ঢাক, ১৪ আগষ্ট, – সামান্য রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত ‘নিউজ উইক’ ম্যাগাজিন ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুকে ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’ বা রাজনীতির ছন্দকার বলে অভিহিত করে। অন্যদিকে বিবিসি’র এক জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু বাংলাদেশকে স্বাধীন করার পর মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হন রাজনীতির সেই ছন্দকার তথা বাঙালি জাতির বরপুত্র।
আগামীকাল ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির ইতিহাসে সেই সবচেয়ে কলঙ্কিত, অভিশপ্ত ও বেদনাবিধুর দিন ৫১ বছর আগে যেইদিনে বাংলাদেশের ঢাকায় সংঘটিত হয় ইতিহাসের অন্যতম বর্বর, নির্মম ও জঘন্যতম হত্যাকান্ড। বঙ্গবন্ধুর এই মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে পলাশী যুদ্ধের পর বাংলার স্বাধীনতার সূর্য আরেকবার অস্তমিত হয়ে পড়ে।
বন্যা, খরা, স্বাধীনতা বিরোধী ও উগ্রবাদীদের সন্ত্রাস-নৈরাজ্য এবং আন্তর্জাতিক চক্রান্তে সৃষ্ট কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশ যখন বঙ্গবন্ধুর দক্ষ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে উন্নয়নের কক্ষ পথে যাত্রা শুরু করে ঠিক সেই মুহুর্তে ৭১’ র পরাজিত শক্তি চরম আঘাত হানে বাংলাদেশের ওপর।
সদ্যস্বাধীন একটা দেশের প্রধান থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন বিশ্বনেতা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রধানরা তাকে মানবতা ও মুক্তির দূত হিসেবে গণ্য করতেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা বিরোধী কুচক্রী মহলের হাতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার খবর শুনে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে সমগ্র বিশ্বসম্প্রদায়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালো রাতে স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তির প্রত্যক্ষ মদদে সেনাবাহিনীর কিছু সংখ্যক উশৃংখল সদস্যদের হাতে ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরের বাড়িতে সপরিবারে নিহত হন ইতিহাসের রাখাল রাজা, স্বাধীনতা মহান স্থপতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি এবং বিশ্বের শোষিত বঞ্চিত মানুষের অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, তাদের হাতে একে একে প্রাণ হারিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী মহিয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেলসহ পুত্রবধু সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল। পৃথিবীর এই নিষ্ঠুরতম হত্যাকান্ড থেকে বাঁচতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর অনুজ শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ, মেয়ে বেবি ও সুকান্তবাবু, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃস্বত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি এবং আবদুল নাঈম খান রিন্টু, স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক ও জাতির পিতার ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছোট মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত, কনিষ্ঠ পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, দৌহিত্র সুকান্ত আব্দুল্লাহ বাবু, ভাইয়ের ছেলে শহীদ সেরনিয়াবাত, আব্দুল নঈম খান রিন্টু, বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা অফিসার কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদ। এ সময় বঙ্গবন্ধুর দু’কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় প্রাণে রক্ষা পান।
বঙ্গবন্ধুর এই নির্মম হত্যাকান্ডের সাথে স্তব্ধ হয়ে যায় দেশের শান্তি, উন্নয়ন ও অগ্রগতির চাকা। খুনি মোশতাক-ফারুক-রশিদ-ডালিম গং বাংলাদেশকে আবার স্বাধীনতার পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়। সদর্পে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় পাকিস্তানের প্রেতাত্মা তথা স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস এবং ৭১ ‘এর যুদ্ধাপরাধীরা।
মূলত ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকেই বাংলাদেশে এক বিপরীত ধারার যাত্রা শুরু হয়। গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে সামরিক শাসনের অনাচারের ইতিহাস রচিত হতে থাকে।
সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর গোটা বিশ্বে নেমে আসে তীব্র শোকের ছায়া এবং ছড়িয়ে পড়ে ঘৃণার বিষবাষ্প। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর নোবেল জয়ী পশ্চিম জার্মানীর নেতা উইলি ব্রানডিট বলেন, মুজিবকে হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যে বাঙালি শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে তারা যে কোন জঘন্য কাজ করতে পারে।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক নীরদ সি চৌধুরী বাঙালিদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বিশ্বের মানুষের কাছে নিজেদের আত্মঘাতী চরিত্রই তুলে ধরেছে।
দ্য টাইমস অব লন্ডন এর ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়, ‘সবকিছু সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে সবসময় স্মরণ করা হবে। কারণ, তাঁকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোন অস্তিত্ব নেই। একই দিন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের লাখ লাখ লোক শেখ মুজিবের জঘন্য হত্যাকান্ডকে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করবে।’
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোস্তাক আহমেদ বিচারের হাত থেকে খুনীদের রক্ষা করতে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করেন। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সকে আইন হিসেবে অনুমোদন করেন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সুদীর্ঘ একুশ বছর পর ক্ষমতায় আসলে ১৯৯৬ সালের ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তিন প্রধান আসামী লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে গ্রেফতার করা হয়।
একই বছরের ২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহকারি (পিএ) এ এফ এম মোহিতুল ইসলাম ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘটিত নারকীয় হত্যাকান্ডের ঘটনায় থানায় একটি এফআইআর করেন।
১৯৯৬ সালের ১৪ নভেম্বর খুনীদের বিচারের হাতে ন্যস্ত করতে পার্লামেন্টে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করা হয়। ১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি সিআইডি এই মামলায় ২০ জনকে অভিযুক্ত করে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে চার্জশীট দাখিল করে এবং একই বছরের ১২ মার্চ ছয় আসামীর উপস্থিতিতে আদালতে বিচার শুরু হয়।
১৯৯৭ সালের ১৯ জুন পর্যন্ত বিচারক বিব্রত হওয়াসহ স্বাধীনতা-বিরোধী চক্রের নানা বাধার কারণে আটবার বিচার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। এভাবে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর মামলার রায়ে বিচারক কাজী গোলাম রসুল ১৫ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। অন্যদিকে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বেঞ্চ ২৪ দিনের শুনানি শেষে বিভক্ত রায় প্রদান করে। বিচারক এম রুহুল আমিন অভিযুক্ত ১৫ আসামীর মধ্যে ১০ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বজায় রাখেন। কিন্তু অপর বিচারক এ বি এম খায়রুল হক অভিযুক্ত ১৫ জনকেই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন।
পরবর্তীতে ২০০১ সালের অক্টোবরের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে বিচার কাজ বন্ধ থাকে। দীর্ঘ ছয় বছর পর ২০০৭ সালের ২৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের মুখ্য আইনজীবী আনিসুল হক সুপ্রিম কোর্টে সংক্ষিপ্ত বিবৃতি প্রদান করেন এবং ২৩ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ ২৭ দিনের শুনানি শেষে ৫ আসামীকে নিয়মিত আপিল করার অনুমতিদানের লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন।
২০০৯ সালের ১২ নভেম্বর- ২৯ দিনের শুনানির পর চূড়ান্ত আপিল শুনানি শেষ হয় এবং আদালত ১৯ নভেম্বর রায়ের তারিখ নির্ধারণ করেন। ওইদিন (১৯ নভেম্বর) বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চে হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রেখে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫ আসামীর দায়ের করা আপিল আবেদন খারিজ করা হয়। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে আসামীদের রিভিউ খারিজ হয়ে গেলে ২৮ জানুয়ারি ৫ আসামীর ফাঁসির রায় কার্যকর করে জাতিকে দায়মুক্ত করা হয়।
২০১০ সালের পর ভারতে পালিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর আরো একজন খুনি আবদুল মাজেদকে দেশে ফেরত আনার পর গত ১২ এপ্রিল, ২০২০ তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দীর্ঘ প্রায় ২১ বছর দেশে সামরিক-বেসামরিক লেবাসে এক প্রকার স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা বিরাজ করে। এই রূদ্ধশাস অবস্থা অব্যাহত থাকে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের পুনরায় ক্ষমতায় আসার পূর্ব পর্যন্ত। আওয়ামী লীগের অগনিত নেতাকর্মীকে হত্যা ও পঙ্গু করা হয়। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বছরের পর বছর কাটাতে হয় মুজিব আদর্শের হাজার হাজার নিবেদিত প্রান নেতা-কর্মী। