বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ | Gallatin |
| Gallatin
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

পুনর্মিলনেই ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্রে মার্কিন সমর্থন চাই: শেখ হাসিনা

- ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৩ পূর্বাহ্ন

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিশোধের ওপর নয়, বরং পুনর্মিলনের ওপর গড়ে উঠতে হবে।

একইসাথে তিনি বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পুনরুদ্ধারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন কামনা করেছেন।

গত ১৯ অক্টোবর ওয়াশিংটন ডিসিতে ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে থিঙ্ক ট্যাঙ্ক “সেন্টার ফর ইউএস-বাংলাদেশ রিলেশনস” আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়।

শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগের সমর্থক এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে মুছে ফেলা যাবে না। “একইভাবে, যারা আমার সরকারের বিরোধিতা করেছে তারাও দেশের নাগরিক, যাদের অধিকারকে সম্মান করতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিশোধের ওপর নয়, বরং পুনর্মিলনের ওপর গড়ে উঠতে হবে।”

তিনি বলেন, “আমি এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা রাস্তায় সংঘাতের বদলে সংলাপে বসবে। যেখানে ভোটাররা নির্বাচন নির্ধারণ করবে, সহিংসতা নয়। যেখানে সাংবাদিকরা ভয় ছাড়াই রিপোর্ট করবে, যেখানে তরুণরা স্বাধীনভাবে সমালোচনা করতে পারবে।”

দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার, নির্যাতন কিংবা হত্যার শিকার হতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, জনগণের কাছে ফিরে যাওয়া তাঁর দায়িত্ব। “আমি ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে যাব। আমি ভয় পাই না।”

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতবিরোধ স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয় এবং সরকারকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু গণতন্ত্র তখনই টিকে থাকে যখন ভিন্নমতকে সমস্ত রাজনৈতিক দলকে বাদ দেওয়া বা লক্ষ লক্ষ নাগরিককে নীরব করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয় না।

মার্কিন প্রশাসনের উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনা বলেন,
“বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতিতে আমি আপনাদের সহযোগিতা চাই। হস্তক্ষেপ নয়, বাংলাদেশে কীভাবে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পুনরুদ্ধার সম্ভব সেজন্য আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চাই।”

* আমি যুক্তরাষ্ট্রকে শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লিগকে বেছে নিতে বলছি না, আমি যুক্তরাষ্ট্রকে গণতন্ত্র বেছে নিতে বলছি।
* আমি হস্তক্ষেপ চাই না, তবে সমর্থন চাই।
* আমি চাই বাংলাদেশিরা অবাধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের সরকার নির্ধারণ করুক।
* আমি যুক্তরাষ্ট্রকে অবাধ নির্বাচন, স্বাধীন আদালত, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সংগঠনের স্বাধীনতা, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, অর্থনৈতিক উন্মুক্ততা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সমর্থন করার আহ্বান জানাই।

শেখ হাসিনা বলেন, ওয়াশিংটন ডিসি এমন একটি দেশের রাজধানী যা গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, মানুষের মর্যাদা এবং আইনের শাসনের নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। আমেরিকার জনগণ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন সবার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার এই সুযোগের জন্য আমি আপনাদের ধন্যবাদ জানাই।

তিনি বলেন, আমি শুধু বাংলাদেশের একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই নয়, বরং আমার দেশের উন্নয়ন, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের একজন আজীবন সেবক হিসেবে আপনাদের সামনে কথা বলছি। “আমি ক্ষমতার অবস্থান থেকে নয়, বরং একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবে এবং আমার দেশের স্বাধীনতা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রতি নিবেদিত একজন নাগরিক হিসেবে আজীবন সেবার জায়গা থেকে কথা বলছি।”

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি গভীর ও ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্ব রয়েছে যা সাধারণ মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক স্বার্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত। “গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সন্ত্রাসবাদ দমন, জলবায়ু পদক্ষেপ, বাণিজ্য এবং মানব নিরাপত্তা—এসবই আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি। বাংলাদেশে যা ঘটে তা কেবল এর জনগণের জন্যই নয়, যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।”

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ আমি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলব:

