শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬ | Columbus |
| Columbus
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বরফ গলছে না থমকে গেছে !

- ২০ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৩৩ অপরাহ্ন

ঢা কা, ২০ আগষ্ট – বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিন যাবত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ব্যাপক টানাপোড়েন চলছে। এই সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে সাম্প্রতিককালে ঢাকা ও নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে ব্যাপক কূটনৈতিক উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে।

কিন্তু চলমান শীতল সম্পর্কের বরফ সহসা গলবে কিনা অর্থাৎ উন্নতি হবে কিনা এনিয়ে সন্দিহান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহল। গত কয়েকদিনে দুই দেশের সরকারের মধ্যে বিভিন্ন কথা চালাচালির ধরন দেখে তারা এই আশংকা প্রকাশ করেছেন।

তাঁদের মতে এই সম্পর্ক আবারও জোড়া লাগাতে হলে দুই দেশেরই উচিত উদার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা। তা না হলে শীঘ্রই এই বরফ গলবে না অর্থাৎ স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গত প্রায় দুই বছরে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক একেবারে তলানিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পর দুই দেশের পক্ষ থেকেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়।

বিশেষ করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভা স্পিকার ওম বিড়লার উপস্থিতি এবং তারও আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।

পরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান দিল্লী সফর করেন। সব মিলিয়ে দুই দেশের পক্ষ থেকেই আস্থা বৃদ্ধির চেষ্টা দেখা গেছে। কিন্তু এর মধ্যেই দুই সরকারের মধ্যে অস্বস্তির বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায় দিল্লিতে শেখ হাসিনার একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের ঘটনা।

জুলাই ছাত্র আন্দোলনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে ওই সংবাদ সম্মেলনের একদিন আগেই শেখ হাসিনা যাতে ভারতের মাটি ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচার করতে না পারে, সে বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে ভারত সরকারের সহযোগিতা চেয়েছিল বাংলাদেশের সরকার।

কিন্তু ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি) সাউথ এশিয়া আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বক্তব্য রাখার পর রাতে কড়া ভাষায় একটি বিবৃতি দেয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

তারেক রহমানের সরকার শুরু থেকেই ভারতে থাকা শেখ হাসিনার বক্তব্য বিবৃতি দেওয়াসহ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখা এবং শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বিভিন্ন সময় দিল্লিকে অনুরোধ জানানোর কথা সরকারের দিক থেকে বলা হচ্ছিল। তবে ভারতের পক্ষ থেকে বার বারই বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে বাংলাদেশের অনুরোধ খতিয়ে দেখছে তারা।

এর আগে ভারতের প্রবীণ রাজনীতিক এবং সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশে নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আবারও স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত দেন।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই সম্পর্কের বরফ কিছুটা গলতে শুরু করেছে বলে কূটনৈতিক মহলের যখন ধারণা করছিলেন তখনই ভারতে নির্বাসিত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্ক আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠে।

শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ঢাকার বক্তব্য হচ্ছে এই ধরনের কর্মকাণ্ড দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের চলমান প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

অন্যদিকে নয়াদিল্লি জানিয়েছে, ওই সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং বাংলাদেশের প্রশাসন সম্পর্কে শেখ হাসিনা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার সঙ্গেও ভারত সরকার একমত নয়।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি থেকে দেওয়া সাম্প্রতিক বক্তব্যকে ঘিরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সম্প্রতি বৈঠক করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।

বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক যোগাযোগ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে একটি “অনুকূল পরিবেশ” তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

একই সময়ে বাংলাদেশ শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের কাছে করা অনুরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে নয়াদিল্লি জানিয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধটি তারা নিজেদের আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী পর্যালোচনা করছে।

আর বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেছিলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার ‘খুবই ভালো আলোচনা হয়েছে’। তারা এখন সামনের দিকে তাকাচ্ছেন।

তিনি তখন বলেছিলেন, “(তারেক রহমানের ভারত সফর বিষয়ে) আমাদের আমন্ত্রণ তো আগে থেকে আছে। ভারতের জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী আর লুকিং ফরোয়ার্ড, অ্যান্ড উই আর পজিটিভ।

দুই নেতা সাথে বসলে আলোচনা হলে… ডেমোক্রেসিতে ইস্যু থাকবে। ইস্যু না থাকলে ওটা ডেমোক্রেসি না। আমাদের ইস্যু হবে, বাংলাদেশের ইস্যু হবে। কিন্তু মানুষের ইস্যু একটাই – ভালো সম্পর্ক। আর ভালো সম্পর্ক হবে উইন উইন সিচুয়েশনে।”

