মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | Columbus |
| Columbus
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

আমার সন্তান কোথায়?

মানবাধিকার | ২ দিন আগে

আরও বোয়িং বিমান বাংলাদেশের জন্য লাভ না গলার কাঁটা?

- ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫৫ পূর্বাহ্ন

যুক্তরাষ্ট্র থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয় নিয়ে বাংলাদেশে এখন তুমুল আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বলতে গেলে এটিই এখন “টক অব দ্য কান্ট্রি” হিসেবে সবখানে আলোচিত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে এই ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন বাংলাদেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, সারের ভয়াবহ সংকট চলছে এবং দেশের অর্থনীতিতে চরম স্থবিরতা বিরাজ করছে । এই ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে এই বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তটিকে অনেকে আগুনে ঘি ঢালার সাথে তুলনা করছেন।

কোন কোন এভিয়েশন বিশ্লেষক এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছেন এর ফলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে।
অন্যদিকে কেউ কেউ একে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন এবং বলছেন এর ফলে বাংলাদেশের সাথে বহির্বিশ্বের আকাশ যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া–বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এবং ভারতে দেশটির রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর।

গত রবিবার সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন যে ‘এই সপ্তাহেই কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার অঙ্গীকার নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আরেকটি দারুণ চুক্তি করেছেন’।

এতে তিনি বলেছেন, প্রাথমিকভাবে বোয়িংয়ের যত অর্ডার দেওয়া হয়েছিল সেটি উল্লেখযোগ্য বাড়বে।

তিনি লিখেছেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকার ইতিহাসের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট। তিনি লাখ লাখ উচ্চ-বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে, ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং আমেরিকার অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রতিদিন নিরলসভাবে কাজ করছেন”।

এরপর সার্জিও গর লিখেছেন, ” এই সপ্তাহেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আরেকটি অসাধারণ চুক্তি করেছেন। এর আওতায় বাংলাদেশ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে আরও বেশি বোয়িং বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা তাদের প্রাথমিক ক্রয়াদেশের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে”।

“আমাদের প্রেসিডেন্ট আমেরিকা এবং আমাদের অংশীদারদের আবারও মহান করার-এর পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন,” -এমন মন্তব্য দিয়ে তিনি তার পোস্ট শেষ করেছেন।

কিন্তু এই পোস্টে তিনি নতুন করে আরও বোয়িং বাংলাদেশ কিনতে যাচ্ছে বলে দাবি করলেও এর কোনো বিস্তারিত দেননি। কবে এই চুক্তি হয়েছে সেটিও তিনি প্রকাশ করেননি।

গরের ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

গত মঙ্গলবার তারেক রহমানকে প্রেরিত এক বার্তায় ট্রাম্প আশ্বস্ত করে বলেন, বোয়িং বাংলাদেশকে হতাশ করবে না। একইসঙ্গে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত মনোযোগের কথা তিনি সবসময় মনে রাখবেন বলেও উল্লেখ করেন।

সামাজিক মাধ্যমে দেয়া গরের পোস্ট এবং পরবর্তীতে ট্রাম্পের বার্তার পর সকল মহলে শুরু হয়েছে এনিয়ে তুমুল আলোচনা ও বিতর্ক। বাংলাদেশে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ করে এতোগুলো বোয়িং বিমানের আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা এনিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।

তারা বলছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদরা প্রতিনিয়ত বলে আসছেন যে দেশের অর্থনীতির অবস্থা ভালো নয়। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলেও দাবি করছেন তারা।

একই সময়ে ইরান যুদ্ধের কারণে তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। অর্থের অভাবে বড় প্রকল্প নেওয়া থেকে বিরত থাকার কথাও বলেছে সরকার।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন করে ঋণের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলকে গত জুনেই চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকেও নানাভাবে সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে বোয়িং থেকে বিমান কেনার আদেশ দেওয়া কতটা প্রয়োজনীয় ছিল সেই প্রশ্নও উঠছে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স গত ৩০শে এপ্রিল ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সাথে।

তখন বোয়িং থেকে ১৪ টি উড়োজাহাজ কেনার কথা জানানো হয়েছিল। এখন সেই সংখ্যা আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে সার্জিও গর-এর এক্স-এ দেওয়া পোস্ট।

যদিও বিমান বাংলাদেশের মুখপাত্র মহিউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, উড়োজাহাজ নিয়ে বিমানের সাথে বোয়িং এর প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়েছে, যেখানে গোপন কিছু নেই।

“এর সাথে যোগ করার মতো আর কোনো তথ্য আমাদের জানা নেই,” ওই চুক্তির বাইরে আরও বোয়িং কেনা হচ্ছে কি-না কিংবা সার্জিও গর তার পোস্টে যা দাবি করেছেন তা নিয়ে করা প্রশ্নের জবাবে বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে বিবিসির পক্ষ থেকে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসকে ই-মেইল করা হয়েছে। এর জবাবে তারা ধন্যবাদ জানিয়ে পাল্টা ই-মেইল পাঠালেও সার্জিও গর এর দাবি মতো চুক্তিটি কখন কোথায় হয়েছে সে সম্পর্কে কোনো তথ্য তারা দেয়নি।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স গত ৩০ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪ টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।

