ঢাকা — নারী শিক্ষার্থীদের রাতে চলাচল নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইস্রাফিল রতন সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তাঁর নামে প্রকাশিত মন্তব্য অস্বীকার করে তিনি সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের প্রতিবেদনকে “সম্পূর্ণ মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিভ্রান্তিকর” বলে দাবি করেছেন।
বিতর্কের সূত্রপাত ঢাকা স্ট্রিমের একটি প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, নারী শিক্ষার্থীদের চলাচল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী আবাসিক হলগুলোর গেট বন্ধের সময় নিয়ে আলোচনার সময় টেলিফোনে ইস্রাফিল রতন কথিতভাবে বলেন, “রাতে কয়টার সময় তোমার মা-বোন বাসায় ফেরে? আমার পরিবারের কোনো নারী রাত ১১টার পর বাইরে থাকে না।

মন্তব্যটি প্রকাশের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। একই সময়ে নারী আবাসিক হলগুলোর গেট খোলা ও বন্ধের সময় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান বিতর্কও নতুন মাত্রা পায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাডে মন্তব্য অস্বীকার প্রক্টরের
পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল প্যাডে দেওয়া এক প্রতিবাদলিপিতে ইস্রাফিল রতন তাঁর নামে প্রকাশিত মন্তব্য সরাসরি অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, উদ্ধৃত বক্তব্যটি “সম্পূর্ণ মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিভ্রান্তিকর”। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, গত এক সপ্তাহে তিনি এ বিষয়ে কোনো সাংবাদিক বা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলেননি।
প্রতিবাদলিপিতে তিনি বলেন, তাঁর কথিত মন্তব্য নিয়ে প্রতিবেদন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্টগুলো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। এসব প্রচার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত করার পাশাপাশি ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ ধরনের বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচার থেকে সবাইকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
কললগের তথ্য সামনে এনে প্রতিবাদ প্রত্যাখ্যান
তবে প্রক্টরের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে ঢাকা স্ট্রিম জানিয়েছে, তারা তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনের অবস্থান থেকে সরে আসছে না।
সংবাদমাধ্যমটির দাবি, ২৩ আগস্ট রাত ৮টা ৫২ মিনিটে ইস্রাফিল রতনের সঙ্গে তাদের নিউজরুমের টেলিফোনে কথা হয় এবং ওই কথোপকথন চলে ১২ মিনিট ১৯ সেকেন্ড। তাদের কাছে থাকা কললগে এর প্রমাণ রয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা।

ঢাকা স্ট্রিমের দাবি, ওই কথোপকথনের সময় প্রক্টরই বিতর্কিত মন্তব্যটি করেন। একই আলোচনায় তিনি নারী শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলের রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত গেট বন্ধ রাখার বিষয়েও একাধিকবার একই ধরনের মতামত ব্যক্ত করেন বলে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে।
ঢাকা স্ট্রিম আরও বলেছে, কথোপকথনটি তাদের নিউজরুমে স্পিকারফোনে হওয়ায় একাধিক সহকর্মী তা শুনেছেন এবং আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশের বিস্তারিত নোটও নিয়েছেন।
প্রতিবাদের পরও প্রক্টরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা
ঢাকা স্ট্রিমের ভাষ্য অনুযায়ী, ইস্রাফিল রতনের প্রতিবাদলিপি পাওয়ার পর তাদের একজন প্রতিবেদক ২৩ আগস্টের ফোনালাপের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিতে প্রক্টরকে ফোন করেন। এ সময় তিনি হঠাৎ ফোন কেটে দেন বলে দাবি করেছে সংবাদমাধ্যমটি।
এরপর ওই প্রতিবেদক আরও পাঁচবার ফোন করলেও প্রক্টর আর সাড়া দেননি বলে জানিয়েছে ঢাকা স্ট্রিম।
প্রক্টরের প্রতিবাদলিপিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথিত মন্তব্যসংবলিত ফটোকাড ছড়িয়ে দেওয়ার যে দাবি করা হয়েছে, সেটিও প্রত্যাখ্যান করেছে সংবাদমাধ্যমটি। তাদের দাবি, প্রতিবাদলিপিতে উল্লেখ করা মন্তব্যসংবলিত কোনো ফটোকাড তারা প্রকাশ বা প্রচার করেনি।
আগের সাক্ষাৎকারের মন্তব্যও আলোচনায়
এদিকে, আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে আরেকটি ইংরেজি ভাষার গণমাধ্যমকে দেওয়া ইস্রাফিল রতনের একটি সাক্ষাৎকারের বক্তব্যও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, সাধারণত কোনো বাবা-মা তাঁদের মেয়েদের রাত ১০টার পর বাইরে থাকার অনুমতি দেন না। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন করেন, “আমরা কি আমাদের বাঙালি ও বাংলাদেশি সংস্কৃতি ভুলে যাব? আমরা কি ইউরোপ হয়ে যাব?”
তাঁর এসব মন্তব্যের পর নারী শিক্ষার্থীদের রাতে চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, অভিভাবকদের প্রত্যাশা ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা—এসব বিষয় কি নারী শিক্ষার্থীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি হতে পারে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ক্ষোভ নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে
এ ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
শিক্ষার্থী সুস্মিতা মীম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইস্রাফিল রতনের সমালোচনা করে তাঁর প্রক্টরের পদে থাকার উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
মীমের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল প্যাডে দেওয়া প্রতিবাদলিপি বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারেনি। বিশেষ করে ঢাকা স্ট্রিমের কললগ এবং ১২ মিনিট ১৯ সেকেন্ডের কথোপকথনের দাবি নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের কাছ থেকে সততা, মর্যাদা, সহনশীলতা এবং অন্যের প্রতি সম্মান প্রত্যাশিত। তাঁর মতে, এসব মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আচরণ একজন শিক্ষকের জন্য কতটা গ্রহণযোগ্য—সেটিও প্রশ্নের বিষয়।
মীম আরও দাবি করেন, অতীতে চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী এবং রোকেয়া হলের ছাত্রীদের সঙ্গে প্রক্টরের কথিত আগ্রাসী আচরণ নিয়ে সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এমন বিতর্কিত অভিযোগের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রক্টরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
নারীর স্বাধীনতা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন
ইস্রাফিল রতনের মন্তব্য অস্বীকার এবং ঢাকা স্ট্রিমের পাল্টা অবস্থানকে ঘিরে বিতর্কটি এখন একটি ফোনালাপের সত্যতা যাচাইয়ের প্রশ্ন ছাড়িয়ে বৃহত্তর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনায় পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে প্রশ্ন উঠছে—সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, অভিভাবকদের প্রত্যাশা এবং ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার যুক্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের রাতের চলাচলের ওপর কতটা বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে?
একদিকে ইস্রাফিল রতন তাঁর নামে প্রকাশিত মন্তব্য সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে ঢাকা স্ট্রিম দাবি করছে, তাদের প্রতিবেদনের পক্ষে রয়েছে কললগ এবং ওই সময় কথোপকথন শুনেছেন এমন একাধিক নিউজরুম কর্মীর বক্তব্য ও নোট।
ফলে বিতর্কটি এখন শুধু ২৩ আগস্টের ওই ফোনালাপে কী বলা হয়েছিল—সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে
নারী শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্তৃত্ব, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এবং ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা।

মন্তব্য