শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬ | Columbus |
| Columbus
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইন্সে মাদ্রাসা ছাত্রদের হামলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ড

- ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:১৫ পূর্বাহ্ন

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ লাইন্সে মাদ্রাসা ছাত্ররা হামলা করে বন্ধ করে দিয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। হামলায় বেশ কিছু পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পুলিশ লাইনসের ভেতরে একটি কনসার্টে গানবাজনা চালানোর কারণে বিক্ষুব্ধ মাদ্রাসা ছাত্ররা হামলা চালিয়ে কনসার্ট পণ্ড করে দেয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার পশ্চিম মেড্ডায় পুলিশ লাইন্সের ভেতরে এ ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজির আগমন উপলক্ষে জেলা পুলিশের উদ্যোগে সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।

হামলার শুরুতে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে অন্তত ২০ মাদ্রাসা ছাত্র আহত হয়। দুই পক্ষ মিলিয়ে অন্তত ৩০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে রাত পর্যন্ত উত্তেজনা ছিলো।

এর কয়েক ঘণ্টা পর বুধবার কিশোরগঞ্জে আরেকটি পূর্বনির্ধারিত কনসার্ট বাতিল করে জেলা প্রশাসন। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা ইমাম-উলামা পরিষদ কনসার্টের বিরোধিতা করে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেছিল। সংগঠনটি গান-বাজনার আয়োজনকে শরিয়তবিরোধী উল্লেখ করার পাশাপাশি কনসার্ট ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কার কথা জানায়।

দুটি ঘটনা ঘটেছে ১৮ ও ১৯ আগস্ট। তবে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ লাইন্সের ভেতরে হামলার পর চলমান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে কিশোরগঞ্জে অনুষ্ঠান শুরুর আগেই প্রশাসন কনসার্টের অনুমতি বাতিল করে।

পুলিশ লাইন্সে ঢুকে শতাধিক মাদ্রাসা ছাত্রের হামলা

মাদ্রাসা ছাত্রদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইন্সে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলাকালে উচ্চস্বরে গান বাজছিল। কয়েকজন মাদ্রাসা ছাত্র গানের শব্দ কমাতে বলেন। এ নিয়ে পুলিশ ও ছাত্রদের মধ্যে তর্কবিতর্ক শুরু হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একপর্যায়ে শতাধিক মাদ্রাসা ছাত্র পুলিশ লাইন্সের ভেতরে প্রবেশ করে। তারা পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা এবং ভাঙচুর চালায়। এর ফলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়।

শুরুর হামলায় বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ পরে লাঠিচার্জ করে। এতে অন্তত ২০ মাদ্রাসা ছাত্র আহত হয় বলে ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে।

ঘটনার পর রাত পর্যন্ত এলাকায় উত্তেজনা ছিল। পরে পুলিশ ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হয়।

আলোচনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শাহ মো. আব্দুর রউফ, জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. সিরাজুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।

মাদ্রাসা ছাত্ররা পুলিশ লাইন্সে ভবিষ্যতে আর উচ্চস্বরে গান না বাজানো এবং ছাত্রদের ওপর হামলাকারীদের বিচারের দাবি জানায়।

আলোচনার সময় পুলিশ সুপার শাহ মো. আব্দুর রউফ বলেন, “কেউ অতি উৎসাহী হয়ে কিছু করে থাকলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

আলোচনা শেষে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে কিছু মাদ্রাসা শিক্ষক ও ছাত্রকে উত্তেজক বক্তব্য দিতে দেখা যায়। তারা ভবিষ্যতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইন্সে আর কোনো কনসার্ট আয়োজন করতে দেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ঘিরে সংঘাত নতুন নয়। গত মে মাসে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে নির্মাতা তানিম নূরের বনলতা এক্সপ্রেস চলচ্চিত্রের পূর্বনির্ধারিত প্রদর্শনী স্থগিত করে।

পরে কসবার স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের আরেকটি উদ্যোগ নিলে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে এবং সেই প্রদর্শনীও বন্ধ হয়ে যায়।

ইমাম-উলামা পরিষদের আপত্তির পর কিশোরগঞ্জে কনসার্ট বাতিল

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনার পরদিন বুধবার কিশোরগঞ্জ শহরের পুরাতন স্টেডিয়ামে পূর্বনির্ধারিত আরেকটি কনসার্ট হওয়ার কথা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত জেলা প্রশাসন আগে দেওয়া অনুমতি বাতিল করে।

আলিশান রেস্টুরেন্ট তাদের র‌্যাফেল ড্রয়ের পুরস্কার বিতরণ উপলক্ষে কনসার্টটির আয়োজন করেছিল। এতে জনপ্রিয় ব্যান্ড অ্যাশেজ ও সংগীতশিল্পী নোবেলের গান পরিবেশনের কথা ছিল।

আয়োজকেরা ১৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে কনসার্টের ঘোষণা দেন। তবে তাদের দাবি, এর অন্তত ১৫ দিন আগে থেকেই অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি চলছিল এবং জেলা প্রশাসনের কাছে অনুমতির জন্য আবেদন করা হয়েছিল।

১৮ আগস্ট কনসার্ট বন্ধের দাবি জানিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা ইমাম-উলামা পরিষদ।

সংগঠনটির সদর উপজেলা শাখার সভাপতি মাওলানা আহমাদুল্লাহ আবেদনটি করেন।

আবেদনে কনসার্টে গান-বাজনার আয়োজনকে শরিয়তবিরোধী উল্লেখ করে অনুষ্ঠান বন্ধের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে কনসার্টকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

বুধবার দুপুরে মাওলানা আহমাদুল্লাহ জানান, তাদের আবেদনের পর জেলা প্রশাসন কনসার্টের অনুমতি বাতিল করেছে।

আগে অনুমতি পাওয়ার দাবি আয়োজকদের

আলিশান রেস্টুরেন্টের মালিক মো. ইব্রাহীম খলিল বলেন, রেস্টুরেন্টের র‌্যাফেল ড্রয়ের পুরস্কার বিতরণের জন্য কনসার্টটির আয়োজন করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করার পর অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতিও পেয়েছিলেন তারা।

তবে বুধবার দুপুরে প্রশাসন তাদের কনসার্ট আয়োজন না করার নির্দেশ দেয়।

অনুমতি বাতিলের খবর পাওয়ার পর আয়োজকেরা পুরাতন স্টেডিয়ামে তৈরি করা মঞ্চ ও অন্যান্য সরঞ্জাম সরিয়ে নিতে শুরু করেন। বুধবার দুপুরে শ্রমিকদের মঞ্চের বিভিন্ন সরঞ্জাম খুলে ট্রাকে তুলতে দেখা যায়।

কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন স্বীকার করেন, শুরুতে কনসার্ট আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, পরে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে কনসার্টকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কার কথা জানানো হয়। সে কারণে অনুমতি বাতিল করা হয়েছে। আয়োজক প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয় লাইসেন্স নেই বলেও জানান তিনি।

তবে আয়োজক প্রতিষ্ঠান জেলা প্রশাসকের এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও লাইসেন্স রয়েছে এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে কনসার্ট আয়োজনের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল।

শেষ মুহূর্তে প্রশাসন অনুমতি প্রত্যাহার করায় অনুষ্ঠানটি বাতিল করতে বাধ্য হন বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা।

কনসার্ট বাতিলের ঘটনায় স্থানীয় সংস্কৃতি ও সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। তাদের ভাষ্য, সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি সুস্থ সংস্কৃতি, সংগীত ও বিনোদনেরও প্রয়োজন রয়েছে।

মন্তব্য

Scroll to Top