গত ১৫ আগস্ট থেকে ২৫ দিনের মধ্যে বাংলাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তত ১৫জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১১ জন হিন্দু এবং একজন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের।
নিহত সংখ্যালঘু নাগরিকদের মধ্যে অন্তত পাঁচজন নারী ও একজন শিশু। তাঁদের মধ্যে তিন নারীকে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
একই সময়ে একজন হিজড়া এবং দুই রোহিঙ্গা শরণার্থীও হত্যার শিকার হয়েছেন।
এসব হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি আগস্টের শুরু থেকে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হুমকি, ব্যবসায়ীদের ওপর হামলা, জমি দখলের অভিযোগ এবং হিন্দু মন্দির ও প্রতিমা ভাঙচুরের একের পর এক ঘটনা ঘটেছে।
তবে শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, এসব ঘটনার তদন্তে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বা হত্যার ঘটনাগুলো সামনে আসার পর পুলিশ দ্রুত এমন বয়ান দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে, যাতে ঘটনাগুলোকে সাম্প্রদায়িক নয় বলে দেখানো যায়। কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধ, কোথাও মাদক, কোথাও চুরি-ডাকাতি বা অন্য অপরাধকে কারণ হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে রংপুরে একই পরিবারের চার হিন্দু সদস্যকে হত্যার ঘটনায়। সেখানে পুলিশের বক্তব্য বারবার পরিবর্তন, দুই সাধারণ তরুণকে হত্যার ঘটনায় জড়ানোর চেষ্টা, ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার এবং আলামত নষ্টের অভিযোগ ঘিরে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
এসব অভিযোগ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তে প্রমাণিত হওয়া প্রয়োজন। তবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতাদের অভিযোগ, প্রকৃত ঘটনা আড়াল এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানোর চেষ্টা সংখ্যালঘুদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়ে তুলছে।
১৫ আগস্ট: মারধরের সাত দিন পর শঙ্কর চন্দ্র মণ্ডলের মৃত্যু
ঢাকার ধামরাইয়ের হিন্দু বাসিন্দা শঙ্কর চন্দ্র মণ্ডল চুরির অভিযোগে মারধরের শিকার হওয়ার সাত দিন পর ১৫ আগস্ট মারা যান।
এ ঘটনায় তাঁর বাবা হত্যা মামলা করেন।
মামলার প্রধান আসামি ওয়াজেদ হাজীকে পরে কক্সবাজার থেকে র্যাবের যৌথ অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয়।
১৭ আগস্ট: ঘরের ভেতর হত্যা করা হয় বীণা রানী রায়কে
দুই দিন পর ১৭ আগস্ট কুমিল্লার চান্দিনায় নিজ বাড়িতে হত্যা করা হয় ৫৮ বছর বয়সী বীণা রানী রায়কে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যার পূজা শেষ করে বীণা রানী টেলিভিশন দেখছিলেন। তাঁর স্বামী তখন বাড়িতে ছিলেন না।
এ সময় দুর্বৃত্তরা ঘরে ঢুকে তাঁর মাথায় বারবার আঘাত করে।
চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এলেও হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
১৭ আগস্ট: রাঙামাটিতে স্কুলছাত্র রিপন চাকমা নিহত
একই দিন রাঙামাটিতে নিহত হয় আদিবাসী চাকমা সম্প্রদায়ের স্কুলছাত্র রিপন চাকমা।
পার্বত্য চট্টগ্রামে এই সময়ের মধ্যে জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সদস্যদের ঘিরে যেসব সহিংসতার ঘটনা সামনে এসেছে, এটি ছিল তার একটি।
২২ আগস্ট: রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যা
এই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত হত্যাকাণ্ড ঘটে রংপুরে।
২২ আগস্ট গণপতি চক্রবর্তী ৬৫, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, ৫০, কন্যা আগামী চক্রবর্তী, ২৫, এবং পুত্র আয়ুষ চক্রবর্তীকে, ১২, তাঁদের বাড়ির ভেতরে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। এর আগে পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না।
পরিবারের চার সদস্যই হত্যার শিকার হন।
কিন্তু হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের তদন্ত ও ঘটনার ব্যাখ্যা নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন উঠতে থাকে।
