ঢাকা, ১৫ আগষ্ট — খাতাকলমে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এক বিরাট উন্নয়ন ও সাফল্যের প্রতীক। বিগত দুই দশকে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০০৫ সালে যেখানে ২৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন সক্ষমতা ছিল মাত্র ৫ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি, সেখানে বর্তমানে ১৩৭টি কেন্দ্র নিয়ে জাতীয় গ্রিডের নামমাত্র সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯ হাজার থেকে ৩২ হাজার মেগাওয়াটে।
অথচ বর্তমানে দেশে গড় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা যেখানে মাত্র ১৬ হাজার মেগাওয়াট—যা মোট সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক—সেখানেও দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে চলছে তীব্র লোডশেডিং।
বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত থাকার পরও এই লোডশেডিংয়ের কারণ কেবল কোনো কারিগরি ত্রুটি নয়। দেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের দিকে তাকালে দেখা যায়, শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় না; প্রয়োজন জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ। আর সেখানেই বাংলাদেশ বর্তমানে বঙ্গোপসাগরের এলএনজি সরবরাহ সংকট এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির দ্বিমুখী চাপের মুখে পড়েছে।
জ্বালানি নির্ভরতা ও বর্তমান অবকাঠামো
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা মূলত দেশীয় ও আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল:
-
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ: মোট সক্ষমতার একটি বড় অংশ (প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট) গ্যাসচালিত কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরশীল।
-
কয়লা ও আন্তঃসীমান্ত আমদানি: পায়রা, রামপাল ও মাতারবাড়ির মতো বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ভারতের আদানি পাওয়ার থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ মিলে জাতীয় চাহিদার ২০ শতাংশেরও বেশি পূরণ হয়।
-
তরল জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য উৎস: ফার্নেস অয়েল, ডিজেল, জলবিদ্যুৎ ও সৌরশক্তি মিলে অবশিষ্ট চাহিদা পূরণ করা হয়।
দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও দেশীয় গ্যাস উত্তোলন চাহিদার তুলনায় পিছিয়ে পড়ায় পুরো খাত আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই আমদানিকৃত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে পৌঁছাতে মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (FSRU)-এর ওপর নির্ভর করতে হয়: একটি পরিচালনা করছে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি (Excelerate Energy) এবং অন্যটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপ (Summit Group)।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ও সমীকরণ
| সূচক / বিবরণ | সক্ষমতা ও বিস্তারিত |
| মোট স্থাপিত সক্ষমতা | ~ ২৯,০০০ – ৩২,০০০ মেগাওয়াট |
| গড় জাতীয় চাহিদা | ~ ১৬,০০০ মেগাওয়াট |
| গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন অংশ | ~ ১২,০০০ মেগাওয়াট (এলএনজি আমদানিনির্ভর) |
| কয়লা ও আমদানি বিদ্যুৎ | > ২০% (পায়রা, রামপাল, মাতারবাড়ি ও আদানি) |
একই সঙ্গে দুটি টার্মিনাল বন্ধের রহস্য
সম্প্রতি দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকেই একসঙ্গে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়:
-
এক্সিলারেটের অগ্নিকাণ্ড: গত ২১ জুলাই এক্সিলারেটের ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যা টার্মিনালের বয়লার ও বৈদ্যুতিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
-
সামিটের সরবরাহ সংকট: একই সময়ে বিরূপ আবহাওয়া ও জাহাজ সংকটের কারণ দেখিয়ে সামিট টার্মিনাল থেকেও স্বাভাবিক সরবরাহ থমকে যায়।
দেশের দুটি প্রধান এলএনজি টার্মিনাল অচল হয়ে পড়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগাতে পারছে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ বিতরণে।
তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, এই সংকট কেবল প্রাকৃতিক বা আকস্মিক কারিগরি জটিলতা নয়; এর পেছনে জ্বালানি ভূরাজনীতির এক গভীর সমীকরণ কাজ করছে।
বঙ্গোপসাগরে চীন-যুক্তরাষ্ট্র টানাপোড়েন
সংকটের অন্তর্নিহিত প্রেক্ষাপটে রয়েছে বাংলাদেশের তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা।
বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত জ্বালানি অবকাঠামোতে যেখানে পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে চেয়েছিল, সেখানে সরকার তৃতীয় টার্মিনালটি নির্মাণের জন্য চীনের একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি সম্পন্ন করে।
এই পদক্ষেপ দুই পরাশক্তির বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে:
-
বাণিজ্যিক স্বার্থের সংঘাত: বঙ্গোপসাগরের জ্বালানি খাতে চীনের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি মার্কিন ও পশ্চিমা বাণিজ্যিক স্বার্থের বিপরীতে একটি বড় ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে।
-
কূটনৈতিক সমীকরণ: এই উত্তেজনার মধ্যেই এক্সিলারেট এনার্জির উচ্চপদে কৌশলগত উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন পিটার হাস, যিনি বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ছিলেন।
বিশ্লেষণ: কাগুজে সক্ষমতা বনাম জ্বালানি নিরাপত্তা
চলমান এই বিদ্যুৎ সংকট আবারও প্রমাণ করেছে—উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করলেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
যখন জ্বালানি সরবরাহের মূল ধমনি মাত্র দুটি সমুদ্রনির্ভর টার্মিনালের ওপর জিম্মি থাকে, তখন সামান্য কারিগরি বা ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনেই পুরো জাতীয় গ্রিড বিপর্যস্ত হতে পারে। বাংলাদেশ যতদিন না নিজস্ব জ্বালানি উৎস সুরক্ষিত করতে পারছে এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে কৌশলগত ভারসাম্য ধরে রাখতে পারছে, ততদিন পর্যন্ত খাতাকলমে হাজার হাজার মেগাওয়াট উদ্বৃত্ত সক্ষমতা থাকলেও সাধারণ মানুষকে লোডশেডিংয়ের অন্ধকারেই দিন কাটাতে হতে পারে।

মন্তব্য