লন্ডন, ২০ আগস্ট — প্রায় ছয় বছর যুক্তরাষ্ট্রে কাটানোর পর দুই সন্তানকে নিয়ে যুক্তরাজ্যে ফিরছেন প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কেল। ২০২০ সালে ব্রিটিশ রাজপরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর পর এই প্রথম পরিবার নিয়ে ব্রিটেনে স্থায়ীভাবে ফেরার উদ্যোগ নিয়েছেন এই দম্পতি।
তবে এই প্রত্যাবর্তনকে রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক দায়িত্বে ফিরে আসা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। হ্যারি ও মেগান আগের মতোই ‘নন-ওয়ার্কিং রয়্যাল’ হিসেবে থাকবেন এবং সরকারি বা রাজকীয় কোনো দায়িত্ব পালনের পরিকল্পনা নেই।
তাদের ফেরার অন্যতম প্রধান কারণ দুই সন্তান—প্রিন্স আর্চি ও প্রিন্সেস লিলিবেটের শিক্ষা। সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাজ্যে তাদের নতুন স্কুলজীবন শুরু হওয়ার কথা। সন্তানদের ব্রিটিশ পরিবেশে বড় করে তোলার পাশাপাশি পরিবারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আরও ঘনিষ্ঠ করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
রাজপরিবারের সঙ্গে তিক্ততার পর নতুন প্রত্যাবর্তন
২০২০ সালে রাজকীয় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়ে হ্যারি ও মেগান যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার পর ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক দ্রুতই টানাপোড়েনের দিকে যায়। রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ, ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের তীব্র নজরদারি এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগকে তারা ব্রিটেন ছাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সময় অপরাহ উইনফ্রির সঙ্গে বহুল আলোচিত সাক্ষাৎকার এবং পরে হ্যারির আত্মজীবনী Spare প্রকাশের পর রাজপরিবারের সঙ্গে তাদের দূরত্ব আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। বইটিতে রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত নানা বিষয় উঠে আসায় ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
সন্তানদের স্কুলই ফেরার অন্যতম কারণ
হ্যারি ও মেগানের ব্রিটেনে ফেরার সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাদের দুই সন্তানের শিক্ষার বিষয়টি সরাসরি যুক্ত বলে জানা গেছে।
প্রিন্স আর্চি ও প্রিন্সেস লিলিবেট সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাজ্যে স্কুলে যাওয়ার কথা। ফলে সন্তানদের শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পরিবারটি যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে যুক্তরাজ্যে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে তারা কোনো রাজকীয় বাসভবনে উঠবেন না। বরং ব্যক্তিগত আবাসনে থেকে নিজেদের অর্থায়নেই জীবনযাপন করবেন বলে জানা গেছে। কোথায় তারা বসবাস করবেন, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
রাজকীয় দায়িত্বে ফিরছেন না
যুক্তরাজ্যে ফিরে গেলেও হ্যারি ও মেগান রাজপরিবারের কর্মরত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন না। ২০২০ সালে জ্যেষ্ঠ রাজকীয় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর পর তাদের যে অবস্থান তৈরি হয়েছিল, সেটিই বহাল থাকছে।
অর্থাৎ তাদের এই প্রত্যাবর্তনকে রাজপরিবারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পুনর্মিলন বা রাজকীয় দায়িত্বে প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং এটি মূলত পারিবারিক জীবন ও সন্তানদের ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত।
রাজা চার্লসের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ কিছুটা গলেছে
তবে হ্যারি ও মেগানের সঙ্গে রাজপরিবারের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে।
রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে হ্যারির ব্যক্তিগত যোগাযোগ সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। বিশেষ করে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে রাজার যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের বিষয়টি পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হ্যারি ও মেগানের দুই সন্তান আর্চি ও লিলিবেটের সঙ্গে রাজা চার্লসের সাক্ষাৎও দীর্ঘদিনের দূরত্বের পর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে হ্যারির বড় ভাই প্রিন্স উইলিয়ামের সঙ্গে সম্পর্ক এখনো আগের মতোই জটিল ও দূরত্বপূর্ণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা নিয়ে পুরোনো বিতর্ক এখনো আছে
ব্রিটেনে ফেরার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ছিল হ্যারি ও মেগানের অন্যতম বড় উদ্বেগ। রাজকীয় দায়িত্ব ছাড়ার পর হ্যারি ব্রিটেনে অবস্থানের সময় আগের মতো স্বয়ংক্রিয় সরকারি নিরাপত্তা সুবিধা পান না।
নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াইও চালিয়ে আসছেন। বিশেষ করে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ব্রিটেনে আসার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার পর্যাপ্ত নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে কি না, সেটি তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে।
এই নিরাপত্তা বিতর্কের কারণে এর আগে হ্যারি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ব্রিটেনে আসার ব্যাপারে দ্বিধার কথাও জানিয়েছিলেন।
রাজপরিবারের বাইরে নতুন অধ্যায়
সব মিলিয়ে হ্যারি ও মেগানের এই প্রত্যাবর্তনকে রাজপরিবারে তাদের পুরোনো ভূমিকা ফিরে পাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তারা যুক্তরাজ্যে ফিরছেন মূলত ব্যক্তিগত নাগরিক হিসেবে, নিজেদের পেশাগত জীবন ও আর্থিক স্বাধীনতা বজায় রেখেই।
তবে ব্রিটেনে বসবাসের ফলে রাজপরিবারের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত যোগাযোগের সুযোগ বাড়বে। বিশেষ করে সন্তানদের দাদা-দাদি ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
ছয় বছর পর ব্রিটেনে তাদের প্রত্যাবর্তন তাই একদিকে যেমন একটি পারিবারিক সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের পর রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার নতুন সম্ভাবনারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই প্রত্যাবর্তন শেষ পর্যন্ত পারিবারিক পুনর্মিলনের দিকে কতটা এগোয়, তা এখনো সময়ই বলে দেবে।

মন্তব্য