ঢাকা: দেশে আবারও বেড়েছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের দাম। গৃহস্থালিতে বহুল ব্যবহৃত ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৭০ টাকা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন এই মূল্য কার্যকর হওয়ার ফলে রান্নার গ্যাসের জন্য এখন ভোক্তাদের আগের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে।
রোববার (২ আগস্ট) বিইআরসি এক বিজ্ঞপ্তিতে আগস্ট মাসের জন্য এলপিজির নতুন মূল্য ঘোষণা করে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের ভোক্তা পর্যায়ের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৫৯৮ টাকা। এর আগে এই সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫২৮ টাকা।
বিইআরসির ঘোষণা অনুযায়ী, নতুন দাম রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে।
মাসিক মূল্য সমন্বয়ের অংশ হিসেবে দাম বৃদ্ধি
বিইআরসি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, আমদানি ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খরচ বিবেচনায় নিয়ে প্রতি মাসে এলপিজির দাম সমন্বয় করা হয়। আগস্ট মাসের জন্য নির্ধারিত নতুন মূল্যও এই মূল্য সমন্বয় পদ্ধতির আওতায় করা হয়েছে।
দেশের এলপিজি বাজারে মূল্যের অন্যতম প্রভাবক হলো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম, যা এলপিজি উৎপাদনের প্রধান উপাদান। এছাড়া আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার এবং আমদানি সংক্রান্ত ব্যয়ও স্থানীয় বাজারে এলপিজির দামে প্রভাব ফেলে।
তবে ভোক্তাদের জন্য মূল উদ্বেগ হলো—প্রতিনিয়ত প্রয়োজনীয় এই জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবারের মাসিক ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।
নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ
দেশের বিপুলসংখ্যক পরিবার রান্নার জন্য এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ নেই, সেসব এলাকায় এলপিজি এখন রান্নার অন্যতম প্রধান জ্বালানি।
ফলে প্রতি মাসে এলপিজির দাম বৃদ্ধি বা হ্রাস সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে।
ভোক্তাদের মতে, খাদ্যপণ্য, পরিবহন ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয়ের সঙ্গে নতুন করে রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পরিবারের বাজেটে বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
বিশেষ করে স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো, যারা নির্দিষ্ট মাসিক আয়ের মধ্যে সংসার পরিচালনা করেন, তাদের জন্য অতিরিক্ত ৭০ টাকা ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন
বিইআরসি দাম নির্ধারণ করলেও বাজারে অনেক সময় নির্ধারিত দামে এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া নিয়ে ভোক্তাদের অভিযোগ রয়েছে।
অনেক গ্রাহক অভিযোগ করেন, স্থানীয় পর্যায়ে কিছু বিক্রেতা সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করেন। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায় নজরদারি দুর্বল হওয়ার সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, শুধু দাম নির্ধারণ করলেই হবে না, নির্ধারিত মূল্য কার্যকর হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে বাজার তদারকি আরও জোরদার করতে হবে।
তাদের মতে, এলপিজির সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি ব্যয়ের তথ্য এবং মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন, যাতে সাধারণ মানুষ ন্যায্য মূল্যে জ্বালানি কিনতে পারেন।
এলপিজির ওপর বাড়ছে নির্ভরতা
গত এক দশকে বাংলাদেশে এলপিজির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে শহর ও আধা-শহর এলাকায় নতুন সংযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক পরিবার রান্নার জন্য সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের এলপিজি বাজার মূলত আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থানীয় দামের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
বিইআরসি এর আগে বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্য পরিবর্তন, আমদানি ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট খরচ বিবেচনা করেই মাসিক মূল্য সমন্বয় করা হয়।
ভোক্তাবান্ধব নীতি চায় সাধারণ মানুষ
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাজার বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় রেখে মূল্য নির্ধারণ করা হলেও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা জরুরি।
তাদের মতে, এলপিজি এখন আর বিলাসী পণ্য নয়; এটি লাখ লাখ পরিবারের দৈনন্দিন প্রয়োজনের অংশ। তাই মূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি ভোক্তা সুরক্ষা, বাজার তদারকি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন।
সাধারণ ভোক্তাদের প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে তার সুফল যেন দ্রুত দেশের বাজারে পৌঁছায় এবং মূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যেন স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়।
নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার পর এখন দেশের কোটি কোটি এলপিজি ব্যবহারকারীকে বাড়তি খরচের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।


