‘আমার বুক থেকে পাখিটা ওরা কেড়ে নিয়ে গেল। এ দেশে দুধের বাচ্চারাও তো নিরাপদ না! আমি আর কার কাছে বিচার চাইব? আল্লাহ সবকিছু দেখেছেন, তিনিই আমার মেয়ের খুনিদের বিচার করবেন।’
শুক্রবার মেয়ের দাফন শেষে কান্নায় ভেঙে পড়ে কথাগুলো বলছিলেন কেয়া আক্তার। তাঁর ১৪ বছর বয়সী মেয়ে জান্নাতুত তাজমীন সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। কক্সবাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে নিখোঁজ হওয়ার পর বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার একটি ধানখেত থেকে উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ। গলায় প্যাঁচানো ছিল গামছা।
মেয়েকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় থাকা মা-বাবার অপেক্ষা শেষ হয়েছে সন্তানের মরদেহ দাফনের মধ্য দিয়ে। অথচ মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও বাবাকে নিজের অবস্থান জানিয়ে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছিল তাজমীন। ঘুমিয়ে থাকায় সেই বার্তা সময়মতো দেখতে পাননি বাবা।
কুমিল্লার ফরিদা বিদ্যায়তনের শিক্ষার্থী তাজমীনের মরদেহ বৃহস্পতিবার সকালে জেলার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি নির্জন ধানখেত থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থলের কাছেই পাওয়া যায় একটি পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা।
এ ঘটনায় সুমন নামের এক অটোরিকশাচালককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
বাবার কাছে মেয়ের শেষ বার্তা
তাজমীনের মৃত্যুর ঘটনায় সবচেয়ে হৃদয়বিদারক তথ্যগুলোর একটি উঠে এসেছে তার বাবা আবদুল আলীমের বক্তব্যে।
কুমিল্লায় একটি ওষুধ কোম্পানিতে কর্মরত আবদুল আলীম জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১টা ৪৫ মিনিটের দিকে মেয়ে তাঁকে মুঠোফোনে বার্তা পাঠিয়েছিল। সঙ্গে পাঠিয়েছিল নিজের অবস্থান বা লাইভ লোকেশন।
তাজমীন চেয়েছিল, বাবা যেন সেখানে গিয়ে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন।
কিন্তু তখন ঘুমিয়ে ছিলেন আবদুল আলীম। মেয়ের পাঠানো বার্তাটি তিনি দেখতে পান পরদিন সকালে।
ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
আবদুল আলীম বলেন, ‘সকালে মেয়ের পাঠানো লাইভ লোকেশন দেখতে গিয়ে দেখি, সেখানে আমার মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে।’
মেয়েটি যখন বাবাকে বার্তা পাঠিয়েছিল, তখন সে বিপদের মধ্যে ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। বার্তা পাঠানোর পর তার সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল, সেটিও তদন্তাধীন।
মেয়েকে বাঁচাতে ছয় মাস স্কুলে যেতে দেননি মা
মেয়ে তাজমীনের এক বান্ধবীর সঙ্গে মেলামেশা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বিগ্ন ছিলেন মা কেয়া আক্তার।
শুক্রবার দাফন শেষে সাংবাদিকদের তিনি জানান, ওই বান্ধবী তাঁর মেয়েকে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার জন্য প্ররোচিত করত। বিষয়টি বুঝতে পেরে মেয়েকে ওই বান্ধবীর কাছ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
কেয়া আক্তার বলেন, ‘আমার মেয়ের বান্ধবীটা অত্যন্ত খারাপ ছিল। সে ফুঁসলিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যেত আমার মেয়েকে। বিষয়টি টের পেয়ে আমি অনেক বাধা দিয়েছি।’
মেয়েকে নিরাপদ রাখতে কতটা মরিয়া ছিলেন, তা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘মেয়েকে বাঁচাতে ছয় মাস স্কুলে পর্যন্ত যেতে দিইনি, ঘরে আটকে রেখেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই বান্ধবীই তাকে ভুলিয়ে কক্সবাজারে নিয়ে গেল।’
গত ৪ অক্টোবর বাড়ি থেকে বের হওয়ার পরও মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন কেয়া।
তিনি বলেন, ‘তাকে ফোনে বলেছিলাম—তুই কোথায় আছিস বল, আমি নিজে গিয়ে তোকে নিয়ে আসব।’
কিন্তু মায়ের কাছে আর ফেরা হয়নি তাজমীনের।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে কেয়া বলেন, ‘মেয়ে আমার কুমিল্লা পর্যন্ত ফিরে এলো, কিন্তু আর ঘরে ফিরতে পারল না। হায়েনার দল পথ থেকেই তাকে তুলে নিয়ে গেল। তারপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে আমার কলিজার ধনটাকে মেরে ফেলল। এখন আমি কী নিয়ে বাঁচব?’
