ঢাকা: পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের ২৮ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পাহাড়ের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তি হয়নি। নিজেদের ভিটেমাটি ও কৃষিজমি ফিরে পাওয়ার আশায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করছেন অনেক বাস্তুচ্যুত পরিবার। ভারত থেকে ফিরে আসা অনেক শরণার্থীও নিজ ভূমিতে পুনর্বাসিত হতে পারেননি।
ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক কমিশন গঠন এবং আইন সংশোধনের পরও হাজার হাজার আবেদন ঝুলে রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি, নিরাপত্তাহীনতা, দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি এবং ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ার দীর্ঘদিনের অভিযোগ।
এমন বাস্তবতায় রোববার, ৯ আগস্ট বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস-২০২৬। জাতিসংঘ এ বছর আদিবাসী ধাত্রীদের ভূমিকা, অধিকার, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্ঞান ও কল্যাণের ধারা রক্ষার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত জ্ঞান সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। আদিবাসী ধাত্রীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “ঐতিহ্যগত জ্ঞান নতুন জীবনকে সুরক্ষা দিতে পারে।”
বাংলাদেশে দিবসটি এমন সময়ে পালিত হচ্ছে, যখন পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা এবং শান্তিচুক্তির অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে।
দুই যুগের সংঘাত শেষে হয়েছিল পার্বত্য চুক্তি
রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—তিন পার্বত্য জেলায় দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘাতের অবসান এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
প্রায় দুই দশকের সশস্ত্র সংঘাতের পর স্বাক্ষরিত ওই চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের কথা বলা হয়। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, ভূমি সমস্যা, ভারত থেকে প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন এবং আঞ্চলিক শাসনব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছিল।
চুক্তির পর আনুষ্ঠানিক সশস্ত্র সংঘাতের অবসান হলেও এর সব ধারা বাস্তবায়ন হয়নি বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে পাহাড়ের বিভিন্ন সংগঠন।
চলতি বছরের মার্চেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের নেতারা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য সময়সীমাবদ্ধ রোডম্যাপ এবং ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন।
এর আগে ২০২৫ সালের ৯ আগস্ট রাঙামাটিতে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের এক অনুষ্ঠানে সাবেক সংসদ সদস্য ও পিসিজেএসএসের সহসভাপতি ঊষাতন তালুকদার বলেছিলেন, “আমরা বাংলাদেশে এক ধরনের শাসনব্যবস্থা দেখি, আর পাহাড়ে দেখি আরেক ধরনের।”
তিনি আদিবাসীদের পরিচয়, অধিকার এবং পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
১০ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি জ্ঞান লাল চাকমার আবেদন
ভূমি সমস্যার দীর্ঘসূত্রতার একটি উদাহরণ রাঙামাটির লংগদু উপজেলার ঘনমোড় মৌজার শিলকাটা গ্রামের জ্ঞান লাল চাকমা।
নিজের পাঁচ একর বসতভিটা ফেরত চেয়ে তিনি ২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর খাগড়াছড়িতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে আবেদন করেছিলেন।
প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও তার সেই বিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি। বর্তমানে ওই জমিতে পুনর্বাসিত অন্য লোকজন বসবাস করছেন। নিজের জমিতে ফিরতে না পেরে জ্ঞান লাল পরিবার নিয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলার দেবাছড়ি গ্রামে অন্যের জমিতে বসবাস করছেন।
কৃষক ন্যালশন চাকমার অবস্থাও অনেকটা একই রকম।
পার্বত্যাঞ্চলের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার পাবলাখালি থেকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গিয়ে শরণার্থী জীবন কাটিয়েছিলেন তিনি। পরে দেশে ফিরলেও নিজের জমিজমা ফিরে পাননি।
বর্তমানে দীঘিনালার সাজেক ইউনিয়নের বাঘাইহাট এলাকায় পরিবার নিয়ে অনেকটা উদ্বাস্তুর মতো জীবনযাপন করছেন ন্যালশন।
জ্ঞান লাল ও ন্যালশনের মতো বহু পরিবার বছরের পর বছর নিজেদের বসতভিটা ও জমিতে ফিরতে না পারার অভিযোগ করে আসছে।
ভারত থেকে ফিরেও ভিটেমাটি পাননি বহু পরিবার
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, শান্তি প্রক্রিয়ার পর ভারতের ত্রিপুরা থেকে ১২ হাজার ২২২টি পরিবারের ৬৪ হাজার ৬০৯ জন বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