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বেশিরভাগই এ সময় শাসক গোষ্ঠীর অত্যাচারের কারণে রাতে নিজেদের বাড়িতে ঘুমাতে পারেনি। পাঠ্যপুস্তকে ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রী ও নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস জানা থেকে বঞ্চিত করা হয়। এই সময়ে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও বেতারে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারন নিষিদ্ধ করা হয়, প্রচার করা যায়নি বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। এই ২১ বছর তারা মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সর্ম্পকে তরুণ প্রজন্ম অনেক কিছুই জানতে পারেনি। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরার পর বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা আবার দলের নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করেন এবং দেশে গণতন্ত্র পূনরুদ্ধারের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করেন। দীর্ঘ ২১ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং অগণিত নেতা-কর্মীর আত্মত্যাগের পর দেশে আবার গণতন্ত্র ফিরে আসে। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পর মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশের শোষিত –বঞ্চিত দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর লক্ষ্যে অনেকগুলো যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যার ফলশ্রুতিতে দেশ আবার উন্নয়রে কক্ষে যাত্রা শুরু করে। পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবিস্মরনীয় অবদানকে ছাত্র-ছাত্রী ও তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। টেলিভিশন-বেতারসহ অন্যান্য গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচার শুরু হয়। এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ সঠিক ইতিহাস ও স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতির জনকের অবিস্মরণীয় অবদান নতুন প্রজন্মসহ দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে স্বমহিমায় পূনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যর্থ হয়ে যায় সামরিক-বেসামরিক স্বৈরশাসকদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ও স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর অবিস্মরনীয় অবদানকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা। এর মাধ্যমে আবার প্রমানিত হয়েছিল ইতিহাসকে কেউ মুছে ফেলতে পারেনা। সঠিক ইতিহাস একদিন না একদিন মানুষের কাছে উন্মোচিত হবেই।
২০০১ সালে বিএনপি-জামাত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরবর্তী ৫ বছর বলতে গেলে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরবর্তী অবস্থা বিরাজ করছিল। ওই সময়েও আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয় এবং কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে। এই সময়ে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও বেতারে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ নিষিদ্ধ করা হয়, প্রচার করা যায়নি বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ।
তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের হত্যা, জেল জুলুম ও নির্যাতনের সকল রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে গত দুই বছরে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশি-বিদেশি চক্রান্ত তথা মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর নিষিদ্ধ করা হয় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূতিকাগার বলে পরিচিত ধানমন্ডির সেই ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর বাড়িসহ মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর সকল ভাস্কর্য ও স্মৃতিচিহ্ন মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়। ৫ আগস্টের পর হত্যা করা হয় শত শত নেতা কর্মীকে। নির্যাতন ও হুমকির মুখে দেশ ও ঘর ছেড়েছে লক্ষ লক্ষ নেতা কর্মী। বিনাবিচারে বিনা চিকিৎসায় জেলে মারা গেছে সাবেক মন্ত্রী, এমপিসহ দলের অনেক ত্যাগী নেতাকর্মী। আবারও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও বেতারে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারন নিষিদ্ধ করা হয়, প্রচার করা যায়নি বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধুর যে সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ সেটিকে অস্বীকার করে চিহ্নিত স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি তাঁকে জাতির সামনে হেয় করার জন্য এমন কোন হীন কাজ নেই যে তারা বর্তমানে করছেনা।
