সরকারি একটি জরিপের তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগে বয়সসীমা অতিক্রম করায় মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি এক নারী। অথচ চূড়ান্ত নিয়োগের তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে। নাটোরের লালপুর উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড জরিপের কর্মী নিয়োগে এমন ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ওই নারীর নাম সোনিয়া খাতুন। তিনি ক্ষমতাসীন বিএনপির স্থানীয় এক নেতার স্ত্রী। নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী প্রার্থীদের সর্বোচ্চ বয়স ৪০ বছর হওয়ার কথা থাকলেও সোনিয়ার জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মসাল ১৯৮৪। ফলে তিনি নির্ধারিত বয়সসীমার চেয়ে বেশি বয়সী।
সোনিয়া নিজেই স্বীকার করেছেন, বয়স বেশি হওয়ায় তাঁকে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। এরপরও চূড়ান্ত ফলাফলে তাঁর নাম এসেছে।
মৌখিক পরীক্ষা না দিয়েও চূড়ান্ত তালিকায়
সোনিয়া খাতুন লালপুরের আড়বাব ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম জেনেটের স্ত্রী। ফ্যামিলি কার্ড জরিপে তথ্য সংগ্রহকারী পদে আবেদন করেছিলেন তিনি। তাঁর পরীক্ষার রোল নম্বর ৪৬৭।
সোনিয়া জানান, মৌখিক পরীক্ষার দিন তিনি পরীক্ষাকেন্দ্রে গিয়েছিলেন। কিন্তু বয়স যাচাইয়ের পর পরীক্ষকেরা তাঁকে অংশ নিতে দেননি।
তিনি বলেন, ‘মৌখিক পরীক্ষার দিন বয়স বেশি হওয়ায় আমাকে পরীক্ষা দিতে দেওয়া হয়নি। পরীক্ষক বলেছিলেন, বয়স ৪০ বছরের বেশি হওয়ায় আমার মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়। তাই পরীক্ষা না দিয়েই ফিরে আসি। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফলে আমার নাম এসেছে।’
মৌখিক পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া এবং বয়সের শর্ত পূরণ না করার পরও কীভাবে তাঁর নাম চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলো, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
তাঁর স্বামীর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নিয়োগে কোনো প্রভাব পড়েছে কি না, সে বিষয়েও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তদন্তের আশ্বাস প্রশাসনের
লালপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাসুদ রানা জানান, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবির হোসেন বলেন, বয়সসীমা অতিক্রম করা এবং মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারার পরও কীভাবে সোনিয়া খাতুনের নাম চূড়ান্ত তালিকায় এসেছে, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে এটি প্রশাসনিক ভুল, নাকি অন্য কোনো কারণে ঘটেছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
নিয়োগ নিয়ে আগেও হামলা-বিক্ষোভ
এর আগে গত আগস্টে নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়ায় ফ্যামিলি কার্ড জরিপের কর্মী নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
১২ আগস্ট নিয়োগের ফলাফলে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করেন বিএনপি এবং দলটির সহযোগী সংগঠন যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ ছিল, যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে সাবেক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থকদের নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সরকারি কার্যালয়ে ভাঙচুর, কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করে রাখা এবং সরকারি কর্মচারীদের মারধরের অভিযোগ ওঠে। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকেরাও হামলার শিকার হন।
এসব ঘটনার পর ১৩ আগস্ট লালপুর, বাগাতিপাড়া, বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুর উপজেলার নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ।
রাজশাহী বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক সৈয়দ মোস্তাক হাসান স্বাক্ষরিত আদেশে ফলাফল স্থগিতের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
পরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলা, ভাঙচুর এবং নিয়োগের ফলাফল বাতিলের জন্য চাপ প্রয়োগের অভিযোগে বিএনপির সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হয়।
এ ঘটনার পর নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন এবং লালপুরের তৎকালীন ইউএনও মো. বরকত উল্লাহসহ কয়েকজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে বদলি বা প্রত্যাহার করা হয়। তবে এসব বদলির সঙ্গে নিয়োগসংক্রান্ত বিক্ষোভের সরাসরি সম্পর্ক ছিল কি না, তা নিশ্চিত করেনি কর্তৃপক্ষ।
নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
আগস্টের বিক্ষোভের মূল অভিযোগ ছিল নিয়োগে রাজনৈতিক পক্ষপাত ও অনিয়ম। এবার বয়সসীমা অতিক্রম করা এবং মৌখিক পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া একজন প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত তালিকায় আসায় নিয়োগপ্রক্রিয়া নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় সহায়তা পাওয়ার উপযুক্ত পরিবার শনাক্ত করতে এই জরিপ পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এমন একটি কর্মসূচিতে তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতা ও পরীক্ষার নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
লালপুর উপজেলা প্রশাসন তদন্তের আশ্বাস দিলেও সোনিয়া খাতুনের নাম কীভাবে চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলো, সে প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

মন্তব্য