রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬ | Columbus |
| Columbus
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

পশ্চিমবঙ্গের সাবেক ডেপুটি স্পিকার আশিস ব্যানার্জির অস্বাভাবিক মৃত্যু

- ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩১ পূর্বাহ্ন

কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সাবেক ডেপুটি স্পিকার ও প্রবীণ তৃণমূল কংগ্রেস নেতা আশিস ব্যানার্জিকে বীরভূমের রামপুরহাটে দলীয় কার্যালয়ে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। রোববার সকালে তার বাড়িসংলগ্ন তৃণমূল কার্যালয় থেকে মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে একটি কথিত সুইসাইড নোটও পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি পুলিশ।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, রামপুরহাট পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হাটতলাপাড়ায় নিজের বাড়ির পাশে অবস্থিত তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যালয়ের ভেতরে আশিস ব্যানার্জির ঝুলন্ত মরদেহ পাওয়া যায়। পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়।

দীর্ঘদিনের এই তৃণমূল নেতার আকস্মিক মৃত্যু পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া কথিত চিঠিতে রাজনীতি, দুর্নীতির অভিযোগ এবং তার ব্যক্তিগত অবস্থান সম্পর্কে বিভিন্ন বক্তব্য থাকার খবর সামনে আসায় মৃত্যুর ঘটনা ঘিরে রাজনৈতিক আলোচনাও শুরু হয়েছে।

‘জীবনে কখনো দুর্নীতিতে জড়াইনি’

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কথিত সুইসাইড নোটের বক্তব্য অনুযায়ী, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন আশিস ব্যানার্জি।

চিঠিতে তিনি লিখেছেন, “আমি কখনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। রাজনীতিতে যোগ দেওয়াটাই ভুল ছিল।”

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিজের মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করেননি তিনি। পরিবারের তরুণ সদস্যদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পরামর্শও দিয়েছেন বলে ওই চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে।

ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করে আশিস ব্যানার্জি দাবি করেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়াননি। দলের ভেতরের কিছু কর্মকাণ্ডের সঙ্গে একমত না হলেও সেগুলোর প্রতিবাদ করতে না পারার কথাও তিনি লিখেছেন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

তবে উদ্ধার হওয়া চিঠিটি প্রকৃতপক্ষে আশিস ব্যানার্জির লেখা কি না, সেটি পুলিশের তদন্ত ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার বিষয়। একইভাবে চিঠিতে করা বিভিন্ন দাবিও স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়নি।

টিআরডিএ নিয়ে অভিযোগের জবাব

কথিত চিঠির একটি উল্লেখযোগ্য অংশে তার দায়িত্ব পালন করা তারাপীঠ-রামপুরহাট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা টিআরডিএ নিয়ে ওঠা অভিযোগের প্রসঙ্গ রয়েছে।

আশিস ব্যানার্জি সংস্থাটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। টিআরডিএ-সংক্রান্ত আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগে নিজের কোনো ভূমিকা ছিল না বলে চিঠিতে দাবি করেছেন তিনি।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আশিস ব্যানার্জি লিখেছেন, প্রায় সাড়ে তিন বছর তার কাছে কোনো ফাইল দেওয়া হয়নি। তিনি দরপত্র কমিটিতেও ছিলেন না এবং চেকে স্বাক্ষর করার ক্ষমতাও তার ছিল না। ভবনের নকশা অনুমোদন বা অনাপত্তিপত্র দেওয়ার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন না বলে দাবি করেছেন।

তিনি আরও লিখেছেন, “সারা জীবনে কোনো কাজ করে দেওয়ার বিনিময়ে আমি একটি পয়সাও নিইনি।”

তার দাবি, বিভিন্নভাবে তাকে বদনাম করার চেষ্টা হয়েছিল।

তবে এসব বক্তব্য আশিস ব্যানার্জির কথিত চিঠিতে থাকা দাবি। সংশ্লিষ্ট অনিয়মের অভিযোগ বা তার ভূমিকা নিয়ে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে এগুলোকে দেখা হচ্ছে না।