তবে আগের মতোই বঙ্গবন্ধুর নাম নিশানা মুছে ফেলার অপচেষ্টা যে ব্যর্থ হয়ে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ, বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা অবিচ্ছেদ্য এবং একই সূত্রে গাঁথা। স্বাধীনতা বিরোধী গুটি কয়েক মানুষ ছাড়া দেশের লক্ষ কোটি মানুষের মণিকোঠায় এখনও জ্বলজ্বল করছে স্বাধীনতা সংগ্রামের এই মহানায়ক।
যতদিন এই পৃথিবী টিকে থাকবে ও বাঙালি জাতি বেঁচে থাকবে ততদিন পযন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে চির জাগরুক হয়ে থাকবেন তার অমর কীর্তির জন্য।
বঙ্গবন্ধু তার সকল সুখ-দুঃখকে বিসর্জন দিয়ে দেশের বহুল আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা এবং শোষিত, বঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন এবং জেলে কাটিয়েছেন দীর্ঘ ১৪টি বছর। স্বাধীনতা ও মানুষের জন্য তার এই মহান আত্মত্যাগ বাঙালি জাতির ইতিহাসে চিরদিন স্বর্ণের অক্ষরে জ্বলজ্বল করে লেখা থাকবে।
এই জন্যই উপমহাদেশের প্রখ্যাত কবি অন্নদাশঙ্কর রায় বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কবিতা রচনা করেছেন ও লিখেছেন—“যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা গৌরি যমুনা বহমান ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান”।
বঙ্গবন্ধু, বাংলা ভাষা, বাঙালী জাতি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা এক ও অবিচ্ছেদ্য এবং একই সূত্রে গাথা। একটি থেকে আরেকটিকে কেউ কখনও বিছিন্ন করতে পারবে না এবং সম্ভবও নয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বহু যড়ষন্ত্র ও অপচেষ্টা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর মহান সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও অবদানকে মুছে ফেলার জন্য। কিন্ত বাঙালি জাতি সেই যড়ষন্ত্র ও অপচেষ্টা রুখে দিয়েছে বার বার তার প্রতি গভীর ও অসীম শ্রদ্ধ্য এবং ভালোবাসা নিবেদনের মাধ্যমে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার বিখ্যাত “শাখী তুলির বল” কবিতায় লিখেছেন— “যতবার হত্যা করো জন্মাবো আবার, দারুণ সূর্য হবো লিখবো নতুন ইতিহাস”। এই কবিতার পংক্তির সাথে বঙ্গবন্ধুর মহান সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের যে দারুণ মিল রয়েছে তার সূত্র ধরে বলা যায়, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলেও তার আদর্শ ও স্বপ্নকে কেউ কোনদিন এই পৃথিবী থেকে মুছে ফেলতে পারবে না। এটাই প্রতিষ্ঠিত সত্য।
বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। তিনি কোন একটি দলের একক সম্পদ নন, এই সম্পদ সমগ্র বাঙালি জাতির। তাঁকে অস্বীকার করা মানে বাঙালি জাতি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও ইতিহাসকে অস্বীকার করা। তাঁকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন মানে বাঙালি জাতি ও স্বাধীনতাকে শ্রদ্ধা জানানো। তাই আসুন জাতির জনকের ৫১তম শাহাদত বার্ষিকীতে আমরা সবাই তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই এবং তিনি যে সুখী, সমৃদ্ধ ও দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন তা বাস্তবায়নে নতুন করে শপথ গ্রহণ করি।
বিশ্বনেতাদের কাছে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন একজন জ্যোতির্ময় ব্যক্তিত্ব
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অধিকার ও মর্যাদা আদায়ে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গভীর তাৎপর্যপূর্ণ স্বাধীনতা সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন জনগণের নেতা এবং তাদের সেবায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তাঁকে দেওয়া বঙ্গবন্ধু খেতাবে দেশের মানুষের প্রতি এই দেশপ্রেমিক নেতার গভীর ভালোবাসা প্রতিফলিত হয়।
১৯৭১ সালে জার্মানির চ্যান্সেলর ছিলেন উইলি ব্রান্ডিট। ১৯৭৭ সালে পশ্চিম জার্মানিতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, বাংলাদেশের ভূখণ্ড সম্পর্কে আগে তার ধারণা ছিল না। কিন্তু ডেথ সেলে বন্দি অবস্থায় শেখ মুজিব যে ম্যাজিক পাওয়ার প্রদর্শন করে একটা জাতিকে স্বাধীন করেছেন, সেটা বিশ্বনেতাদের কাছে অলৌকিক ঘটনার মতো ছিল। বিশ্বনেতারা তাকে এক পলক দেখার জন্য অধীর হয়ে উঠেছিল।
এরপর ক্ষোভ প্রকাশ করে উইলি ব্রান্ডিট আরো বলেন, ‘এমন অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন একজন বিশ্বনেতাকে তোমরা হত্যা করলে কেন? যাকে ছাড়া বিশ্বনেতারা তোমাদের স্বীকৃতি দিতো না। তার হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্ববাসী তোমাদের জাতিকে আর বিশ্বাস করে না।’