প্রথমদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, মাদকাসক্ত দুই তরুণ নিজেদের মাদক সেবনের বিষয়টি গোপন রাখতে চারজনকে হত্যা করেছেন। তদন্তকারীদের বয়ানে হত্যার অস্ত্র হিসেবে মূলত গামছার কথা বলা হয়।
এই ব্যাখ্যা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে।
সমালোচকদের প্রশ্ন, আগ্নেয়াস্ত্র বা ধারালো অস্ত্র ছাড়া দুই অপ্রশিক্ষিত তরুণ কীভাবে একই বাড়িতে চারজনকে এমনভাবে হত্যা করতে পারেন যে তাঁদের কেউ চিৎকার করে প্রতিবেশীদের সতর্ক করারও সুযোগ পেলেন না।
ঘটনাস্থল ও মরদেহের অবস্থা নিয়ে প্রকাশিত তথ্যের পর পুলিশের প্রাথমিক বয়ান নিয়ে আরও প্রশ্ন দেখা দেয়।
লাশের প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, নিহতদের মুখ দাহ্য পদার্থ দিয়ে ঝলসে দেওয়া হয়েছিল, যা পুলিশ স্বীকার করেছিল। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের আগে বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগও পরিকল্পিতভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল।
পরিবারের দুই নারী সদস্যকে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছিল বলেও গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে।
ময়নাতদন্তের সঙ্গে যুক্ত মর্গের একজন সহকারী ধর্ষণের স্পষ্ট আলামত পাওয়ার কথা সাংবাদিকদের জানান। অথচ চূড়ান্ত ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার আগেই তদন্তকারীরা ধর্ষণের বিষয়টি নাকচ করে দেন।
আলামত নষ্টেরও অভিযোগ
ঘটনাটি আরও বিতর্কিত হয়ে ওঠে যখন অভিযোগ ওঠে, রাতের বেলায় পুলিশ সদস্যরাই গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে ঢুকে আলামত নষ্ট করেছেন।
এ অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর হত্যাকাণ্ডে জড়ানো দুই তরুণের বাবা ও ভাইদের পুলিশ ধরে নিয়ে যায় এবং তাঁদের ওপর গুরুতর নির্যাতন চালিয়ে মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
আরও অভিযোগ রয়েছে, দুই তরুণকে ইয়াবাসেবী প্রমাণ করতে তদন্তকারীরা কথিত এক ইয়াবা ব্যবসায়ীর সাক্ষ্য নেন। কিন্তু যার বক্তব্য দিয়ে দুই তরুণের মাদক সংশ্লিষ্টতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়, সেই কথিত অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
পুলিশের বক্তব্যের পরিবর্তন, ফরেনসিক আলামত নিয়ে বিতর্ক এবং অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ—সব মিলিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস ও সন্দেহ প্রবল হয়েছে। মানুষ বলছে, তদন্তে সব সম্ভাব্য কারণ অনুসন্ধানের পরিবর্তে আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে।
দুই তরুণকে বলির পাঁঠা বানিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল এবং হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য সাম্প্রদায়িক বা অন্য কোনো সংগঠিত উদ্দেশ্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশের বয়ান নিয়ে সংখ্যালঘুদের প্রশ্ন
রংপুরের ঘটনা বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বড় উদ্বেগকে সামনে এনেছে। তাঁদের অভিযোগ, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় সম্ভাব্য সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য অনেক ক্ষেত্রেই তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই নাকচ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সম্প্রদায়ের নেতাদের বক্তব্য, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো হত্যাকাণ্ডকে ব্যক্তিগত বিরোধ, সাধারণ অপরাধ বা অসাম্প্রদায়িক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়।
তাঁদের একাংশের আরও গুরুতর অভিযোগ, এভাবে তদন্ত প্রভাবিত হলে একদিকে হিন্দু হত্যার বিচার বাধাগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে সাজানো মামলায় আরও হিন্দু পরিবারকে জড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