আগের দিনই স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে অংশ নেন

মৃত্যুর মাত্র এক দিন আগে রামপুরহাটে ভারতের স্বাধীনতা দিবসের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন আশিস ব্যানার্জি। সেখানে তিনি জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।

সেই অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতির সময় প্রকাশ্যে এমন কোনো পরিস্থিতির কথা সামনে আসেনি, যা পরদিন তার মৃত্যুর ইঙ্গিত দিতে পারে।

পুলিশ এখন মৃত্যুর আগের সময়ের ঘটনাপ্রবাহ, উদ্ধার হওয়া চিঠি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আলামত খতিয়ে দেখছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

পাঁচবারের বিধায়ক, ছিলেন ডেপুটি স্পিকার

বীরভূমের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন পরিচিত মুখ ছিলেন আশিস ব্যানার্জি। রামপুরহাট আসন থেকে টানা পাঁচবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

২০০১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত তিনি এই আসনের প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব পান এবং সর্বশেষ বিধানসভার মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত ওই পদে ছিলেন।

মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারে মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন আশিস। রাজনীতিতে পূর্ণকালীনভাবে যুক্ত হওয়ার আগে রামপুরহাট কলেজে অধ্যাপনা করতেন তিনি।

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে অবশ্য নিজের দীর্ঘদিনের আসন রামপুরহাটে বিজেপির ধ্রুব সাহার কাছে পরাজিত হন আশিস ব্যানার্জি।

নির্বাচনে শুধু আশিসের ব্যক্তিগত পরাজয় নয়, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোতেই বড় পরিবর্তন আসে। দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তৃণমূল কংগ্রেস সরকার হারায় এবং বিজেপি রাজ্যটিতে প্রথমবার সরকার গঠন করে।

দলীয় দায়িত্ব থেকেও সরে দাঁড়িয়েছিলেন

সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনের আগেই তৃণমূলের কিছু সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন আশিস ব্যানার্জি।

চলতি বছরের শুরুর দিকে বীরভূম জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের কোর কমিটির চেয়ারম্যান পদ থেকে তিনি পদত্যাগ করেন। স্থানীয় পর্যায়ে দলের কার্যক্রম নিয়ে তার অসন্তোষের খবরও তখন ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। তবে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য হিসেবে থেকে যান।

বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর তার রাজনৈতিক তৎপরতাও আগের তুলনায় কমে গিয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে নির্বাচনী পরাজয়, দলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কিংবা দুর্নীতির অভিযোগের সঙ্গে তার মৃত্যুর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত পুলিশ এখন পর্যন্ত জানায়নি।

মৃত্যুর পর প্রশ্ন তুললেন অভিষেক ব্যানার্জি

তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি আশিসের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা এবং জনসমক্ষে তাকে হেয় করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “সাবেক বিধায়ক ও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সাবেক ডেপুটি স্পিকার আশিস ব্যানার্জির মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু হৃদয়বিদারক নয়।”

অভিষেক ব্যানার্জি আশিসকে দীর্ঘদিনের শিক্ষক ও জনসেবক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তিনি সততা, মর্যাদা ও সরলতার সঙ্গে মানুষের সেবা করেছেন। একই সঙ্গে তথ্য-প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই অভিযোগ তুলে কাউকে জনসমক্ষে হেয় করার প্রবণতার সমালোচনা করেন তিনি।

অন্যদিকে আশিস ব্যানার্জিকে সর্বশেষ নির্বাচনে পরাজিত করা বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহা ঘটনার যথাযথ তদন্ত দাবি করেছেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের কাছে তিনি জানান, নির্বাচনের পর আশিস ব্যানার্জির বাড়িতে গিয়ে তার আশীর্বাদ নিয়েছিলেন।

ধ্রুব সাহা বলেন, “রামপুরহাট ও বীরভূমের মানুষ সত্য জানতে চান। আমরা তার মৃত্যুর যথাযথ তদন্ত চাই।”

মন্তব্য

Scroll to Top