কিউবার কিংবদন্তী বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হিমালয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে যোগ দেন বঙ্গবন্ধু। এই সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাতের সময় ক্যাস্ট্রো বলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এই মানুষটিই হিমালয়। আমি এভাবেই হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা পেয়েছি।’
আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক ও মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী নেতা মাহাথির মোহাম্মদ বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলও বাংলাদেশকে চিনতো বঙ্গবন্ধুর নামে। বাঙালির জাতির মুক্তিদাতা বঙ্গবন্ধুকে খুনের ঘটনায় বিশ্ববাসী এই জাতি সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়ে।
২০০৪ সালে বাংলাদেশ সফরে এসে এক সাক্ষাৎকারে মাহাথির মোহাম্মদ আরও বলেন, ‘আফ্রিকার কোটি কোটি কৃষ্ণ মানবের মুক্তিদূত নেলসন ম্যান্ডেলার সমকক্ষ তোমাদের নেতা (বঙ্গবন্ধু)। তার অবর্তমানে বাংলাদেশ অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে এবং এতিমের মতো অবহেলা ও অবজ্ঞার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। জন্মের পরপরই বাংলাদেশ অভিভাবকহীন ও নেতৃত্বহারা হয়ে পড়ায় এই দেশটির যে বিশাল সম্ভাবনা ছিল, তা রুদ্ধ হয়ে পড়ে। তোমাদের জাতির ভাগ্যে এতবড় ট্রাজেডি দেখে খুব আফসোস হয়।’
বঙ্গবন্ধুর প্রতি অকপটে মুগ্ধতার কথা প্রকাশ করে মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, ‘তিনি তার দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে, অন্য দেশের কারাগারে থেকে, শুধু তার নামের জাদুমন্ত্রে পৃথিবীর ভৌগলিক রেখা পরিবর্তন করে একটি নতুন দেশের অভ্যুদয় ঘটান। সমগ্র মানবজাতির ইতিহাসে এর দ্বিতীয় নজির নেই।
বিশ্বজুড়ে নন্দিত ফ্রান্সের নেতা নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। তাকে নেপোলিয়ন দ্য গ্রেট বলা হয়। সেই নেপোলিয়নের চাইতেও বঙ্গবন্ধুকে সফল বলে মন্তব্য করেছেন ফ্রান্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাসোয়া মিতেরা।
১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সফরে এসে বঙ্গভবনে প্রবেশের সময় বঙ্গবন্ধুর ছবির দিকে তাকিয়ে সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদকে তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের দেশের অদৃশ্য শক্তিধর এই লোকটির কী অজানা জাদু ছিল! দেখো, আমাদের ফ্রান্সের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর নেপোলিয়ান বোনাপার্ট দি গ্রেট। তিনি ফ্রান্স থেকে বহু দূরে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে বন্দি হয়ে পড়েন, তোমাদের শেখ মুজিবের মতো বন্দি হওয়ার পর আমাদের জাতীয় বীর ফরাসি জাতির জন্য বা ফ্রান্সের জন্য আর কোনো অবদান রাখতে পারেননি। কিন্তু তোমাদের ভাগ্য-নির্মাতা (বঙ্গবন্ধু) তোমাদের দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে, অন্য দেশের কারাগারে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে ডেথ সেলে বসেও, শুধু তার নামের অজ্ঞাত জ্যোতির্ময় আলোকচ্ছটা নিক্ষেপ করে, পৃথিবীর ভৌগোলিক রেখা পরিবর্তন করে, একটি নতুন দেশের অভ্যুদয় ঘটান এবং একটি নতুন জাতির জন্ম দেন।’
ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতাদের চেয়েও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বড় নেতা বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী। সশ্রদ্ধ চিত্তে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রশংসা করে তিনি বাংলাদেশি সাংবাদিক মুসা সাদিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘তিনি পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর চেয়েও অনেক বড় নেতা। এমনকি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা প্রথম সারির নেতা ছিলেন এবং যাদের নেতৃত্বে ভারত স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, তাদের সবার চেয়ে শেখ মুজিব অনেক বড় নেতা ছিলেন। ভারতের নেতাজি সুভাষ বসু, যিনি বাংলাদেশের মতো মুক্তিযুদ্ধ করে ভারতের আজাদি ছিনিয়ে আনতে চেয়েছিলেন, একমাত্র তার সঙ্গে তোমাদের নেতার (বঙ্গবন্ধুর) তুলনা হতে পারে।’