গত ২৯ আগস্ট এক প্রতিবাদী মানববন্ধনে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট অভিযোগ তোলে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এজন্য স্বাধীন তদন্ত এবং বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় ফরেনসিক প্রতিবেদন, আলামত, সন্দেহভাজন ব্যক্তি এবং তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।
২৯ আগস্ট: খাগড়াছড়িতে নিকা ত্রিপুরার মরদেহ উদ্ধার
২৯ আগস্ট খাগড়াছড়িতে ৩০ বছর বয়সী নিকা ত্রিপুরার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তাঁকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
সংখ্যালঘু নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার অভিযোগ থাকা ঘটনাগুলোর মধ্যে এটিও রয়েছে।
১ সেপ্টেম্বর: স্বর্ণের দোকানে সুমন দের রহস্যজনক মৃত্যু
সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সামনে আসে আরেকটি রহস্যজনক মৃত্যু।
১ সেপ্টেম্বর মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ীতে একটি স্বর্ণের দোকানের ভেতর থেকে দীর্ঘদিনের কর্মচারী সুমন দে, ৪৫-এর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁর মরদেহ বিবস্ত্র অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল।
তাঁর মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও প্রাপ্ত তথ্যে হত্যার উদ্দেশ্য নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
নারায়ণগঞ্জে শুভ চন্দ্র দাসকে গুলি ও ছুরিকাঘাত
সেপ্টেম্বরের শুরুতে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় হত্যা করা হয় ৩০ বছর বয়সী শুভ চন্দ্র দাসকে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পিতভাবে তাঁকে ওই এলাকায় ডেকে নেওয়া হয়েছিল। এরপর একদল ব্যক্তি তাঁকে গুলি করে এবং ছুরি দিয়ে আঘাত করে।
ঘটনার ধরন থেকে এটি আকস্মিক সংঘর্ষের পরিবর্তে পরিকল্পিত হামলা ছিল বলে ধারণা তৈরি হয়।
৭ সেপ্টেম্বর: ঘরে ঢুকে শিল্পী রানী সুশীলকে ছুরিকাঘাত
৭ সেপ্টেম্বর পৃথক ঘটনায় দুই হিন্দু নাগরিক নিহত হন।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে ৪৫ বছর বয়সী শিল্পী রানী সুশীলকে তাঁর বাড়ির ভেতরে ছুরিকাঘাত করা হয়।
আহত অবস্থায় তাঁকে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হলেও পরে তাঁর মৃত্যু হয়।
তাঁর স্বামী রবীন্দ্র লাল সুশীল একজন ব্যবসায়ী। তিনি স্থানীয় একটি কালীমন্দির পরিচালনা কমিটির সঙ্গেও যুক্ত বলে জানা গেছে।
তবে তাঁর স্বামীর মন্দিরের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, প্রাপ্ত তথ্যে তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
৭ সেপ্টেম্বর: নওগাঁয় স্বর্ণ ব্যবসায়ী অলিফ চন্দ্র দত্তকে হত্যা
একই দিন নওগাঁর মহাদেবপুরে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে হামলার শিকার হন দত্ত জুয়েলার্সের মালিক অলিফ চন্দ্র দত্ত।
তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়।
পরিবার ও পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর কাছে থাকা প্রায় ছয় ভরি স্বর্ণ এবং ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা নিয়ে যাওয়া হয়।
পরে তাঁর মৃত্যু হয়।
এই হত্যাকাণ্ড হিন্দু ব্যবসায়ী ও স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগকে আরও সামনে এনেছে। স্বর্ণ, নগদ অর্থ বা ব্যবসায়িক সম্পদের কারণে তাঁরা অপরাধীদের অর্থনৈতিক লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন। তবে কোনো ঘটনায় ডাকাতি এবং সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের কারণে ঝুঁকি—দুটির মধ্যে সম্পর্ক ছিল কি না, তা অনুমানের পরিবর্তে তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রামে হিজড়া নেত্রী মৌসুমীকে শ্বাসরোধে হত্যার সন্দেহ
এই সময়ের সহিংসতা শুধু ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের আমবাগান রেলওয়ে কলোনির কাছে নিজের ঘর থেকে ৫২ বছর বয়সী মোহাম্মদ মহসিন ওরফে মৌসুমী হিজড়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তিনি চট্টগ্রামের হিজড়া সম্প্রদায়ের একজন পরিচিত ‘গুরুমা’ ছিলেন।
