বগুড়ায় চুরির অভিযোগে সালিশের নামে সংখ্যালঘু সাঁওতাল সম্প্রদায়ের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নিহত রিপন মুরমু (২৭) দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার বেলোয়া বামনপাড়া গ্রামের মোসেজ মুরমুর ছেলে। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) তাঁকে মারধর করে হত্যা করা হয়। পরদিন শনিবার (১০ অক্টোবর) বগুড়া সদর উপজেলার লাহিড়ীপাড়া ইউনিয়নের চানপাড়া গ্রামের একটি ইটভাটা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
রিপন কয়েক বছর ধরে আক্তার রহমান ডিউকের মালিকানাধীন একটি ইটভাটায় কাজ করতেন। পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ী রেজাউল করিমের একটি ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপে নৈশপ্রহরীর দায়িত্ব পালন করতেন।
চুরির অভিযোগে সালিশ বসিয়ে মারধর
পুলিশ ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাতে রেজাউল করিমের ওয়ার্কশপ থেকে একটি ওয়েল্ডিং মেশিন চুরি হয়।
পরদিন শুক্রবার সকালে চুরির ঘটনা নিয়ে সালিশ বসান রেজাউল ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক এক চেয়ারম্যানের ছেলে সেলিম।
সালিশে রিপনকে চুরির ঘটনায় জড়িত বলে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় তাঁকে বেধড়ক মারধর করা হয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, পরে কালু নামের স্থানীয় আরেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ ওঠে। তাঁকে খুঁজে বের করে চুরি যাওয়া মেশিন উদ্ধার এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় রিপনকে।
স্বজনদের অভিযোগ, সালিশে মারধরের পর রিপন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। শুক্রবার রাতেই তাঁর মৃত্যু হয়।
মরদেহ নিতে অস্বীকৃতি পরিবারের
রিপনের মৃত্যুর পর পুলিশকে খবর না দিয়ে শুক্রবার রাতে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁর মরদেহ দিনাজপুরে গ্রামের বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে মরদেহে আঘাতের চিহ্ন দেখে পরিবারের সদস্যরা তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।
অ্যাম্বুলেন্সচালক সিয়াম আহমেদ জানান, শুক্রবার রাতে সেলিম তাঁকে ফোন করে রিপনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দিতে বলেন।
পরিবার মরদেহ গ্রহণ না করায় শনিবার সকালে সেটি নিয়ে বগুড়ায় ফিরে আসেন তিনি।
ঘোড়াঘাটের পালশা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রবিউল ইসলাম জানান, মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য ছাড়াই রিপনের মরদেহ বাড়িতে পাঠানোর বিষয়টি তাঁর সন্দেহজনক মনে হয়।
পরে তিনি বগুড়া ও ঘোড়াঘাট থানার পুলিশকে বিষয়টি জানান এবং রিপনের বাবাকে সঙ্গে নিয়ে ইটভাটায় যান।
নিহতের বাবা জানান, ছেলের চোখ, হাত ও কোমরে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়েছেন তিনি।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ওয়েল্ডিং মেশিন চুরির অভিযোগে সালিশ বসিয়ে আমার ছেলেকে মারধর করা হয়েছে। পরে রাতেই তার মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে বাড়িতে পাঠানো হয়।’
ময়নাতদন্তের পর হত্যা মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
তদন্তে পুলিশ, ময়নাতদন্তের অপেক্ষা
বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহিম আলী জানান, প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, চুরির অভিযোগে শুক্রবার সকালে স্থানীয় কয়েকজন রিপনকে মারধর করেন।
শনিবার তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা মাহফুজ আলম জানান, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তদন্তের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি।

মন্তব্য