বাংলাদেশে নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদীর এটি ছিলো প্রথম বৈঠক। গত জুনে তিনি বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং প্রণয় কুমার ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হন।

তারেক রহমানের ভারত সফর বাতিল

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরের সম্ভাবনা আপাতত বাতিল হয়ে গেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে বলেছে, “এই সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন”।

ঢাকায় রোববার দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম।

এর আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। ১৪ আগস্ট দিল্লিতে আয়োজিত নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

সংবাদ সম্মেলনে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছি। এর পাশাপাশি ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে অংশ নেওয়ার জন্যও ভারতের তরফ থেকে তাঁকে সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এই আমন্ত্রণগুলো ইতিমধ্যে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে নতুন কোনো অগ্রগতি হলে তা পরবর্তী সময়ে জানিয়ে দেওয়া হবে।’

এর আগে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো আভাস দিয়েছিল যে আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি দুই দিনের সফরে ভারত যেতে পারেন তারেক রহমান। পাশাপাশি ঢাকায় বাংলাদেশের কর্মকর্তারাও গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের প্রস্তুতি নেওয়ার আভাস দিয়েছিলেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শহীদুল করিম রবিবার ঢাকায় সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে বলেন, “দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের দ্রুত ফেরত পাঠাতে এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ঘাতকদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি। বাংলাদেশ এই জবাবের অপেক্ষায় আছে।”

উল্লেখ্য তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা ভারতীয় লোকসভার স্পীকার দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

এছাড়া ভারতের দিক থেকে আরও একটি আমন্ত্রণ ছিল। সেটি হলো চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে ব্রিকসের যে সম্মেলন হবে সেখানে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাতের পর এসব আমন্ত্রণের কথা জানিয়ে বলেছিলেন, তারা তখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শহীদুল করিম রবিবারের ব্রিফিংয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ‘উভয় দেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছে’।

“তবে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট নতুন দিল্লিতে যেভাবে প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন, তাতে এই প্রক্রিয়ার পরিবেশ বিনষ্ট হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছি। আমরা মনে করি, এই সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন,” ব্রিফিংয়ে বলেন তিনি।

শহীদুল করিম বলেন, “দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের দ্রুত ফেরত পাঠাতে এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ঘাতকদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি। বাংলাদেশ এই জবাবের অপেক্ষায় আছে।”

“এ সময় সরকারের পক্ষ থেকে পুনর্ব্যক্ত করা হয়, সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে প্রতিবেশীসহ অন্যান্য সকল দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে আমরা আমাদের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ (বাংলাদেশ প্রথম) নীতি অব্যাহত রাখব,” বলেন তিনি।

এদিকে ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের আগে ঢাকা থেকে কিছু শর্তের কথা বলা হয়েছে।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দেশের (বাংলাদেশের) ভেতরে কট্টরপন্থী গোষ্ঠী এবং জামায়াতে ইসলামীর মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে নয়াদিল্লিকে কঠোর শর্ত দিয়েছে ঢাকা। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক অপরাধী ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া এবং তারেক রহমানের সফরের জন্য একটি ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরি করতে সহায়তা করা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কূটনৈতিক মহলের অনেকেই এ ঘটনাকে বিরোধী পক্ষগুলোর ‘কঠোর শর্ত’ দেওয়ার দাবির কাছে সরকারের ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবে দেখছেন। এসব শর্ত এমনভাবে দেওয়া হয়েছে, যা ভারতের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে মেনে নেওয়া আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব।
ভারত সরকারের একাধিক সূত্র টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলেছে, ব্রিকস সম্মেলন এবং দ্বিপক্ষীয় সফর—দুই ক্ষেত্রেই তারেক রহমানকে দেওয়া আমন্ত্রণ বহাল রয়েছে। এখন সফরের সময় নির্ধারণের বিষয়টি ঢাকার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

ভারত ২১ আগস্টকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে প্রস্তাব করেছিল। আর নয়াদিল্লিতে আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকসের ওই সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বিবৃতির ফলে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় সফরের সম্ভাবনা কার্যকর অর্থে বাতিল হয়েছে।

একটি রাজনৈতিক সূত্রের বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘জ্বালানিসংকটসহ বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে (বাংলাদেশ) সরকার চাপের মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টিও এখনো অমীমাংসিত রয়েছে। ফলে ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্কের অগ্রগতি এমনকি থমকেও যেতে পারে।’