বিমান বাংলাদেশের এক বিজ্ঞপ্তিতে তখন জানানো হয়েছে, যে ১৪ টি উড়োযান কেনা হবে তার মধ্যে ১০টি ৭৮৭ ড্রিমলাইনার মডেলের। আর চারটি ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের উড়োজাহাজ।

ওই সময় জানানো হয়েছিল যে, ১৪টি উড়োজাহাজের বাজারমূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাইজার সোহেল আহমেদ বলেন, “জ্বালানি-সাশ্রয়ী ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত এই নতুন উড়োজাহাজগুলো বিমানের বহরের আধুনিকায়ন ঘটাবে।”

ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কের চাপ কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বোয়িংয়ের বিমান কেনার আলোচনা সামনে আসে।

এর মধ্যে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস বাংলাদেশকে আরও ১০টি উড়োজাহাজ সরবরাহের প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে। তাদের প্রস্তাবে ছয়টি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইডবডি এবং চারটি এ৩২১ নিও ন্যারোবডি উড়োজাহাজ বিক্রির কথা বলা হয়েছে।
এ নিয়ে আলোচনার জন্য জুলাইয়ের মাঝামাঝি বাংলাদেশ সফর করে তখনকার মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করে গেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের রাষ্ট্রদূতেরা।

পরে মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, “বৈঠকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে এয়ারবাস উড়োজাহাজ যুক্ত করার বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় মন্ত্রী দেশীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে টেকসই মিশ্র বহর গঠনের লক্ষ্যে এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে সরকারের আগ্রহের কথা তুলে ধরেন”।

এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও এয়ারবাসের সাথে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে বাংলাদেশের আলোচনা হয়েছিল।

প্রশ্ন উঠছে যে, এত উড়োজাহাজ কি যাত্রী চাহিদার কারণে কেনা হচ্ছে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হুমকি মোকাবিলায় বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে কেনা হচ্ছে। কিংবা এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক কারণ বা চাপ আছে কি-না।

তবে মঙ্গলবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেছেন, কোনো চাপে নয়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ বাংলাদেশের চাহিদা অনুযায়ীই কেনা হচ্ছে।

তিনি জানান, বাংলাদেশকে সরকার এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, যে কারণে ৭০ থেকে ৮০টা বড় উড়োজাহাজের চাহিদা রয়েছে বাংলাদেশের অ্যাভিয়েশনে খাতে।

এক প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বাংলাদেশের যেসব দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রয়েছে, তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী।
“তাই তাদের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরও বাড়ানো হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও উড়োজাহাজ কেনাকাটা করা হবে। আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে ৭০ থেকে ৮০টি বা তারও বেশি উড়োজাহাজের চাহিদা রয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নীতিগতভাবে বোয়িং বিমান কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে,” বলেছেন তিনি।

তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে এয়ারক্রাফট বহর সক্ষমতা বাড়াতে হবে, না হলে নতুন রুট চালু করা সম্ভব হবে না ও ব্যবসা হারাতে হবে।

এর আগে হুমায়ুন কবির বলেছিলেন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়গুলো বাংলাদেশ জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে।

তিনি বলেন, দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের দৃশ্যমানতা ও প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি সরকার শক্ত অবস্থান থেকে তার বৈদেশিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

এদিকে আরেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশ আরো বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গর যে মন্তব্য করেছেন, তা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আগের সম্পাদিত উড়োজাহাজ ক্রয় চুক্তির বিষয়ে হয়ে থাকতে পারে।

গত রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘বোয়িংয়ের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে তার মন্তব্য আগের চুক্তির বিষয়ে হয়ে থাকতে পারে।’

এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের বিশিষ্ট এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদ উল আলম বলেন প্রত্যেকটি দেশ বা রাষ্ট্রপ্রধানই একজন বিক্রেতা; মানে, আপনি যদি বিশ্বের অন্য সব দেশের দিকে তাকান, দেখবেন প্রত্যেক রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান যখন অন্য কোনো দেশ সফর করেন বা সমকক্ষদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন, তখন তাঁরা সবসময় নিজেদের পণ্য বিক্রি করার চেষ্টা করেন। আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এর ব্যতিক্রম নন। মানে, তিনি অবশ্যই অন্যান্য দেশের কাছে তাঁর পণ্য বিক্রি করার চেষ্টা করবেন।

“যেহেতু বাংলাদেশ বিমান চলাচলের জন্য একটি ক্রমবর্ধমান বাজার, আমার মনে হয় তিনি এই বাজারটিকে আরও বোয়িং বিমানের জন্য পরিপক্ক বলে মনে করেন। এ কারণেই তিনি বাংলাদেশে বোয়িং বিমান বিক্রির পক্ষে কথা বলছেন। শুধু বোয়িং-ই নয়, তিনি বাংলাদেশে গম ও অন্যান্য পণ্যের মতো আরও অনেক পণ্য বিক্রির পক্ষেও কথা বলছেন। তাই আমি বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছি,” যোগ করেন তিনি।

