সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬ | Ashburn |
| Ashburn
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

নিখোঁজ সাবেক সেনাসদস্যের মরদেহ গাছের সাথে ঝুলানো

- ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৪ পূর্বাহ্ন

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে নিখোঁজের দুই দিন পর অবসরপ্রাপ্ত এক সেনাসদস্যের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার সকালে কংস নদের তীরে একটি কবরস্থানের পাশে গাছে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়। পরিবারের অভিযোগ, নিখোঁজ হওয়ার পর অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি ফোন করে ৩০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিলেন। স্বজনদের দাবি, তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

নিহত ব্যক্তির নাম ফজলুর রহিম কাজল (৫৫)। তিনি কাজল মিয়া নামেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর বাড়ি সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার সেলবরষ ইউনিয়নের কাটিয়াম গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের প্রয়াত জবান আলীর ছেলে।

কাজল মিয়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে প্রায় দুই বছর আগে অবসর নেন। এরপর সুনামগঞ্জের একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করছিলেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁকে ওই প্রকল্পের ব্যবস্থাপক ও হিসাবরক্ষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকালে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার বিরামপুর উত্তরপাড়া গ্রামের চৌধুরীবাড়ির পেছনে কংস নদের তীরবর্তী একটি কবরস্থানের কাছে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়।

তবে এটি হত্যাকাণ্ড, নাকি আত্মহত্যা, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।

নিখোঁজের পর ৩০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ

পরিবারের সদস্যরা জানান, গত বুধবার (৭ অক্টোবর) সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজে বাড়ি থেকে বের হন কাজল মিয়া। তাঁর ব্যাংক থেকে টাকা তোলার কথা ছিল।

তবে তিনি ব্যাংক থেকে টাকা তুলেছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হতে পারেননি স্বজনেরা।

নিহতের বড় ভাই ফজলুল করিম বুলবুল জানান, বুধবার বেলা আড়াইটার দিকে কাজলের সঙ্গে পরিবারের সর্বশেষ যোগাযোগ হয়। এরপর থেকে তাঁর মুঠোফোনে বারবার কল করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

স্বজনেরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর সন্ধান পাননি। পরে ওই রাতেই মোহনগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।

পরিবারের অভিযোগ, কাজল মিয়া নিখোঁজ হওয়ার পর অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি মুঠোফোনে যোগাযোগ করে ৩০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন।

স্বজনদের সন্দেহ, মুক্তিপণ দাবির সঙ্গে তাঁর নিখোঁজ হওয়া ও মৃত্যুর যোগসূত্র থাকতে পারে।

তবে মুক্তিপণ দাবির অভিযোগের সত্যতা কিংবা ফোন করা ব্যক্তির সঙ্গে মৃত্যুর ঘটনার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করেনি পুলিশ।

কবরস্থানের পাশে গাছে মরদেহ

শুক্রবার সকালে মোহনগঞ্জের বিরামপুর উত্তরপাড়া এলাকায় কংস নদের তীরে গবাদিপশু চরাতে গিয়ে এক ব্যক্তি দুর্গন্ধ পান।

দুর্গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে চৌধুরীবাড়ির পেছনে কবরস্থানের কাছে একটি গাছে মানুষের মরদেহ দেখতে পান তিনি।

খবরটি ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনাস্থলে জড়ো হন। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

মোহনগঞ্জ থানা থেকে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে স্বজনেরা সেটি নিখোঁজ কাজল মিয়ার বলে শনাক্ত করেন।

পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহের গলায় রশি পাওয়া গেছে।

তবে মরদেহটি ঠিক কী অবস্থায় ছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। কোথাও গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় মরদেহ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। আবার স্বজনদের দাবি, মরদেহটি পুরোপুরি ঝুলন্ত ছিল না; গাছের একটি উঁচু ডালের সঙ্গে ঠেস দেওয়া অবস্থায় ছিল।

এই বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের সন্দেহ, হত্যার পর আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে মরদেহটি গাছে রাখা হয়ে থাকতে পারে।

পুলিশ ঘটনাস্থলে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

‘আমার ভাই আত্মহত্যা করতে পারেন না’

নিহতের বড় ভাই ফজলুল করিম বুলবুল দাবি করেছেন, তাঁর ভাইকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।

তিনি জানান, গত ৭ অক্টোবর ব্যাংক থেকে টাকা তোলার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন কাজল। তবে তিনি টাকা তুলতে পেরেছিলেন কি না, তা জানা যায়নি।

বুলবুল বলেন, ‘আমার ভাই আত্মহত্যা করতে পারেন না। তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে আমাদের সন্দেহ।’

গাছে মরদেহ পাওয়ার অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

তাঁর দাবি, ‘মরদেহটি গাছের ডালের সঙ্গে ঠেস দেওয়া অবস্থায় ছিল, ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল না।’

নিহতের আরেক স্বজন রনি মিয়ার অভিযোগ, দুর্বৃত্তরা কাজল মিয়াকে শ্বাসরোধে হত্যার পর মরদেহ গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছে।

তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

তবে স্বজনদের এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় পুলিশ

মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুল ইসলাম হারুন মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেছে।

পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে কাজল মিয়ার শরীরে বড় ধরনের দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তাঁর পরনের পোশাকও উল্লেখযোগ্যভাবে এলোমেলো ছিল না বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তবে এসব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

ওসি জানান, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।

কাজল মিয়া নিখোঁজ হওয়ার আগে ব্যাংক থেকে টাকা তুলেছিলেন কি না, মুক্তিপণ দাবির অভিযোগের সত্যতা এবং তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সেসব বিষয়ও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার কিংবা সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করার তথ্য জানায়নি পুলিশ।

দুই ছেলেকে রেখে গেলেন কাজল

কাজল মিয়া স্ত্রী ও দুই ছেলে রেখে গেছেন। তাঁর বড় ছেলে পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত।

প্রায় দুই বছর আগে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করে সংসার চালাচ্ছিলেন তিনি।

বুধবার বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তাঁর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দুই দিন ধরে খোঁজাখুঁজির পর শুক্রবার গাছে তাঁর মরদেহ পাওয়ার খবর পান স্বজনেরা।

নিখোঁজ ব্যক্তিকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা শেষ হলেও তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে পরিবারের প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

স্বজনেরা জানতে চান, ব্যাংকে যাওয়ার পর কাজল মিয়ার সঙ্গে কী ঘটেছিল, কে বা কারা মুক্তিপণ দাবি করেছিল এবং কীভাবে তাঁর মরদেহ কবরস্থানের পাশের গাছে পাওয়া গেল।

পরিবারের দাবি, মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন করে দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।

পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য

Scroll to Top