বিষয়টি নিয়ে ভারতের আরেক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাসহ অন্যদের প্রত্যর্পণের যে অনুরোধ করেছে, সেটিকে ঢাকার অনেকেই ‘রেড লাইন’ বা ‘চূড়ান্ত সীমারেখা’ হিসেবে দেখছেন। আর নয়াদিল্লিতে অনেকে মনে করছেন, বাংলাদেশের এ প্রত্যর্পণের অনুরোধের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা জানানো এবং বাংলাদেশ সরকারকে একটি ‘সুস্পষ্ট ও যুক্তিসংগত জবাব’ দেওয়া প্রয়োজন।

শেখ হাসিনাসহ অন্যদের প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রথম করেছিল অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২৪ সালে এবং এ বছর ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার ওই অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করেছে।

তবে ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার কথা বলার ঘটনা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তারেক রহমানের সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এ বিষয়ে তারা ভারত সরকারের কাছ থেকে একটি জবাব চায়।

ভারত সরকার বলেছে, শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার ঘটনায় তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং তারা তাঁর বক্তব্যকে সমর্থনও করেনি।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে আরও বলা হয়েছে, এই মুহূর্তে উভয় পক্ষই উত্তেজনা কমাতে একটি কূটনৈতিক সমাধান বের করার চেষ্টা করছে। তারেক রহমানের ভারত সফরে যাওয়ার সম্ভাবনা এখনো রয়েছে, তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য কোনো সমাধানে পৌঁছানো কঠিন বলে মনে হচ্ছে।

এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সন্দেহভাজনদের প্রত্যর্পণ নিয়ে নয়াদিল্লি বলেছে, ‘ভারত পারস্পরিক স্বার্থ ও পারস্পরিকতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও অগ্রগামী সম্পর্ক চায়।’

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাংবাদিকদের বলেন গত ৫ আগস্ট নয়া দিল্লিতে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন করেছে তা নিয়ে ভারতের অবস্থান পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই। এছাড়া শেখ হাসিনা ও হাদি হত্যার সন্দেহভাজনদের প্রত্যর্পণের বিষয়টি নিয়ম অনুয়ায়ী যাচাই করা হচ্ছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কোনো নতুন কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে কোনো আপডেট আমার কাছে নেই।’

উভয় দেশের কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে দুই দেশের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে আলোচনা করে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া উচিত।

তারা বলেন বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে স্বাভাবিক, ইতিবাচক, স্থিতিশীল ও জনকেন্দ্রিক সম্পর্ক চায়, অন্যদিকে ভারতও দুই দেশের জনগণের স্বার্থে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথা বলছে। ফলে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন, সীমান্ত নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ, ভিসা সুবিধা এবং বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের মতো বিষয়গুলোর সমাধানের লক্ষ্যে দুই দেশেরই উচিত একসাথে কাজ করা।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মধ্যে যে টানাপড়েন চলছে, তা স্বাভাবিক করতে গেলে রাজনৈতিক পর্যায়ে আলাপ-আলোচনার বিকল্প নাই।

আর এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের দিকে ইংগিত করে তিনি বলেন, “রাজনৈতিক পর্যায়ে আলাপ-আলোচনা তখনই হতে পারে, যখন দুইজন কোনো একটা জায়গায় দেখা হওয়ার সুযোগ পায়।”

ঢাকায় “র” প্রধান:

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার মধ্যেই সম্প্রতি সরকারি সফরে ঢাকায় আসেন ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের বা ‘র’ প্রধান পরাগ জৈন।

‘র’ প্রধানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পরাগ জৈন স্পেশাল প্রোটেকশন গ্রুপের স্পেশাল সেক্রেটারির দায়িত্বেও রয়েছেন।

সরকারের সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বাংলাদেশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণে এই সফরে পরাগ জৈন চার সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে ভারতীয় প্রতিনিধি দলের এই সফরের বিষয়ে কোনো দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।

বাংলাদেশে আসার আগে চীন সফর করেছেন ‘র’ প্রধান পরাগ জৈন।

ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধানের ঢাকা সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র–এর প্রধানের ঢাকা সফর নিয়ে জল্পনা–কল্পনার কিছু নেই।

সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন “র–প্রধান চীন থেকে এসেছেন। এটা এক ধরনের সফর। তিনি এখানে তার কাউন্টারপার্টের সাথে বৈঠক করবেন। এ নিয়ে সরকার মনে করলে সফরের পর বিবৃতি দিতে পারে। এটা নিয়ে স্পেকুলেশনের কিছু নেই। আমাদের গোয়েন্দা প্রধানও ভারতে গেছেন, সফর করেছেন”।

মন্তব্য

Scroll to Top