পুলিশ প্রাথমিকভাবে তাঁর গলায় দাগ দেখতে পায় এবং তাঁকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করে।
একই ২৫ দিনের মধ্যে দুই রোহিঙ্গা শরণার্থীও নিহত হয়েছেন বলে সংগৃহীত হিসাবে উল্লেখ রয়েছে। তবে এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া তথ্যে ওই দুই হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ নেই। তাই তাঁদের হত্যার পরিস্থিতি সম্পর্কে অনুমাননির্ভর কোনো তথ্য এখানে যুক্ত করা হয়নি।
হত্যাকাণ্ডের আগেই শুরু হয়েছিল হুমকি
১৫ আগস্ট থেকে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের আগেই আগস্টের শুরু থেকে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের হুমকি ও হামলার ঘটনা সামনে আসতে থাকে।
১ আগস্ট রাতে নাটোরের লালপুর উপজেলার বাকনাই গ্রামের পাঁচটি হিন্দু পরিবার প্রায় একই ধরনের ছাপানো চাঁদাবাজির চিঠি পায়।
প্রতিটি পরিবারের কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে মরদেহ রাস্তায় ফেলে রাখার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
হুমকি পাওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে ছিলেন নারায়ণ কুমার পাল, অজমিল পাল, সুব্রত পাল, অধীর পাল ও ষষ্ঠী পালের পরিবার।
ওই এলাকায় প্রায় ৫৫টি হিন্দু পরিবারের বসবাস।
পুলিশ চিঠিগুলো জব্দ করে তদন্ত শুরু করে এবং এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করে।
একজন ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে সাধারণ চাঁদাবাজির হুমকির পরিবর্তে একাধিক হিন্দু পরিবারের কাছে একই ধরনের হুমকি পৌঁছানোয় ঘটনাটি বিশেষ উদ্বেগ তৈরি করে।
দিনাজপুরে হিন্দু পরিবারের ছয় সদস্য আহত
৩ আগস্ট দিনাজপুরের বীরগঞ্জে দীর্ঘদিনের জমিসংক্রান্ত বিরোধের মধ্যে একটি হিন্দু পরিবারের ছয় সদস্য হামলার শিকার হন।
আহতরা হলেন লক্ষ্মণ রায়, শুকরু রায়, প্রফুল্ল রায়, হরিশ রায়, কমলা রায় ও বধুবালা রায়।
তাঁদের কয়েকজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়।
সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখলের উদ্দেশ্যে ওই হামলা চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
টাঙ্গাইল ও মাদারীপুরে মন্দির-প্রতিমা ভাঙচুর
আগস্টে হিন্দু ধর্মীয় স্থাপনাতেও হামলার ঘটনা ঘটে।
৩ আগস্টের দিকে টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে দুটি হিন্দু মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়। লক্ষ্মী, সরস্বতী, কালী ও শীতলী প্রতিমা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এর কয়েক দিন পর মাদারীপুরের মোস্তফাপুর ইউনিয়নে শ্রীশ্রী গণেশ পাগল মন্দির এবং শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণ মন্দিরে রাতে ভাঙচুর চালানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
অর্থ, সম্পত্তি বা ব্যক্তিগত বিরোধের ঘটনার বিপরীতে উপাসনার প্রতীক বা ধর্মীয় স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা স্বাভাবিকভাবেই সাম্প্রদায়িক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়।
জন্মাষ্টমীর প্রস্তুতি সভায় হিন্দু নেতা আক্রান্ত
১৪ আগস্ট ঝালকাঠিতে জন্মাষ্টমীর প্রস্তুতি সভায় হামলার শিকার হন বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অলোক সাহা।
আখড়াবাড়ি মন্দিরে জন্মাষ্টমী উদ্যাপনের প্রস্তুতি নিয়ে ওই সভা চলছিল।
ব্যবসায়ী সমীর চক্রবর্তী ও দুই ছেলের ওপর হামলা
আগস্টের শেষ দিকে ঝালকাঠির কচুয়া বাজারে হিন্দু ব্যবসায়ী সমীর চক্রবর্তী এবং তাঁর দুই ছেলে শুভ চক্রবর্তী ও লিখন চক্রবর্তীর ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা করা হয়।
অন্য একটি দোকান থেকে সিগারেট বা পণ্য চাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের পর হামলাটি ঘটে বলে জানা যায়।
সমীরের আঘাত গুরুতর হওয়ায় তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র পাঠানো হয়।
