মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | Columbus |
| Columbus
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

অপরাধীকে ধরতে গিয়ে বিপাকে পুলিশ কর্মকর্তা: দুই দিনে দুবার বদলি

- ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৪ অপরাহ্ন

চট্টগ্রামে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া ও তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা এক পুলিশ কর্মকর্তাকে দুই দিনের ব্যবধানে দুবার বদলি করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন বিএনপির সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত এক নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে ওই পুলিশ কর্মকর্তা রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন।

চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুর রহিমকে এবার খুলনা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে বদলি করা হয়েছে। এর আগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের প্রকাশ্য সমালোচনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে খুলশী থানা থেকে সরিয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চে (সিটিএসবি) বদলি করা হয়েছিল।

ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক ওয়াকিল হোসেন ওরফে বিহারি বগা। নামে মাত্র বহিস্কৃত, ক্ষমতাসীন দলে তার এখনো প্রভাব। পুলিশের তালিকাভুক্ত অপরাধী হিসেবে পরিচিত ওয়াকিলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, হামলা, অস্ত্রসংক্রান্ত অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২৩টি মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ৮ অক্টোবর আবদুর রহিমকে খুলনা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে বদলির আদেশ জারি করা হয়। শনিবার (১০ অক্টোবর) আদেশটি সিএমপি সদর দপ্তরে পৌঁছালে বিষয়টি জানাজানি হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের প্রশাসন শাখার অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক এ কে এম আওলাদ হোসেনের সই করা আদেশে জনস্বার্থে এ বদলি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

এর এক দিন আগে, ৭ অক্টোবর, আবদুর রহিমকে খুলশী থানা থেকে সরিয়ে সিটিএসবিতে বদলি করা হয়েছিল। গত ২৭ আগস্ট তিনি খুলশী থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। অর্থাৎ, দায়িত্ব গ্রহণের ছয় সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে তাঁকে থানা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের চেষ্টায় হামলা ও হুমকির মুখে পুলিশ

ওয়াকিল হোসেন বগা চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। সরকারি জমি দখল নিয়ে বিরোধের জেরে প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পর গত ৮ জুন তাঁকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বহিষ্কারের সিদ্ধান্তটি ছিল অনেকটাই লোকদেখানো। কারণ, আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কৃত হলেও ক্ষমতাসীন দলে ওয়াকিলের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।

গত ২৯ আগস্ট পাহাড়তলী কলেজের এক শিক্ষককে অপহরণ ও মারধরের অভিযোগে ওয়াকিলের বিরুদ্ধে খুলশী থানায় মামলা হয়।

পুলিশের অভিযোগ, মামলাটি নথিভুক্ত করার পর ওয়াকিল ফোন করে ওসি আবদুর রহিমকে গালাগাল ও হুমকি দেন। এ ঘটনায় ওসি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

এরপর ৪ সেপ্টেম্বর নগরীর ওয়্যারলেস এলাকায় ওয়াকিলকে গ্রেপ্তার করতে অভিযান চালায় পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় ওয়াকিল ও তাঁর সহযোগীরা পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালান এবং পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর করেন। হামলায় ওসি আবদুর রহিমসহ সাত পুলিশ সদস্য আহত হন।

অন্যদিকে, ওই অভিযানে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মারধর ও সম্পত্তি ভাঙচুরের অভিযোগ এনে ওয়াকিলের বাবা মোহাম্মদ জাভেদ আদালতে মামলা করেন। অভিযোগটি তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন আদালত।

অভিযুক্তের পক্ষে মেয়র, ওসির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

গত ৬ অক্টোবর রাতে ওয়াকিলের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পেয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ভবন এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। তবে তাঁকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।

পরে আবদুর রহিম জানান, ওই অভিযানের সময় তিনি ছুটিতে ছিলেন। ফলে অভিযানের বিস্তারিত তাঁর জানা ছিল না।

পরদিন ৭ অক্টোবর নগরীর ঈদগাঁও এলাকায় এক অনুষ্ঠানে ওয়াকিলের পক্ষে অবস্থান নেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

মেয়র দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওয়াকিল রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। তিনি ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলেন এবং আগের সরকারের আমলে তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা দেওয়া হয়েছিল।

একই অনুষ্ঠানে ওসি আবদুর রহিমের নিয়োগ ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মেয়র।

তিনি বলেন, ‘তিনি (রহিম) আওয়ামী লীগ আমলে বাকলিয়ায় ওসি ছিলেন। তাহলে এখন তিনি কীভাবে খুলশীর ওসি হলেন? খুলশী থানার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি আওয়ামী লীগ বা যুবলীগের কাউকে গ্রেপ্তার করেননি।’

মেয়রের এসব বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবদুর রহিমকে খুলশী থানা থেকে সরিয়ে সিটিএসবিতে বদলি করা হয়।

দুই দফা বদলিতে রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী আবদুর রহিমের প্রথম বদলিকে নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের কঠোর অবস্থান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

তবে মেয়রের প্রকাশ্য সমালোচনার পরপরই একজন ওসিকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় পুলিশের ভেতরেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলির মুখে পড়তে হলে স্বাধীনভাবে আইন প্রয়োগ করা কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা।

অবশ্য নিজের বদলির পেছনে রাজনৈতিক চাপ রয়েছে কি না, সে বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করেননি আবদুর রহিম।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি সরকারি চাকরি করি। কর্তৃপক্ষ যেখানে দায়িত্ব দেবে, সেখানেই কাজ করব।’

এরপর চট্টগ্রাম থেকে খুলনায় তাঁর দ্বিতীয় দফা বদলির ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সরকারি আদেশে বদলির কারণ হিসেবে জনস্বার্থের কথা বলা হলেও একাধিক ফৌজদারি মামলার আসামি ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরপরই সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার দুই দফা বদলি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নকে সামনে এনেছে।

মন্তব্য

Scroll to Top