বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | Boydton |
| Boydton
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

বিসিএসে সফল হয়েও বাদ ৫৭, মেধায় প্রথমও গেজেটে নেই

- ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১৩ অপরাহ্ন

৪৯তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) নিয়োগের সুপারিশ পাওয়ার পরও ৫৭ প্রার্থী সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ পাননি। তাদের মধ্যে নিজ নিজ বিষয়ে মেধা তালিকায় প্রথম হওয়া প্রার্থীও রয়েছেন।

শিক্ষা ক্যাডারে ৬৬৮ জনকে নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল পিএসসি। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বুধবার প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে ৬১১ জনের নাম এসেছে। অর্থাৎ পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশে থাকা ৫৭ জন নিয়োগের গেজেট থেকে বাদ পড়েছেন।

নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীদের কয়েকজন অভিযোগ করেছেন, পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার যাচাই-বাছাইয়ের কারণে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে এবং ঠিক কোন কারণে নিয়োগ দেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে তারা স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাননি বলে জানিয়েছেন।

কয়েক লাখ প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার একের পর এক ধাপ পেরিয়ে পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও শেষ মুহূর্তে নিয়োগ না পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের কেউ কেউ অভিযোগ তুলেছেন, সরকারি কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা বা অঘোষিত রাজনৈতিক কোটা প্রভাব ফেলছে।

৪৯তম বিসিএসে ইতিহাস বিষয়ে মেধা তালিকায় প্রথম হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. সোহেল রানা। পিএসসির সুপারিশ পাওয়ার পরও চূড়ান্ত গেজেটে নিজের নাম না দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, তাকে গেজেট থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

সমাজকল্যাণ বিষয়ে মেধা তালিকায় প্রথম হয়েও নিয়োগ পাননি আব্দুল্লাহ আল মামুন। তার দাবি, জুলাইয়ের আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণেই তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

ইংরেজি বিষয়ে মেধাক্রমে ১৪তম হয়েছিলেন বুশরা জাহান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মেধাক্রমে ১৩তম ও ১৫তম অবস্থানে থাকা প্রার্থীর নাম গেজেটে থাকলেও তার নাম নেই। কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত না থাকার পরও কেন তাকে নিয়োগ দেওয়া হলো না— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

আরেক প্রার্থী রেদওয়ান আহমেদ তাহমিদ জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও পরিশ্রমের পর ৪৯তম বিসিএসে পিএসসির সুপারিশ পেলেও শেষ মুহূর্তে তার নাম গেজেট থেকে বাদ পড়েছে।

ভেরিফিকেশন পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন

বিসিএসে পিএসসির সুপারিশ পাওয়ার পর চূড়ান্ত নিয়োগের আগে পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রচলিত ব্যবস্থা নিয়ে আগেও প্রশ্ন উঠেছে। জনপ্রশাসনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে গঠিত সংস্কার কমিশনও এ ক্ষেত্রে ভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছিল।

কমিশনের প্রতিবেদনের ৯.২ অনুচ্ছেদে বিসিএসে কৃতকার্য কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে কি না, পুলিশের কাছে মূলত সেই তথ্য চাওয়ার প্রস্তাব করা হয়। প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছ থেকেও তথ্য নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

সংস্কার কমিশন আরও বলেছিল, পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো কর্মকর্তার রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য চাওয়ার প্রথা বাতিল করা উচিত। কমিশনের যুক্তি ছিল, এ ধরনের ব্যবস্থা প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বিদ্যমান বিসিএস নিয়োগ বিধিমালা, ১৯৮১-এর আওতায় নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর স্বাস্থ্যগত অযোগ্যতা বা অপরাধ-সংক্রান্ত বিষয় বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। তবে শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে কোনো প্রার্থীকে নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আপত্তি রয়েছে বিশেষজ্ঞদের।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া ভয়েসকে বলেন, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধ না থাকলে শুধু পুলিশ বা গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাকে নিয়োগবঞ্চিত করার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

সরকারি চাকরিতে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও নিয়োগ না পাওয়ার অভিযোগ সাম্প্রতিক সময়ে আরও উঠেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও প্রায় ২ হাজার ৫০০ প্রার্থীকে নিয়োগবঞ্চিত করার অভিযোগ ওঠে। পরে প্রার্থীদের বিক্ষোভের মুখে তাদের অনেককে নিয়োগ দেয় সরকার।

আগের সরকারের সময়ও বিসিএসে পিএসসির সুপারিশ পাওয়ার পর নিয়োগ না পাওয়ার নজির রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৩৮তম থেকে ৪২তম বিসিএসে অন্তত ২৩৯ প্রার্থীকে নিয়োগের সুপারিশ করেছিল পিএসসি, কিন্তু তারা নিয়োগ পাননি। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর সাধারণত দীর্ঘ প্রস্তুতি, পরীক্ষা ও অপেক্ষার অবসান ঘটে। কিন্তু ৪৯তম বিসিএসের এই ৫৭ প্রার্থীর ক্ষেত্রে পিএসসির সুপারিশ পাওয়ার পরও শেষ ধাপে এসে সেই প্রত্যাশা অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

নিয়োগবঞ্চিত কয়েকজন প্রার্থী বলেছেন, তারা সরকারের কাছে জানতে চান, ঠিক কোন অভিযোগে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়নি, কার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সেই প্রতিবেদনের বিষয়ে নিজেদের বক্তব্য বা আপত্তি জানানোর কোনো সুযোগ তারা পাবেন কি না।

মন্তব্য

Scroll to Top