সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ড ঘিরে সর্বশেষ অভিযোগ বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ও দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত একটি ফৌজদারি মামলাকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
এই ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি সত্যিই একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সঠিক তদন্তের মাধ্যমে হত্যার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, নাকি দীর্ঘদিনের এই মামলাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ভিন্নমতাবলম্বীদের টার্গেট করার একটি উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে?
দেড় দশকের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও হত্যার প্রকৃত রহস্য উদঘাটিত না হওয়ায় বিষয়টি এখন আর শুধু একটি অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বাংলাদেশের আইনের শাসন, তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৬ সালের ৩০ আগস্ট আমার দেশ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং অভিনেত্রী ও আওয়ামী লীগ সমর্থক রোকেয়া প্রাচীর সঙ্গে সাগর রুনি হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য যোগসূত্রের কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সময়ের আশপাশে জিয়াউল আহসান ও প্রাচীর মধ্যে ঘন ঘন যোগাযোগের তথ্য তদন্তকারীরা পেয়েছেন। আরও দাবি করা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পরপরই প্রাচীর কাছ থেকে পিলখানা বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে তৈরি একটি তথ্যচিত্রসংক্রান্ত দুটি পেনড্রাইভ সংগ্রহ করা হয়েছিল।
এগুলো গুরুতর অভিযোগ। তবে অভিযোগ কখনোই প্রমাণের বিকল্প নয়। আইনসম্মত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে স্বাধীন প্রমাণের ভিত্তিতে এসব অভিযোগ যাচাই করা জরুরি।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনিকে হত্যা করা হয়। প্রথমে ঢাকা মহানগর পুলিশের তদন্ত বিভাগ, পরে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাব মামলাটির তদন্ত করে। বছরের পর বছর তদন্ত, গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ এবং সময় বৃদ্ধির পরও মামলাটি কোনো চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছায়নি।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্ট র্যাবকে তদন্ত থেকে সরিয়ে বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞ তদন্তকারীদের নিয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন। এরপরও একের পর এক সময় বাড়ানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা এ পর্যন্ত ১২৯ বার পিছিয়েছে।
বছরের পর বছর কয়েকজনকে গ্রেপ্তার বা আসামি করা হলেও কারা হত্যার পরিকল্পনা করেছে, নির্দেশ দিয়েছে কিংবা বাস্তবে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, সে বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে সর্বশেষ অভিযোগগুলো যেমন গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন, তেমনি এ ক্ষেত্রেও সতর্কতা অপরিহার্য। জনগণ আরেকজন সুবিধাজনক সন্দেহভাজন কিংবা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক কোনো বয়ান চায় না। প্রয়োজন এমন প্রমাণ, যা আদালতের কঠোর পরীক্ষায় টিকে থাকতে পারে।
সাগর রুনি হত্যাকাণ্ড তাই এখন একটি সাধারণ হত্যা মামলার চেয়েও বড় প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। এটি পরীক্ষা করছে, বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা ভয়, পক্ষপাত কিংবা রাজনৈতিক চাপের বাইরে গিয়ে সত্য অনুসন্ধান করতে পারে কি না।
ন্যায়বিচার কেবল অভিযোগ কিংবা স্বীকারোক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন তদন্ত, যা গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করবে কারা তাদের হত্যা করেছে, কার নির্দেশে করেছে, হত্যার উদ্দেশ্য কী ছিল এবং সত্য উদঘাটনের প্রচেষ্টাকে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে কি না।
১৪ বছরেরও বেশি সময় পর এটুকুই সাগর ও রুনির পরিবার এবং বাংলাদেশের মানুষের ন্যায্য প্রত্যাশা।
বাংলাদেশের ফৌজদারি মামলায় ‘জজ মিয়া সিনড্রোম’ কী?
‘জজ মিয়া সিনড্রোম’ বলতে এমন একটি প্রবণতাকে বোঝায়, যেখানে বহুল আলোচিত কোনো অপরাধের প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করে নিরপরাধ কিংবা দুর্বল কাউকে বলির পাঁঠা বানিয়ে মামলার একটি দ্রুত ও সুবিধাজনক পরিণতি দেখানোর চেষ্টা করা হয়।
২০০৫ সালের জজ মিয়া মামলাকে কেন্দ্র করেই এই শব্দটির উৎপত্তি। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় এক দরিদ্র ক্যাসেট বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করে নির্যাতনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টতার স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তার পরিবারকে অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি তদন্তকারীরা একটি মিথ্যা বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন বলেও পরে অভিযোগ ওঠে।
পরবর্তীতে ‘জজ মিয়া সিনড্রোম’ বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় সাজানো তদন্ত, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি, ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার এবং প্রকৃত অপরাধীদের দায়মুক্তির প্রতীকে পরিণত হয়। এর মধ্য দিয়ে এমন একটি বিচারব্যবস্থার আশঙ্কা প্রতিফলিত হয়, যেখানে সত্য উদঘাটনের পরিবর্তে দ্রুত একটি মামলা নিষ্পত্তি করাই অগ্রাধিকার পেতে পারে।
রোকেয়া প্রাচীকে ঘিরে প্রশ্ন: ন্যায়বিচার কি ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার?
