বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | Portland |
| Portland
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

ডেঙ্গুর প্রকোপে বাড়ছে মৃত্যু

বাংলাদেশ | ১ দিন আগে

ডেঙ্গুর প্রকোপে বাড়ছে মৃত্যু

- ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০৪ অপরাহ্ন

বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আবারও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। জুন থেকে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৫৭১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ৯ জনের।

এ নিয়ে চলতি বছরের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৪৭৫। মৃত্যু হয়েছে ১৩০ জনের।

গত তিন মাসের পরিসংখ্যানে ডেঙ্গুর দ্রুত বিস্তারের চিত্র আরও স্পষ্ট। জুনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২০৬ জনে। আগস্টে রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে ২০ হাজার ৫৩৬ জনে পৌঁছায়। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত এক মাসে এটিই সর্বোচ্চ রোগী।

সেপ্টেম্বরেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। মাসের প্রথম আট দিনেই ৯ হাজার ৬২৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

জুন থেকে দ্রুত বাড়ছে রোগী

বছরের শুরুতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল।

জানুয়ারিতে হাসপাতালে ভর্তি হন ১ হাজার ৮১ জন। ফেব্রুয়ারিতে এ সংখ্যা কমে ৪০৯ এবং মার্চে ৩৫৩ জনে নেমে আসে।

এপ্রিলে রোগী বেড়ে ৬৪০ জন এবং মে মাসে ৭১৪ জন হয়।

জুন থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। ওই মাসে হাসপাতালে ভর্তি হন ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে তা তিন গুণেরও বেশি বেড়ে ৯ হাজার ২০৬ জনে পৌঁছায়। আগস্টে হাসপাতালে ভর্তি হন ২০ হাজার ৫৩৬ জন।

গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার রোগীর সংখ্যাও বেশি। ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৩৪ হাজার ৯৮৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

সবচেয়ে বেশি রোগী খুলনায়

সরকারি হিসাবে চলতি বছর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন খুলনা বিভাগে। সেখানে রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ২৯৮।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ঢাকা বিভাগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬ হাজার ৯৬৬ জন। বরিশালে ৬ হাজার ৮১১ এবং চট্টগ্রামে ৬ হাজার ৭২২ জন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫ হাজার ৮২৫ জন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৫ হাজার ৪২৩ জন।

এ ছাড়া রাজশাহীতে ২ হাজার ৫৫৭, ময়মনসিংহে ২ হাজার ৪৯৯, রংপুরে ১ হাজার ১৬৮ এবং সিলেটে ২০৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

মৃত্যুও বাড়ছে

জুন থেকে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়তে শুরু করেছে।

জানুয়ারিতে দুইজন এবং ফেব্রুয়ারিতে দুইজনের মৃত্যু হয়। মার্চ ও এপ্রিলে কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। মে মাসে মৃত্যু হয় একজনের।

জুনে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ জনে। জুলাইয়ে ৩৬ এবং আগস্টে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়।

সেপ্টেম্বরের প্রথম আট দিনেই মারা গেছেন ৩৩ জন।

চলতি বছর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়।

খুলনায় ২৩, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬ এবং ময়মনসিংহে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এ ছাড়া বরিশালে ১১, চট্টগ্রামে আট, দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ঢাকা বিভাগে সাত, রাজশাহীতে চার এবং রংপুর ও সিলেটে একজন করে মারা গেছেন।

তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কম। ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ১৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নিয়ে শঙ্কা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী দুই মাস ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মূলত দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ, অন্যটি আক্রান্ত রোগীকে মশার কামড় থেকে রক্ষা করা, যাতে সেই মশার মাধ্যমে ভাইরাস অন্য মানুষের শরীরে ছড়িয়ে না পড়ে।

তাঁর মতে, কোনো ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় সাফল্য পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, শুধু পূর্ণবয়স্ক মশা মারার পরিবর্তে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। পূর্ণবয়স্ক মশা মেরে সাময়িকভাবে মশার ঘনত্ব কমানো গেলেও প্রজননস্থল থেকে নতুন মশা জন্মাতে থাকলে পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি হবে না।

সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর ঐতিহাসিকভাবেই ডেঙ্গুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সময় উল্লেখ করে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আগামী দুই মাসে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

মশার প্রজননস্থল, মশার ঘনত্ব ও রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত ও তথ্যনির্ভর জাতীয় কর্মসূচি নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।

দেশজুড়ে একযোগে মশা নিয়ন্ত্রণের তাগিদ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীও ঢাকা থেকে গ্রাম পর্যন্ত সারা দেশে একযোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

তাঁর মতে, টানা দুই থেকে তিন দিন নিবিড়ভাবে এ ধরনের অভিযান চালানো দরকার এবং বছরে অন্তত দুইবার তা করা উচিত।

তিনি এডিস মশার প্রজনন ও ডিম পাড়ার স্থান ধ্বংস, সারা দেশে কার্যকরভাবে পূর্ণবয়স্ক মশা ও লার্ভা দমন এবং এলাকার পরিস্থিতি বিবেচনায় বৈজ্ঞানিকভাবে উপযুক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

এ কাজে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য, রাজনৈতিক কর্মী, স্বেচ্ছাসেবক এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোকে যুক্ত করার কথাও বলেন তিনি।

পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত ডেঙ্গুর টিকা চালু এবং সারা বছর মশা নিয়ন্ত্রণ ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পরামর্শ দেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।

হাসপাতালে বাড়ছে জ্বরের রোগী

ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতেও জ্বর ও ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর চাপ বাড়ছে।

শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগে ওষুধ নিতে আসা রোগীর সংখ্যা প্রায় এক মাসের ব্যবধানে দ্বিগুণ হয়েছে। আগে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ রোগী এলেও এখন তা বেড়ে প্রায় ৫০০ জনে পৌঁছেছে।

এসব শিশুর অনেকেই জ্বর, শরীরে ফুসকুড়ি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত।

ডেঙ্গুর মতো উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও কারও কারও পরীক্ষার ফল ঋণাত্মক আসছে। এ কারণে চিকিৎসকেরা তাঁদের আরও কিছু পরীক্ষা করাচ্ছেন। বহির্বিভাগে আসা রোগীদের মধ্যে প্রতিদিন অন্তত ৫ শতাংশকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে।

তিন মাসের বিশেষ কর্মসূচি সরকারের

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকার তিন মাসের বিশেষ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

আগামী ১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।

প্রধানমন্ত্রী আগামী তিন মাসকে ডেঙ্গুর জন্য উচ্চঝুঁকির সময় হিসেবে উল্লেখ করে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

মহানগর এলাকায় সিটি করপোরেশন, জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা কর্মসূচি সমন্বয় করবেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের স্বেচ্ছাসেবক, স্কাউট, বিএনসিসি, গার্ল গাইডস, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদেরও এতে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কর্মসূচির কার্যকারিতা নির্ভর করবে মশার প্রজননস্থল কতটা পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা যায় এবং স্বল্পমেয়াদি অভিযানের পরিবর্তে সারা দেশে সমন্বিত কার্যক্রম কতটা ধারাবাহিকভাবে চালানো হয় তার ওপর।

মন্তব্য

Scroll to Top