ধে এসব বন প্রাকৃতিক প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।
বন্য প্রাণী শিকারেরও অভিযোগ
পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা—ধরা’র তালতলী শাখার সমন্বয়ক আরিফুর রহমান বলেন, তারা তথ্য পেয়েছেন, মাত্র চার দিনে টেংরাগিরি ও নলবুনিয়ার বন থেকে ৯০০টির বেশি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।
তিনি বলেন, এই বনাঞ্চল ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র বাতাসের আঘাতের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে মানুষকে রক্ষা করে। এভাবে বন উজাড় হতে থাকলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি উপকূলীয় জনপদে দুর্যোগের ঝুঁকিও বাড়বে।
শুধু গাছ কাটাই নয়, বনাঞ্চলের বন্য প্রাণী শিকারেরও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
আরিফুর রহমান বলেন, কাঁকড়া, গুইসাপ ও বন্য শূকরসহ বিভিন্ন প্রাণী শিকারের অভিযোগ তাদের কাছে এসেছে।
বন বিভাগের লোকজন এসব ঘটনা জানলেও নীরব ভূমিকা পালন করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি
গাছ কাটার অভিযোগ সামনে আসার পর গত ১৪ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অতীশ সরকার।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু জাফর মোহাম্মদ ইলিয়াসকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে।
ইলিয়াস জানান, বৃহস্পতিবার তিনি তদন্ত কমিটি গঠনের চিঠি পেয়েছেন। আগামী সপ্তাহে তদন্তকাজ শুরু করবেন তারা।
ইউএনও অতীশ সরকার বলেন, ‘টেংরাগিরি ও নলবুনিয়া বনের গাছ কাটার খবর পেয়ে পাঁচজনকে সদস্য করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তাদের দেওয়া প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
একদিকে বন বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে অবৈধভাবে গাছ কাটার সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন, অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও পরিবেশবাদীরা বন বিভাগেরই কিছু লোকের বিরুদ্ধে সহযোগিতার অভিযোগ তুলেছেন। ফলে তদন্তে কারা গাছ কেটেছে, কীভাবে এত বিপুলসংখ্যক গাছ কয়েক দিনের মধ্যে কেটে নেওয়া সম্ভব হয়েছে এবং বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা কারও গাফিলতি বা সম্পৃক্ততা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উপকূলের মানুষের জন্য বিষয়টি শুধু চুরি হওয়া কাঠের আর্থিক মূল্যের প্রশ্ন নয়। টেংরাগিরি ও নলবুনিয়ার প্রতিটি বনভূমি বঙ্গোপসাগরের দুর্যোগপ্রবণ উপকূলে মানুষ, জীববৈচিত্র্য ও বসতিকে রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে। সেই প্রতিরক্ষা দুর্বল হলে তার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য দিতে হতে পারে পুরো উপকূলীয় জনপদকে।

মন্তব্য