সরকারের দিক থেকে মার্কিন বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে যখন দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের নানা পরিকল্পনার কথা বলছে সরকার।

এর মধ্যে জুনের প্রথম সপ্তাহে আইএমএফের বাংলাদেশ বিষয়ক মিশনপ্রধান ইভো কার্জনার এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন যে, দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচিকে সমর্থন দিতে নতুন ঋণ চেয়ে তাদের চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। তবে তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কী পরিমাণ ঋণ চাওয়া হয়েছে সে ব্যাপারে বিবৃতিতে কিছু বলা হয়নি।

এমনকি প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান না থাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য পে স্কেল ঘোষণা করেও তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে পারছেনা সরকার। সে কারণে ধাপে ধাপে সেটি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ) বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক রুটে সম্মিলিত যে বাজার, তাতে বাংলাদেশি বিমান সংস্থাগুলোর হিস্যা প্রায় ২৫ শতাংশ। বাকি প্রায় ৭৫ শতাংশই বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর দখলে।

এ পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়ে বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস–বাংলা ২০২৭ সালের মধ্যে ২১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ তাদের বহরে যুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিল গত ১৯শে জুলাই। যাত্রী বিবেচনায় কুয়েত, বাহরাইন, সৌদিআরব সহ বেশ কিছু রুটে নিয়মিত যাত্রী পরিবহন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে তারা।

অন্যদিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে এখন উড়োজাহাজ আছে ১৯টি। আর ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেছেন বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এভিয়েশন বা বিমান পরিবহন দ্রুত বর্ধনশীল খাত। বাংলাদেশ এখন বছরে এক কোটির মতো যাত্রী পরিবহন করছে, যা আগামী এক দশকের মধ্যেই আড়াই কোটিতে উন্নীত হবে বলে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো ধারণা দিচ্ছে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, সরকার এখন যেসব উড়োজাহাজের ক্রয় আদেশ দেবে বা দিচ্ছে সেগুলো ধাপে ধাপে হয়তো আগামী পনের বছরে বাংলাদেশের বিমানের বহরে যুক্ত হবে।

“আগে অর্ডার দিলে দাম কম হয়। আগামী ১০ বছরে যাত্রী হবে এখন থেকে দুই বা আড়াই গুণ বেশি। ফলে বিমানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এখন দেশের এভিয়েশন খাত বিদেশি এয়ারলাইন্সের হাতে জিম্মি। তারাই বাজারের ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

কিংবা যত যাত্রীর আশা করা হচ্ছে এবং সম্ভাব্য বাস্তব পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়েও এত উড়োজাহাজ সত্যিই প্রয়োজন কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বড় বিমান বহর পরিচালনার সক্ষমতা বিমানের আছে কি-না সেটি বড় প্রশ্ন। বিমান গত ৫৪ বছরে নিজেদের লাভজনক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে পারেনি। এটা সরকারি কর্পোরেশন হিসেবে তৈরি হয়েছে। বাণিজ্যিক এয়ারলাইন্স হিসেবে গড়ে ওঠেনি। সক্ষম বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান না হলে শেষ পর্যন্ত উড়োজাহাজগুলো তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে”।

সবমিলিয়ে স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান বা কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে এবং যাত্রী সংখ্যার ব্যাপক বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করতে পারলে নতুন উড়োজাহাজ কেনাটা বাংলাদেশের জন্য লাভজনকই হবে বলে তিনি মনে করেন।

আরেকজন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ, এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, বিমান যদি কমার্শিয়াল ও মার্কেটিং কৌশল বিশ্লেষণ করে উড়োজাহাজগুলো কেনার কারণ জানাতে পারতো তাহলে যৌক্তিকতা বোঝা যেত।

কিন্তু সম্ভবত এখানে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক বিষয় কিংবা বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টিও কাজ করছে বলে মনে করেন তিনি।

তার মতে, “বাজারের কথা চিন্তা করলে বিমানের ক্যাপাসিটি বাড়ানোর প্রয়োজন আছে। কিন্তু তাদের কৌশল কী? তারা কি চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়েছে, নাকি কেনাটাই তাদের কৌশল- এগুলো পরিষ্কার করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য ২৫টি উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে কি-না সেই আলোচনা তো আছে”।

“তবে এটিও সত্যি যে যথাযথ পরিকল্পনা নিতে পারলে এই পরিকল্পনা থেকে বাংলাদেশ লাভবানও হতে পারবে। সেজন্য শুধু উড়োজাহাজ কেনা নয়, বরং পর্যাপ্ত প্রকৌশলী ও পাইলট তৈরি, প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে,” তিনি বলেন।

মন্তব্য

Scroll to Top