পুলিশ এ ঘটনায় একজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে।
পরে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এক ঘণ্টা দোকানপাট বন্ধ রেখে হামলাকারীদের শাস্তির দাবিতে প্রতিবাদ ও মানববন্ধন করেন।
হিন্দু কিশোরকে বেঁধে মারধরের অভিযোগ
২৭ আগস্ট লালমনিরহাটে সৌরভ চন্দ্র রায় নামে এক হিন্দু কিশোরকে চুরির অভিযোগ তুলে বেঁধে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
কয়েকটি বর্ণনায় বলা হয়, একটি মসজিদে বা মসজিদের আশপাশে তাকে নির্যাতন করা হয়েছিল। ভুক্তভোগীর ধারণা, তার হিন্দু পরিচয়ের কারণে নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছিল।
তবে হামলার সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যের অভিযোগ স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়নি।
আগস্টে ৪৩ ঘটনার দাবি পর্যবেক্ষণ সংস্থার
সনাতনী রিসার্চ অ্যান্ড আইটি লিমিটেডের একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, শুধু আগস্ট মাসেই সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন বা সহিংসতার ৪৩টি ঘটনা ঘটেছে।
এর মধ্যে ছয়টি হত্যার ঘটনা ছাড়াও শারীরিক হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অন্যান্য ধরনের সহিংসতার তথ্য রয়েছে।
১ আগস্ট নাটোরে হিন্দু পরিবারগুলোকে হত্যার হুমকি দিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্বেগজনক সময়ের মধ্যে ৭ সেপ্টেম্বর শিল্পী রানী সুশীল ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী অলিফ চন্দ্র দত্তের হত্যাকাণ্ড ঘটে। ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিন্দু ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার ঘটনাও সামনে এসেছে।
হত্যার উদ্দেশ্য আড়ালের অভিযোগই এখন বড় প্রশ্ন
এসব ঘটনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—সংখ্যালঘু নাগরিক কোনো অপরাধের শিকার হলে পুলিশ কীভাবে এবং তদন্তের কোন পর্যায়ে তার উদ্দেশ্য নির্ধারণ করছে।
কোনো হত্যাকাণ্ড ব্যক্তিগত বিরোধ, জমি, অর্থ, ডাকাতি বা অন্য অপরাধের কারণে ঘটতে পারে। প্রমাণ পাওয়া গেলে পুলিশ সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতেই পারে।
কিন্তু বিতর্ক তৈরি হচ্ছে তখনই, যখন অভিযোগ ওঠে যে তদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই সম্ভাব্য সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য নাকচ করে দেওয়া হচ্ছে।
রংপুরে একই পরিবারের চার সদস্যের হত্যাকাণ্ড এ উদ্বেগের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
সেখানে পুলিশের বয়ান পরিবর্তন, দুই তরুণকে ইয়াবাসেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, গ্রেপ্তার না হওয়া এক কথিত মাদক ব্যবসায়ীর সাক্ষ্যের ওপর নির্ভরতা, ফরেনসিক প্রতিবেদন আসার আগেই ধর্ষণের অভিযোগ নাকচ, ঘটনাস্থলের আলামত নষ্ট এবং তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা পরিবারের সদস্যদের নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে।
এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু একটি হত্যা মামলার তদন্ত নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলবে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু নাগরিকেরা অপরাধের শিকার হলে তাঁরা নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার পাবেন কি না—সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হবে।
এ কারণেই সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর দাবি, কোনো ঘটনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে দ্রুত সিদ্ধান্ত ঘোষণা নয়; প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত।
২৫ দিনের মধ্যে ১১ হিন্দু ও এক বৌদ্ধসহ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ১২ জনের মৃত্যু, পাশাপাশি একজন হিজড়া এবং দুই রোহিঙ্গা শরণার্থীর হত্যার ঘটনা বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের তদন্ত নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

মন্তব্য