বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপি সরকারের সাথে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শীঘ্রই কোন রিকনসিলিয়েশন বা পুনর্মিলন সম্ভব নাকি এটি শুধু কথার কথা এটি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে এখন তুমুল বিতর্ক ও আলোচনা চলছে।
আর এই প্রশ্নটি সামনে এসেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টার একটি বক্তব্যের পর।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান গত ৬ অক্টোবর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক পুনর্মিলন বা রিকনসিলিয়েশন অসম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ”দেশের অনেক মানুষ এখনো আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেন। তারা বাংলাদেশেরই নাগরিক। আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে পুনর্মিলনের উদ্যোগ নেওয়া খারাপ কোনো ধারণা নয়, বরং এমন উদ্যোগ হলে ভালো হতো। তবে রিকনসিলিয়েশনের আগে এর মৌলিক ভিত্তি কী হবে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।”
ডা. জাহেদ বলেন, “মাঝখান থেকে কেউ যদি রিকনসিলিয়েশন চান এবং মনে করেন এটি ভালো উদ্যোগ, তাহলে আমারও মনে হয় এটি ভালো। তাদের উচিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ করা। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলে রিকনসিলিয়েশন শুরুর মৌলিক জায়গাটি নিশ্চিত করতে হবে। সেটি হলে এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।”
তথ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, শুধু আলোচনার মাধ্যমে রিকনসিলিয়েশন শুরু করলেই হবে না। এর জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক শর্ত ও পারস্পরিক অবস্থান স্পষ্ট করা জরুরি। আওয়ামী লীগ সেই জায়গায় এগিয়ে এলে পুনর্মিলন নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব।
“পুনর্মিলনের উদ্যোগ সফল করতে আওয়ামী লীগকেই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে। দলটিকে নিজেদের দায় স্বীকার করতে হবে,” যোগ করেন তিনি।
তবে ডা. জাহেদের রিকন্সিলিয়েশন বা সমঝোতার প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত।
তিনি মন্তব্য করেছেন সমঝোতার ধারণাটি ষড়যন্ত্রকারীদের একটি কৌশল মাত্র; এটি জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার—উভয়েরই পরিপন্থী।
আরাফাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “তাদের কে বলেছে যে আওয়ামী লীগ সমঝোতা চায়? আওয়ামী লীগ কোনো ধরনের সমঝোতা চায় না। আমরা কেবল চাই জনগণের হাতে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেওয়া হোক, যাতে তারা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নিজেদের সরকার নিজেরাই বেছে নিতে পারে—দেশের শাসনভার এমন কিছু দুর্বৃত্তের হাতে ছেড়ে না দিয়ে যারা অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা দখল করেছিল এবং পরবর্তীতে একতরফা ও কারচুপিপূর্ণ নির্বাচন করেছিল।”
“আমরা একটি স্বাধীন বিচার ব্যবস্থাও চাই, যাতে রাজনৈতিক দল বা সংশ্লিষ্ট নির্বিশেষে সবার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়। বাংলাদেশের জনগণ যেন তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পায় এবং দেশটি শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে ফিরে আসে—আমাদের চাওয়া এটুকুই।”
“বর্তমান পরিস্থিতিতে গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার—উভয়ই অপহৃত হয়েছে এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা একদল দুর্বৃত্তের কবজায় চলে গেছে,” যোগ করেন আরাফাত।
অবশ্য ডা. জাহেদ যখন সমঝোতার কথা বলছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেছেন ঠিক তার উল্টো।
গত ৫ অক্টোবর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক পুনর্মিলনের সুযোগ নেই।
ডেপুটি স্পিকার বলেন দলটির নেতাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আলাদা বিষয় হলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে জনগণের ওপর সহিংসতা চালানোর সঙ্গে জড়িতদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ আয়োজিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর সমাপনী দিনের একটি অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
কায়সার কামাল বলেন, আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও অঙ্গসংগঠন ব্যবহার করে জনগণের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালিয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, এই বিচার শুধু শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়, ভবিষ্যতে যাতে কেউ বাংলাদেশে আবার কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সাহস না পায়, সেই দৃষ্টান্ত তৈরির জন্যও প্রয়োজন।
বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রসঙ্গ তুলে ডেপুটি স্পিকার বলেন, তাদের অনেকে এখনো কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করছেন না। তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে। রাজনৈতিক পুনর্মিলনের নামে তাদের দায়মুক্তি দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
তবে একই অধিবেশনে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ আফ্রিকা, কম্বোডিয়া, ভারত ও নেপাল থেকে আসা বেশিরভাগ শিক্ষক ও গবেষকরা ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও রিকনসিলিয়েশনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
তারা বলেন অপরাধের বিচার জরুরি। সেই সঙ্গে দরকার রিকনসিলিয়েশন বা পুনর্মিলন। তা না হলে সমাজ গভীরভাবে বিভক্ত থাকে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ, পার্বত্য অঞ্চলে সহিংসতা এবং “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের” সময় সংঘটিত অপরাধের বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তেমনি দরকার রিকনসিলিয়েশন।
নেপাল ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারনেশনাল কো-অপারেশন অ্যান্ড এনগেজমেন্টের গবেষণা পরিচালক প্রমোদ জয়সওয়াল মনে করেন, ন্যায়বিচার দরকার। তবে রিকনসিলিয়েশন না হলে সমাজ গভীরভাবে বিভক্ত থাকতে পারে।
জবাবদিহিকে অবশ্যই প্রতিশোধ থেকে আলাদা করতে হবে বলে মনে করেন প্রমোদ জয়সওয়াল। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ সমাজেই জবাবদিহিকে প্রতিশোধের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। রিকনসিলিয়েশন মানেই অতীত নিয়ে সম্পূর্ণ একমত হওয়া নয়। আবার এর মানে গুরুতর অন্যায় বা অপরাধগুলোকে ভুলে যাওয়া কিংবা ক্ষমা করে দেওয়াও নয়। বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে ব্যক্তি ও সম্প্রদায় মর্যাদার সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে। ঐতিহাসিক ক্ষোভগুলোকে স্বীকৃতি দিতে পারে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে একে অপরের ওপর আস্থা পুনর্গঠন করতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকার উইটস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাদালিৎসো জিলিলো ফিরি বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন (সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন) হয়েছিল, যা একটি নতুন সমাজ কল্পনার পূর্বশর্ত ছিল। তা নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। কারণ, উদারনৈতিক প্রতিষ্ঠান বা গণতান্ত্রিক বন্দোবস্ত সাম্যের সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে সক্ষম হয়নি।
কম্বোডিয়া গৃহযুদ্ধের শিকার এবং সেখানে রিকনসিলিয়েশনের প্রচেষ্টা ১৯৯১ সালের আগেই শুরু হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন দেশটির সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক নিকি সিঙ্গার। তিনি বলেন, কম্বোডিয়ায় জাতীয় রিকনসিলিয়েশনের আওতায় ১৯৯৮ সালে খেমার রুজ (বিদ্রোহী গোষ্ঠী) সৈন্যদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা এবং নিরস্ত্রীকরণ করা হয়।
বর্তমান বাস্তবতায় সরকার এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে রিকনসিলিয়েশন বা সমঝোতা অসম্ভব মনে হলেও রাজনৈতিক সচেতন অধিকাংশ মানুষ মনে করেন দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে দুই পক্ষের মধ্যে এই রিকনসিলিয়েশন বা সমঝোতা খুবই জরুরি এবং এটা যত দ্রুত হবে ততই সবার জন্য মঙ্গলজনক হবে।
তাদের অভিমত হচ্ছে এই জন্য সরকারকে সর্বাগ্রে খোলামন নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে এবং দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও বৃহত্তম রাজনৈতিক দল যেই দল সবচেয়ে বেশি সময় অর্থাৎ ছয় বার দেশ পরিচালনা করেছে সেই আওয়ামী লীগের ওপর রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনায় যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে এবং সকল দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে।
পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে যেন ন্যায় বিচার পান তা নিশ্চিত করতে হবে এবং আওয়ামী লীগ ও এর সমমনা দলগুলোর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার, হামলা, মামলা বন্ধ করে সবার জন্য একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে। এছাড়া মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তারকৃত সকল রাজবন্দীদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।

মন্তব্য