শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | Columbus |
| Columbus
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

বাংলাদেশে তিন মাসে মব সহিংসতায় ৫৪ জন নিহত, রাজনৈতিক সংঘাতে ১৭

- ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৫ অপরাহ্ন

বাংলাদেশে চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ১৩৭টি ঘটনায় অন্তত ৫৪ জন নিহত এবং ১৪৫ জন আহত হয়েছেন। বিচারবহির্ভূতভাবে সংঘবদ্ধ হামলায় এত মানুষের প্রাণহানি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ১৮৩টি ঘটনায় ১৭ জন নিহত এবং অন্তত ১ হাজার ২২৭ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ, রাজনৈতিক সংঘর্ষের তুলনায় মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে তিন গুণের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সোমবার (১২ অক্টোবর) সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, সংগঠনের নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ এবং অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

এতে মব সহিংসতা ও রাজনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, শ্রমিকের মৃত্যু, কারাগারে মৃত্যু এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

তিন মাসে মব সহিংসতায় ৫৪ জন নিহত

এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ১৩৭টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৫৪ জন নিহত এবং ১৪৫ জন আহত হয়েছেন।

অর্থাৎ, প্রতি মাসে গড়ে ১৮ জন এবং প্রায় প্রতি দুই দিনে একজন করে মানুষ মব সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন।

চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ম অবমাননা, ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিরোধ ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেও এ ধরনের সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটেছে।

অনেক ক্ষেত্রে কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই কিংবা আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার হওয়ার আগেই একদল মানুষ অভিযুক্ত ব্যক্তির ওপর হামলা চালিয়েছে।

এ ধরনের ঘটনা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

এর আগে এইচআরএসএসের পর্যবেক্ষণে জুন মাসে মব সহিংসতায় ৩১ জন নিহত এবং ৬৯ জন আহত হওয়ার তথ্য উঠে আসে। জুলাইয়ে ৪৯টি ঘটনায় ১৭ জন নিহত ও ৫১ জন আহত হন।

জুনের হিসাবের সঙ্গে সর্বশেষ তিন মাসের তথ্য যোগ করলে দেখা যায়, জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার মাসে মব সহিংসতায় অন্তত ৮৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, গণপিটুনি ও সংঘবদ্ধ হামলা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং ধারাবাহিকভাবে মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে।

রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৭ মৃত্যু, বিএনপির কোন্দলে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ১৮৩টি ঘটনায় ১৭ জন নিহত এবং ১ হাজার ২২৭ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষমতাসীন বিএনপির ৯ জন, জামায়াতে ইসলামীর ২ জন, আওয়ামী লীগের ৩ জন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ৩ জন রয়েছেন।

রাজনৈতিক সহিংসতার বড় একটি অংশ ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে।

দলটির অভ্যন্তরীণ বিরোধে ৬৯টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ৫৪০ জন আহত হয়েছেন।

অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে ৩১টি সংঘর্ষে একজন নিহত এবং ৩৩৮ জন আহত হয়েছেন।

বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ১৬টি সংঘর্ষে দুজন নিহত এবং ৮১ জন আহত হয়েছেন।

এ ছাড়া বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে ১৪টি সংঘর্ষে ৭০ জন আহত হয়েছেন। বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ৩১টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন আরও ৬৯ জন।

সব মিলিয়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ১৮৩টি ঘটনার মধ্যে ১৬১টিতেই বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ অথবা অন্য দলের সঙ্গে বিএনপির সংঘাতের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

এইচআরএসএসের পর্যবেক্ষণে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, দলীয় কোন্দল, জমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক বিরোধকে রাজনৈতিক সংঘর্ষের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

নির্বাচনসংক্রান্ত বিরোধে অন্তত ছয়টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৪৫ জন আহত হয়েছেন।

রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার আড়াই হাজারের বেশি

প্রতিবেদনে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।

জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১২৬টির বেশি মামলা হয়েছে।

এসব মামলায় ২ হাজার ৫৪১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৭ হাজার ৯১৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন অন্তত ২ হাজার ৫৭৭ জন।

এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২ হাজার ৪১২ জন, বিএনপির ১১২ জন, জামায়াতে ইসলামীর ৩৬ জন এবং এনসিপির ১৭ জন রয়েছেন।