১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সফরকালে এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধুর অসামান্য দূরদর্শিতার কথা জানান কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডো। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু যে ১৯৭০ এর দশকেই বাঙালি জাতিকে নিয়ে স্বাধীনতার যুদ্ধে লিপ্ত হবেন, আশির দশক পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন না, এমন গোয়েন্দা তথ্য উপ-রাষ্ট্রদূত অফিসের গোয়েন্দা মারফত আমরা পেয়েছিলাম। সেটার ব্যাখ্যা সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে আমরা তা সংগ্রহ করতে পারিনি। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে সংগ্রহ করা সেই ব্যাখ্যায় আমরা জানতে পারি যে, আশির দশকের পর রাশিয়ার রেড আর্মি থাকবে না বলে বিশ্বাস করতেন তিনি। তখন পৃথিবীর ভারসাম্য একদিকে (যুক্তরাষ্ট্রের দিকে) হেলে পড়বে, আর তারা পাকিস্তানের একনিষ্ঠ সমর্থক। সেই পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি ১৯৭০ সালেই যুদ্ধ শুরু পরিকল্পনা করেছিলেন। তার সেই পূর্বাভাস ও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় বিশ্বের বড় বড় নেতারা বিস্মিত হয়ে পড়েন। তাই তারা ১৯৭২ সালে তার কাছে তার দৈবদৃষ্টি সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন।’
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর খবর শুনে ফিলিস্তিনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও নোবেল শান্তি পুরষ্কার বিজয়ী নেতা ইয়াসির আরাফাত বলেন, ‘আপসহীন সংগ্রামী নেতৃত্ব আর কুসুম কোমল হৃদয় ছিল মুজিব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।’
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর পেয়ে ইরাকের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হোসেন সেদিন শোক দিবস পালন করেন। এমনকি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত কে জি মোস্তফাকে সেদিনই ইরাক থেকে বের করে দেন। সাদ্দাম হোসেন বলছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রথম শহীদ। তাই তিনি অমর।’
শ্রীলংকার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লক্ষ্মণ কাদির গামা বাংলাদেশের এই মহান নেতা সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়া গত কয়েক শতকে বিশ্বকে অনেক শিক্ষক, দার্শনিক, দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক, রাজনৈতিক নেতা ও যোদ্ধা উপহার দিয়েছে। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সবকিছুকে ছাপিয়ে যান, তাঁর স্থান নির্ধারিত হয়ে আছে সর্বকালের সর্বোচ্চ আসনে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টিকারী যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে নিজের মুগ্ধতার কথা অকপটে বলেছেন। মুক্তিযুদ্ধের তিন দশক পর, ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি কমপ্লেক্সে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক মুসা সাদিককে কেনেডি বলেন, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু; খুব পপুলার স্লোগান। আমি যেন কান পাতলে আজও শুনতে পাই।’
মূলত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের রণাঙ্গণ পরিদর্শনে এসেছিলেন ম্যাসাচুসেটস-এর এই সিনেটর। সেসময় মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন স্পট ঘুরে দেখার সময় এই স্লোগান শোনেন তিনি।
পরবর্তীতে, ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে তার ধানমন্ডির বাসায় এসেছিলেন এডওয়ার্ড কেনেডি। সেই সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপচারিতার ব্যাপারে কেনেডি বলেছেন, ‘তার (বঙ্গবন্ধুর) ধ্যান-জ্ঞান ছিল বাংলাদেশ ও বিশ্বশান্তি এবং তিনি ছিলেন যুদ্ধবিরোধী ও বর্ণবাদবিরোধী; যার সঙ্গে আমার আদর্শের মিল ছিল।’
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে যে বিভ্রান্তির অপচেষ্টা হয়েছে, সে ব্যাপারেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এডওয়ার্ড কেনেডি। তিনি সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী সাংবাদিককে বলেন, ‘১৯৭১ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নামেই বিশ্ববাসী তোমাদের স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তার নামেই বাঙালিকে স্বাধীন জাতির মর্যাদা দিয়েছে। আমি শুধু বলব, পৃথিবীতে দু-শ্রেণির প্রাণী আছে। মনুষ্য প্রাণী ও অমনুষ্য প্রাণী। তোমাদের বাঙালি জাতির ভাগ্য পাল্টাবে কে, যদি তোমাদের মনুষ্য জাতির মধ্যে অমনুষ্য প্রাণীর আধিপত্য প্রবল হয়ে ওঠে। যারা বিশ্বনন্দিত মহামানবসম শেখ মুজিবকে হত্যা করে অহংকার করতে পারে, তারা নরকের কীট।’
ব্রিটিশ হাউস অব লর্ডসের সদস্য ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শীর্ষস্থানীয় যোদ্ধা ফেনার ব্রুকওয়ে বলেছেন, সংগ্রামের ইতিহাসে লেনিন, রোজালিনবার্গ, গান্ধী, নকুমা, লুমুমবা, ক্যাস্ট্রো ও আলেন্দে’র সঙ্গে মুজিবের নামও উচ্চরিত হবে।
ব্রুকওয়ে আরো বলেন, ‘তাকে হত্যা করা ছিল মানব হত্যার চেয়ে অনেক বড় অপরাধ। শেখ মুজিব শুধুমাত্র তাঁর জনগণের রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেননি। তিনি তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যও সংগ্রাম করেছিলেন।
।। লেখক দ্যা ভয়েস এর নির্বাহী সম্পাদক ।।

মন্তব্য