বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ | Dhaka |
| Dhaka
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

মার্কিন রাষ্ট্রদূত দুর্নীতির অভিযোগে তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করেছিলেন : ২০০৮ সালের গোপন তারবার্তা

- ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২১ অপরাহ্ন

ঘুষ, অর্থ আত্মসাৎ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল করার অভিযোগ তুলে মার্কিন দুর্নীতিবিরোধী ঘোষণার আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ. মরিয়ার্টি।

২০০৮ সালে ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ. মরিয়ার্টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী বিএনপি নেতা তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি বিবেচনার সুপারিশ করেছিলেন। ওই বছরের ৩ সেপ্টেম্বর পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোপন কূটনৈতিক তারবার্তায় এ সুপারিশের কথা উঠে এসেছে। তারেক রহমান তখনকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জ্যেষ্ঠ নেতা

তারবার্তায় মরিয়ার্টি সুপারিশ করেন, তারেক রহমানের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেনশিয়াল প্রোক্লেমেশন ৭৭৫০-এর আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হোক। বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় ব্যবহৃত এই ঘোষণার প্রসঙ্গ টেনে নথিটিতে ঘুষ, চাঁদাবাজি, অর্থ আত্মসাৎ এবং বিচারিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের একাধিক অভিযোগ তুলে ধরা হয়।

রাষ্ট্রদূতের মূল্যায়নে তারেক রহমানকে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সহিংসতার প্রতীক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত কর্মকাণ্ড জনমনে সরকারের প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ন করেছে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করেছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করেছে—এমন যুক্তিও তুলে ধরা হয় তারবার্তায়।

Screenshot 2026-10-22 215429

তবে নথিটি মূলত সে সময় ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মূল্যায়ন ও সুপারিশের দলিল। এতে উল্লিখিত অভিযোগগুলোকে শুধু এই নথির ভিত্তিতে অপরাধের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। একইভাবে, সুপারিশ করা হয়েছিল বলেই যে যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী সময়ে বাস্তবেই কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, তারও প্রমাণ এই তারবার্তায় নেই।

আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে ঘিরে ঘুষের অভিযোগ

তারবার্তায় কয়েকটি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কথিত ঘুষ লেনদেনের বিবরণ দেওয়া হয়। এসব তথ্যের ভিত্তি হিসেবে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও অন্যান্য সূত্রের বরাত উল্লেখ করা হয়েছিল।

সিমেন্স-সংশ্লিষ্ট একটি ঘটনায় নথিতে বলা হয়, এক সাক্ষীর অভিযোগ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ব্যবসায়িক চুক্তি পাইয়ে দেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত ঘুষের অর্থ তারেক রহমান ও তাঁর ভাই আরাফাত রহমানের কাছে পৌঁছেছিল। তারবার্তায় আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) এ-সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে কাজ করছিল।

চীনের হারবিন কোম্পানির বিরুদ্ধে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের কাজ নিশ্চিত করতে ৭ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার দেওয়ার অভিযোগও নথিতে উল্লেখ করা হয়। একইভাবে, দেশীয় প্রতিষ্ঠান মোনেম কনস্ট্রাকশনের বিরুদ্ধে চুক্তি পেতে ৪ লাখ ৫০ হাজার ডলারের ঘুষ দেওয়ার অভিযোগের কথাও বলা হয়। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে তারবার্তাটি নিজে কোনো স্বতন্ত্র প্রমাণ হাজির করেনি; বরং সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে তথ্যগুলো তুলে ধরেছে।

বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের ছেলে সানভীর সোবহানের হত্যা মামলাও তারবার্তায় স্থান পেয়েছিল। নথি অনুযায়ী, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি সূত্র অভিযোগ করেছিল, মামলার পরিণতি প্রভাবিত করার বিনিময়ে তারেক রহমান ২১ কোটি টাকা দাবি করেছিলেন। সে সময়ের হিসাবে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৩১ লাখ মার্কিন ডলার।
তারবার্তায় এসব অভিযোগের বিবরণ থাকলেও সেগুলোকে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা বিচারিকভাবে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।

জিয়া এতিমখানা ট্রাস্টের অর্থ নিয়ে অভিযোগ

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে জিয়া এতিমখানা ট্রাস্টের তহবিল থেকে ২ কোটি টাকা—তৎকালীন হিসাবে প্রায় ৩ লাখ মার্কিন ডলার—সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছিল ওই কূটনৈতিক তারবার্তায়।

দুদকের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে নথিতে দাবি করা হয়, ট্রাস্টের অর্থ ব্যবহার করে তারেক রহমানের নিজ এলাকায় জমি কেনা হয়েছিল। একই সঙ্গে তহবিলের অর্থের চেক বিএনপির কয়েকজন সদস্যকে নির্বাচনী প্রচারের কাজে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করা হয়।

দুর্নীতির এসব অভিযোগকে তারবার্তাটি বাংলাদেশের সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত করে। রাষ্ট্রদূতের মূল্যায়নে, দুর্নীতি এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের প্রবণতা আইনের শাসনকে দুর্বল করে, বিদেশি বিনিয়োগে নিরুৎসাহ সৃষ্টি করে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত করে।

নথিতে আরও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা ও জনআস্থার অবক্ষয় চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, দুর্নীতির প্রশ্নটিকে শুধু আর্থিক অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত করে দেখেছিল মার্কিন দূতাবাস।

জামিন, লন্ডনযাত্রা ও মার্কিন সুপারিশ

তারবার্তাটি পাঠানো হয়েছিল ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর—যেদিন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষ থেকে তারেক রহমানের জামিন ঠেকানোর শেষ মুহূর্তের আইনি প্রচেষ্টা নাকচ করার পর তিনি জামিনে মুক্তি পান বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

মার্কিন দূতাবাসের বিবরণ অনুযায়ী, বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তারেক রহমানকে পুলিশি পাহারায় হাসপাতালে রাখার কথা ছিল। তারবার্তায় পরে উল্লেখ করা হয়, ১১ সেপ্টেম্বর তিনি চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ ছেড়ে যুক্তরাজ্যে যান।

রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি মার্কিন প্রেসিডেনশিয়াল প্রোক্লেমেশন ৭৭৫০-এর ১(গ) ধারার আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড মোকাবিলার সঙ্গে সম্পর্কিত এই বিধানের প্রসঙ্গ নথিতে তোলা হলেও, সুপারিশের পর যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাস্তবে কোনো প্রবেশ-নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল কি না, তা এতে নিশ্চিত করা হয়নি।

২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাংলাদেশের দুর্নীতি, রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল এই তারবার্তা। এতে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ এবং সেগুলোর ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ রয়েছে। তবে নথিটির বক্তব্যকে সে সময়ের মার্কিন কূটনৈতিক মিশনের মূল্যায়ন হিসেবেই দেখা প্রয়োজন—অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ বিচারিক নিষ্পত্তি হিসেবে নয়।

মন্তব্য

Scroll to Top