এ ছাড়া কথিত উগ্রপন্থী হিসেবে ৩৭ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেছে।

একই সময়ে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত ও বিশেষ অভিযানে ৩৭ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তিন মাসে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার ১৩৫ সাংবাদিক

সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি ও হয়রানির ঘটনাও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে মানবাধিকার সংগঠনটি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন মাসে সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির ৮৮টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৩৫ জন সাংবাদিক আক্রান্ত হয়েছেন।

তাঁদের মধ্যে ৬৩ জন আহত, ২৭ জন লাঞ্ছিত এবং ১৮ জন হুমকির শিকার হয়েছেন।

এ ছাড়া নয়জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে।

সাইবার সুরক্ষা আইনের অধীনে করা চারটি মামলায় ১৮ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে।

এইচআরএসএস আরও জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়ার অন্তত ১৮টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ১২৮ জন আহত এবং আটজন আটক হয়েছেন।

আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারীও রয়েছেন।

এসব ঘটনা সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র

এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে নারী ও শিশু নির্যাতনের যে পরিসংখ্যান উঠে এসেছে, তা-ও উদ্বেগজনক।

তিন মাসে ৭৮৩ জন নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

তাঁদের মধ্যে ২৫৩ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ১৫৪ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে।

এ ছাড়া ৪২ জন নারী ও কন্যাশিশু সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

ধর্ষণের পর ১২ জনকে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর একজন আত্মহত্যা করেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই সময়ে ২২০ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১০৩ জন শিশু।

যৌতুকসংক্রান্ত নির্যাতনে ১৩ জন নারী নিহত এবং ১৭ জন আহত হয়েছেন। এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনায় আরও দুজন নারী আত্মহত্যা করেছেন।

পারিবারিক সহিংসতায় ১৩৭ জন নারী নিহত এবং ৬৮ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া পারিবারিক সহিংসতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় ৭২ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, তিন মাসে ৭৩৩ জন শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

তাদের মধ্যে ১৮৯ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ৫৪৪ জন শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

নারী ও শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতা, পারিবারিক নির্যাতন এবং হত্যার এসব ঘটনা তাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুতর ঘাটতির চিত্র তুলে ধরেছে।

কারাগারে ৩৭ জনের মৃত্যু, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে পাঁচজন

কারাগার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।

এইচআরএসএসের হিসাবে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত ৩৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে।

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৪ জন সাজাপ্রাপ্ত বন্দি এবং ২৩ জন বিচারাধীন মামলার আসামি ছিলেন।

এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।

নির্যাতনের শিকার হয়ে আরও একজন মারা গেছেন বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।

তবে কারাগারে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা বেআইনি কর্মকাণ্ডের কারণে ঘটেছে—এমন সিদ্ধান্ত প্রতিবেদনের তথ্য থেকে পাওয়া যায় না।

তারপরও এসব মৃত্যু কারাগারের পরিবেশ, বন্দিদের চিকিৎসাসেবা এবং হেফাজতে নির্যাতন প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও শ্রমিকের মৃত্যু

প্রতিবেদনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে।

তিন মাসে সংখ্যালঘুদের ওপর ছয়টি হামলার ঘটনায় ছয়জন আহত হয়েছেন।

এ সময়ে দুটি মন্দির, পাঁচটি ধর্মীয় প্রতিমা এবং চারটি বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুরের তথ্য নথিভুক্ত করেছে এইচআরএসএস।

অন্যদিকে শ্রমিক নির্যাতন ও সহিংসতার ২৫১টি ঘটনায় ৭১ জন নিহত এবং অন্তত ২৬০ জন আহত হয়েছেন।

পৃথকভাবে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ১৬৪ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাব এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রীর ঘাটতির সঙ্গে এসব দুর্ঘটনার সম্পর্ক রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মব সহিংসতা বন্ধ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার আহ্বান

এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেছেন, দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সব পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তিনি রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সৃষ্টি ও গণপিটুনি, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা এবং হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শুধু মব সহিংসতায় ৫৪ জনের মৃত্যু বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এসব ঘটনায় অনেক মানুষ কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

মন্তব্য

Scroll to Top