প্রথমত, বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সে সম্পর্কে যা বুঝতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অর্থনীতি এবং আইনের শাসনের বর্তমান অবস্থা। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য আমি যে রূপকল্প ধারণ করি।

শেখ হাসিনা বলেন, আমি চাই না যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনও পক্ষ নিক। আমি শুধু এটাই চাই যে, বাংলাদেশ যেন সেই একই সর্বজনীন গণতান্ত্রিক নীতির ভিত্তিতে মূল্যায়িত হয় যা বিশ্বব্যাপী সমর্থিত—অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, সাংবিধানিক শাসন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ এবং আইনের অধীনে সমান সুরক্ষা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ প্রয়োজন যেখানে প্রতিটি নাগরিক তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, ধর্ম, লিঙ্গ, সামাজিক মর্যাদা বা অঞ্চল নির্বিশেষে দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে শান্তিপূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে এবং বাংলাদেশের শাসনকারী কে হবে তা নির্ধারণ না করে বরং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সাংবিধানিক শৃঙ্খলা, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং মানবাধিকারের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদেরও রয়েছে।

তিনি বলেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান, বঙ্গোপসাগর এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে এর ভূমিকা, আমেরিকান বাজারের সঙ্গে যুক্ত লাখ লাখ মানুষের জীবিকা এবং এর প্রাণবন্ত অর্থনীতি—এ সবকিছুই স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধিকে একটি অভিন্ন স্বার্থে পরিণত করেছে।

“আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে স্থায়ী জাতীয় স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত। আমি আরও শক্তিশালী বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সম্পর্ক, আমেরিকান বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ, উন্নত নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং মানুষে-মানুষে গভীর সংযোগের প্রত্যাশা করি।”

শেখ হাসিনা বলেন, একই সময়ে, বাংলাদেশকে অবশ্যই একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে থাকতে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চিন, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা বা ইউরোপসহ সকল অংশীদারের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম।

“বাংলাদেশ যেন কোনও পরাশক্তির দ্বন্দ্বের রণক্ষেত্রে পরিণত না হয়, বরং তা যেন বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হয়,” তিনি যোগ করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, “আমি আমার সরকারের চারপাশের কঠিন প্রশ্নগুলি, ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহ এবং এর পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত। আমি এসব প্রশ্নকে স্বাগত জানাই এবং সেগুলোর উত্তর দিতে প্রস্তুত।”

তিনি স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য এবং নিরপেক্ষ বিচারের দাবি করে বলেন, “আমার ব্যক্তিসত্তাসহ যে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগগুলি রাজনৈতিক ঘোষণার পরিবর্তে সুষ্ঠু আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত।”

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, বেআইনিভাবে আটক হওয়া ব্যক্তি এবং যারা ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রাখে, তাদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। “ন্যায়বিচার ছাড়া কোনও স্থায়ী শান্তি হতে পারে না, আর যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কোনও ন্যায়বিচার হতে পারে না।”

শেখ হাসিনা বলেন, “বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের জনগণ আমার ওপর যে আস্থা রেখেছে, তার জন্য আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। ইতিহাস আমার সরকারের বিচার করবে, তবে বাংলাদেশ যে উল্লেখযোগ্য রূপান্তর অর্জন করেছে—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ সুবিধা, ডিজিটাল সংযোগ, দারিদ্র্য বিমোচন এবং বৈশ্বিক অবস্থান—তাও ইতিহাস স্বীকার করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “বাংলাদেশিরা যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্যোক্তা, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ, কর্মী এবং কমিউনিটি লিডার হিসেবে সমৃদ্ধ করেছে। এই বাংলাদেশ-আমেরিকান কমিউনিটি আমাদের দুই জাতির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন।”

“সেন্টার ফর ইউএস-বাংলাদেশ রিলেশনস” – এর চেয়ারম্যান ড. নুরুন নবীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক বিকল্প নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখ্য সচিব ড. কায়কাউস আহমাদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন “সেন্টার ফর ইউএস-বাংলাদেশ রিলেশনস”-এর নির্বাহী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার রানা হাসান মাহমুদ।

মন্তব্য

Scroll to Top