ওই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রত্যাবর্তনকারী পরিবারের মধ্যে ৯ হাজার ৭৮০টি পরিবার তাদের আগের বসতভিটা, কৃষিজমি বা গ্রামে পুরোপুরি ফিরে যেতে পারেনি, কারণ তাদের অনেকের জমি অন্যদের দখলে ছিল।
তবে পার্বত্য এলাকার শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের কিছু হিসাবে প্রায় ৩৭ হাজার পরিবার ফেরত আসার কথা বলা হলেও ঐতিহাসিক নথিতে ১২ হাজার ২২২ পরিবারের ৬৪ হাজার ৬০৯ জন প্রত্যাবর্তনকারীর তথ্য পাওয়া যায়।
অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের সংখ্যা ও সংজ্ঞা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
কার্যকর হতে পারেনি ভূমি কমিশন
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা সমাধান ছিল শান্তিচুক্তির অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার।
এ লক্ষ্যেই সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করে। ২০০১ সালে এ-সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করা হলেও চুক্তির সঙ্গে আইনের কয়েকটি বিধানের সামঞ্জস্য নিয়ে দীর্ঘদিন বিরোধ ছিল।
শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালে জাতীয় সংসদে আইনটি সংশোধন করা হয়।
কিন্তু আইনি বাধা দূর করার উদ্যোগ নেওয়ার পরও কমিশনের কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতি পায়নি। বিভিন্ন সময়ে কমিশনে প্রায় ২৩ হাজার ভূমি-সংক্রান্ত আবেদন জমা হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
চেয়ারম্যানের পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকার পর ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মুহাম্মদ আব্দুল হাফিজকে তিন বছরের জন্য কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়।
এরপরও চলতি বছর বিভিন্ন নাগরিক ও আদিবাসী অধিকার সংগঠন কমিশনকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে। অর্থাৎ শুধু চেয়ারম্যান নিয়োগের মধ্য দিয়ে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা কাটেনি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চলতি বছরের এক আলোচনাতেও পার্বত্য চট্টগ্রামের অমীমাংসিত ভূমি বিরোধ, বিচারপ্রাপ্তি, স্থানীয় শাসনব্যবস্থা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার সংকটকে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পুনর্বাসন টাস্কফোর্সেও অগ্রগতি সামান্য
পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী ভারত থেকে প্রত্যাগত শরণার্থী এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের চিহ্নিত ও পুনর্বাসনের জন্য পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল।
কিন্তু সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময়েও এই প্রক্রিয়ায় প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
টাস্কফোর্সের সদস্য সন্তোষিত চাকমা বকুল বলেন, বর্তমানে টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান পদ শূন্য রয়েছে। এর আগে কমিটির ২৮টি বৈঠক হলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি।
তার অভিযোগ, ১৯৯৭ সালের পর বিভিন্ন সময়ে পাহাড়িদের ওপর হামলা, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগসহ অন্তত ২৯টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার কারণে অনেকে নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং আগে বাস্তুচ্যুত হওয়া অনেক পরিবারও নিজেদের জমি ফিরে পায়নি।
সন্তোষিত চাকমার মতে, জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন, পার্বত্য চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন এবং আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব, ভূমি এবং জানমালের নিরাপত্তার জন্য শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হবে।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রশ্নও অমীমাংসিত
ভূমির পাশাপাশি নিজেদের পরিচয়ের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও দেশের আদিবাসী সংগঠনগুলোর অন্যতম প্রধান দাবি।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের’ স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে এসব জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্রুপ ফর ইন্ডিজেনাস অ্যাফেয়ার্সের (আইডব্লিউজিআইএ) ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৫৪টির বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠী অন্তত ৩৫টি ভাষায় কথা বলে।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী এসব জনগোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক শতাংশ। তবে আদিবাসী সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ।
বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে সংবেদনশীল। বিভিন্ন সরকার ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’, ‘উপজাতি’ বা ‘জাতিগত সংখ্যালঘু’ ধরনের পরিভাষা ব্যবহার করেছে।
অন্যদিকে আদিবাসী সংগঠনগুলোর দাবি, আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতির সঙ্গে তাদের ভূমি, সংস্কৃতি ও সামষ্টিক অধিকারের প্রশ্ন সরাসরি জড়িত।
‘ভূমি অধিকার হচ্ছে সমষ্টিগত অধিকার’
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান মনে করেন, আদিবাসীদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ভূমির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।
তার ভাষায়, “আদিবাসীদের জীবন-জীবিকার মধ্যে ভূমি অধিকার জড়িত। ভূমি অধিকার হচ্ছে সমষ্টিগত অধিকার। যুগ যুগ ধরে প্রথাগত রীতিনীতির ভিত্তিতে আদিবাসীরা এ ভূমি অধিকার ভোগ করে আসছে। কিন্তু এ ভূমি অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।”
এর আগেও ভূমি ও জীবিকা নিয়ে এক আলোচনায় তিনি বলেছিলেন, “আমাদের জমি থাকলেই কেবল আমরা চাষ করতে পারি।”
পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমির মালিকানার প্রশ্নটি বিশেষভাবে জটিল। কারণ সেখানে অনেক জনগোষ্ঠীর ভূমি ব্যবহারের ঐতিহ্যগত ও সামষ্টিক ব্যবস্থা দেশের প্রচলিত ব্যক্তিমালিকানাভিত্তিক দলিল ব্যবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
এ কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি এবং ভূমি কমিশন আইনে স্থানীয় রীতি, প্রথা ও পদ্ধতিকে গুরুত্ব দিয়ে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
শান্তিচুক্তির পরও অস্থিরতা কাটেনি
১৯৯৭ সালের চুক্তি সরকার ও পিসিজেএসএসের মধ্যকার আনুষ্ঠানিক সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটালেও পাহাড়ে স্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের মধ্যে বিভক্তি, সশস্ত্র তৎপরতা, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পক্ষের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
ইন্টারন্যাশনাল চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস কমিশন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হয়রানি, ভয়ভীতি, হামলা ও বাস্তুচ্যুতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ১৯৯৭ সালের চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে।
অধিকারকর্মীদের মতে, ভূমি সমস্যার নিষ্পত্তি না হওয়া এবং চুক্তির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গীকারগুলো অসম্পূর্ণ থাকায় দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথে বড় বাধা রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে দেশজুড়ে কর্মসূচি
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম রোববার সকাল ১০টায় ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করার কথা রয়েছে ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য জগদীশ চন্দ্র বর্মনের।
অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে মানবাধিকার ও নারী অধিকারকর্মী খুশী কবির, সংসদ সদস্য আন্না মিনজ, সাবেক সংসদ সদস্য ও পিসিজেএসএসের সহসভাপতি ঊষাতন তালুকদার, অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, সাবেক সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম এবং এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদের।
রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের আদিবাসী জনগোষ্ঠীও দিবসটি উপলক্ষে শোভাযাত্রা, সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিলেট, রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দিবসটি পালনের কর্মসূচি রয়েছে।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের এসব আয়োজন একদিকে দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরবে; অন্যদিকে সামনে আনবে তাদের দীর্ঘদিনের কয়েকটি অমীমাংসিত দাবি—পরিচয়ের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা, বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন এবং ভূমির অধিকার।
জ্ঞান লাল চাকমা কিংবা ন্যালশন চাকমার মতো মানুষের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার।
১৯৯৭ সালে যে চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘ সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তির নতুন অধ্যায় শুরুর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, ২৮ বছরের বেশি সময় পরও ভূমি সমস্যার সমাধান সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অন্যতম বড় পরীক্ষা হয়ে রয়েছে।


