জনহিতকর কাজে বরাদ্দ কমছে, ঋণ বাড়ছে: চাপে সাধারণ মানুষ

কল্যাণমূলক ব্যয় সংকোচনের পাশাপাশি রপ্তানি প্রণোদনা বৃদ্ধি; ঘাটতি মেটাতে বাড়ছে ব্যাংক ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা

spot_imgspot_img

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জনহিতকর কাজে বরাদ্দ কমানোর উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। ভর্তুকি কমানোর নামে কল্যাণমূলক কাজগুলো কমিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের রপ্তানি প্রণোদনায় ভর্তুকি কিছুটা বাড়ানো হতে পারে। পাশাপাশি ঋণ বৃদ্ধি ও মানুষের ওপর ট্যাক্সের বোঝা বাড়িয়ে বাজেট ঘাটতি সামলানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার এবং রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতার কারণে এই পথে হাঁটতে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার।

জাতীয় সংসদে আজ বৃহস্পতিবার আগামী অর্থ বছরের বাজেট পেশ করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হচ্ছে। একই সঙ্গে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স খাতে প্রণোদনা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রাখা হতে পারে ৮৯ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৯৫ হাজার ৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা কমানো হচ্ছে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভর্তুকিতে সরকারের প্রকৃত ব্যয় ছিল ১ লাখ ৮ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে আগামী বাজেটের সম্ভাব্য বরাদ্দ বাস্তব ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা কম।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও সারের দাম কিছুটা কমতে পারে—এই প্রত্যাশা থেকেই ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ভর্তুকির চাপ কমানোর পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।

তবে অর্থনীতিবিদদের অনেকে মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সম্ভাব্য পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে ভর্তুকি কমানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ নতুন কোনো বৈশ্বিক সংকট দেখা দিলে জ্বালানি ও সারের দাম আবারও বেড়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে।

বাড়ছে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রণোদনা

ভর্তুকি কমানোর পাশাপাশি সরকার রপ্তানি ও রেমিট্যান্স খাতে প্রণোদনা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। আগামী অর্থবছরে রপ্তানি প্রণোদনা, পাট রপ্তানি প্রণোদনা এবং রেমিট্যান্স প্রণোদনা মিলিয়ে মোট ১৬ হাজার ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১৫ হাজার ২২৫ কোটি টাকা।

সরকারের যুক্তি, বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়াতে এসব খাতে সহায়তা প্রয়োজন। তবে সমালোচকদের মতে, সাধারণ মানুষের জন্য ভর্তুকি কমিয়ে ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের জন্য প্রণোদনা বাড়ানো হলে বাজেটের সামাজিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি

আসন্ন বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে সম্ভাব্য বাজেট ঘাটতি দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

এই ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে। একই সঙ্গে বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে আগামী অর্থবছরে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এত বড় ঘাটতি মেটাতে ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য চাপ তৈরি করতে পারে।

ব্যাংকঋণ বাড়লে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বেসরকারি খাত

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম বলেন, “এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য কঠিন হবে।”

তিনি ভয়েসকে বলেন, “বাজেট বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা বেসরকারি খাতের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে। কারণ সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কমে যাবে, যা কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বদলে সংকোচন ঘটাতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব আদায়ের দুর্বল অবস্থার কারণে সরকার যদি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ না করে ঋণের বোঝা বাড়ায়, তাহলে তা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।”

লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু জুলাই থেকে ১০ মে পর্যন্ত সময়েই সরকার নিট ১ লাখ ৯ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ইতোমধ্যেই অতিক্রম করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের শুরুতে সরকারের ব্যাংকঋণের স্থিতি ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। মাত্র ১০ মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬০ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকায়।

রাজস্ব ঘাটতি ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। এ সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা।

ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্থরতা এবং আমদানি কমে যাওয়ার কারণে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সর্বনিম্ন পর্যায়ে

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমতে কমতে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি বিনিয়োগ মন্দার একটি স্পষ্ট লক্ষণ।

তারা বলছেন, সরকার যদি ব্যাংক খাত থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে থাকে, তাহলে উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে। এতে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কথা বলছেন অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।”

অর্থমন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবছরের জুন পর্যন্ত শুধু এই চার খাতেই অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ৪২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে তেলে ১০ হাজার ২৫৮ কোটি, গ্যাসে ১১ হাজার ১৭০ কোটি, বিদ্যুতে ১৯ হাজার ৮২১ কোটি এবং সারে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, “ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তাৎক্ষণিক ও সম্ভাব্য উভয় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাব জ্বালানি, সার, আমদানি ব্যয়, পরিবহন ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, প্রবাসী আয় এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বেশি দৃশ্যমান।”

সাধারণ মানুষের জন্য কী বার্তা?

সরকার বলছে, ভর্তুকি কমিয়ে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন, যখন রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং ঋণের বোঝা বাড়ছে, তখন জনকল্যাণমূলক খাতে বরাদ্দ কমানো কতটা যৌক্তিক।

তাদের মতে, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো, নতুন কর আরোপ বা করের পরিধি বাড়ানো এবং ভর্তুকি কমানোর সম্মিলিত প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় বিতর্ক হতে পারে—অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের কাঁধে কতটা বাড়তি বোঝা চাপানো হচ্ছে।

spot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

Hot Topics

Related Articles