রোকেয়া প্রাচীকে ঘিরে অভিযোগগুলোও সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন, বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টের পর তার প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে।
প্রাচী আওয়ামী লীগ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও উত্তরাধিকার, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও মব সহিংসতা, ভাস্কর্য ভাঙচুর এবং ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাসভবন ধ্বংসের মতো বিভিন্ন বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। দেশের গভীরভাবে বিভক্ত রাজনৈতিক পরিবেশে তার এই অবস্থান তাকে একটি দৃশ্যমান ও বিতর্কিত কণ্ঠে পরিণত করেছে।
রাষ্ট্র যদি কোনো কণ্ঠকে থামাতে বা তার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করতে চায়, তা যেন ভয়ভীতি, নির্বিচার মামলা কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফৌজদারি অভিযোগের মাধ্যমে না করা হয়। কোনো অপরাধের প্রমাণ থাকলে তা স্বাধীন আদালতে উপস্থাপন করা এবং আইন অনুযায়ী বিচার হওয়াই যথাযথ পথ। অন্যথায় তদন্ত নিজেই সমস্যার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
এখানেই ‘জজ মিয়া নাটক’-এর সঙ্গে তুলনাটি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার তদন্ত পরে একটি মিথ্যা বয়ান তৈরি এবং একজন দুর্বল ব্যক্তিকে বলির পাঁঠা বানানোর অভিযোগে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল।
সেই ঘটনার শিক্ষা স্পষ্ট হওয়া উচিত: রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক বলে কোনো ব্যক্তিকে আগে থেকেই সন্দেহভাজন নির্ধারণ করে তদন্ত পরিচালনা করা যায় না।
সাগর রুনি হত্যা মামলায় জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচীকে ঘিরে প্রকাশিত অভিযোগও তাই স্বাধীন যাচাই, বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ এবং পূর্ণাঙ্গ বিচারিক পর্যালোচনার দাবি রাখে। রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে প্রাচীকে যেমন সুরক্ষা দেওয়া উচিত নয়, তেমনি তিনি অস্বস্তিকর কণ্ঠে পরিণত হয়েছেন বলেও তাকে বলির পাঁঠা বানানো উচিত নয়। প্রকৃত তদন্তের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত সত্য উদঘাটন এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা।
জিয়াউল আহসান প্রশ্ন: একের পর এক মামলায় একই ব্যক্তি
মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে ঘিরে বিষয়টি বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। তিনি কোনো মামলায় এখনো দোষী সাব্যস্ত হননি। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১ এ মানবতাবিরোধী অপরাধ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমসহ বিভিন্ন অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি এবং কারাগারে রয়েছেন।
২০২৬ সালের আগস্টে ট্রাইব্যুনাল ২০১৫ সালে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের কথিত অপহরণ ও নিখোঁজের ঘটনায় তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখান এবং তদন্ত শেষ করতে প্রসিকিউশনকে অতিরিক্ত সময় দেন।
তার সাবেক অধীনস্থ কর্মকর্তা ও অন্যান্য সাক্ষীরাও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন, যার মধ্যে র্যাবে তার দায়িত্ব পালনকালে বিপুলসংখ্যক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে।
এখন তাকে সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডসহ আরও কয়েকটি আলোচিত মামলার তদন্তের সঙ্গেও যুক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা বাড়তে থাকলে স্বাধীন তদন্ত ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন আরও বেড়ে যায়। বিচার যেন কোনো একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা করার প্রক্রিয়ায় পরিণত না হয়।
প্রতিটি মামলা তার নিজস্ব প্রমাণের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি ভুক্তভোগীদের সত্য ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে পরিচালিত প্রক্রিয়াটিই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচারের অভিযোগের মুখে পড়তে পারে।
সরকার বদলায়, কিন্তু ‘জজ মিয়া নাটক’ কি বদলায়?
সরকার বদলায়, রাজনৈতিক জোট বদলায়, ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরাও বদলে যান। কিন্তু বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা সত্যিই বদলেছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
জজ মিয়া এমন এক ব্যবস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন, যেখানে একটি উচ্চপ্রোফাইল মামলার সুবিধাজনক সমাপ্তি দেখাতে একজন দুর্বল মানুষকে বলির পাঁঠা বানানোর অভিযোগ উঠেছিল। তিনি হয়তো একক কোনো ঘটনার শিকার ছিলেন না।
বছরের পর বছর ভুল গ্রেপ্তার, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা এবং সুবিধাজনক ব্যক্তিকে সন্দেহভাজন বানানোর অভিযোগ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফলে মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচীকে ঘিরে নতুন অভিযোগগুলো বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
কেউই এসব অভিযোগে এখনো দোষী সাব্যস্ত হননি। গণমাধ্যমের বয়ানের মাধ্যমে কাউকে অপরাধীও ঘোষণা করা উচিত নয়। কিন্তু যদি বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ ছাড়াই তাদের সুবিধাজনক সন্দেহভাজনে পরিণত করা হয়, তাহলে বাংলাদেশ বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে পুরোনো ‘জজ মিয়া নাটক’-এরই আরেকটি সংস্করণ মঞ্চস্থ করছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে।
সরকারের কাছে তাই জনগণের একটি স্পষ্ট উত্তর প্রাপ্য: এসব তদন্ত কি সত্যিই সত্য উদঘাটনের জন্য পরিচালিত হচ্ছে, নাকি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর মামলার দ্রুত সমাপ্তির জন্য নতুন বলির পাঁঠা তৈরি করা হচ্ছে?
স্বচ্ছ তদন্ত, বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ, বিচারিক স্বাধীনতা এবং ন্যায়সংগত বিচারই কেবল এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে এবং একই চক্রের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পারে।
লেখক একজন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী

মন্তব্য