তবে তাজমীনের বান্ধবীর বিরুদ্ধে মায়ের অভিযোগের সত্যতা কিংবা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওই বান্ধবীর কোনো সংশ্লিষ্টতা এখনো নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
কক্সবাজার থেকে ফিরে কুমিল্লায় নিখোঁজ
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার (৪ অক্টোবর) কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার ভাড়া বাসা থেকে এক বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে বের হয়েছিল তাজমীন।
পরে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, সে কক্সবাজারে চলে গেছে।
তদন্তে তার ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে কক্সবাজারে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) কক্সবাজার থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে ছেড়ে আসা আইকনিক এক্সপ্রেস পরিবহনের একটি বাসে ওঠে তাজমীন।
সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ অনুযায়ী, রাত পৌনে ১২টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় হোটেল নুরজাহানের কাছে বাস থেকে নামে সে।
এ সময় তার সঙ্গে একটি হাতব্যাগ ও মুঠোফোন ছিল।
ফুটেজে তাকে হোটেলের আশপাশের কয়েকটি দোকানে যাতায়াত করতে দেখা যায়। একটি কাপড়ের দোকানে প্রায় ১৫ মিনিট নিজের আইফোন চার্জ দেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
রাত সোয়া ১২টার দিকে হোটেল এলাকা থেকে বেরিয়ে সড়কের পশ্চিম পাশের সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ডের দিকে যেতে দেখা যায় তাজমীনকে।
এরপর আর সিসিটিভি ফুটেজে তার অবস্থান পাওয়া যায়নি।
প্রায় দেড় ঘণ্টা পর বাবাকে নিজের অবস্থান জানিয়ে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করে সে।
অটোরিকশা স্ট্যান্ড থেকে তাজমীন কোথায় গিয়েছিল, কার সঙ্গে দেখা হয়েছিল এবং কীভাবে জগতপুরের নির্জন ধানখেতে পৌঁছেছিল, তা জানার চেষ্টা করছে পুলিশ।
ধানখেতে লড়াইয়ের চিহ্ন, গলায় প্যাঁচানো গামছা
বৃহস্পতিবার সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের কাচিকাটা-হরিশ্চর বাজার সড়কের পাশে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখতে পান স্থানীয় বাসিন্দারা।
ধানখেতের কাছে অস্বাভাবিকভাবে অটোরিকশাটি পড়ে থাকতে দেখে তাঁদের সন্দেহ হয়।
কাছে গিয়ে তাঁরা দেখতে পান, আশপাশের কয়েকটি জমিতে ধানগাছ মাড়িয়ে নষ্ট করা হয়েছে। কোথাও কোথাও ধানগাছ ভেঙে মাটিতে পড়ে আছে।
এসব চিহ্ন অনুসরণ করে সড়ক থেকে আনুমানিক ৫০ গজ দূরে একটি ধানখেতে এক কিশোরীর মরদেহ দেখতে পান স্থানীয় লোকজন।
মরদেহটির মাথা কাদার মধ্যে ছিল। গলায় প্যাঁচানো ছিল একটি গামছা। স্থানীয় বাসিন্দাদের বর্ণনা অনুযায়ী, মরদেহটি পোশাকবিহীন অবস্থায় পাওয়া যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন জানান, পরিত্যক্ত অটোরিকশার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি প্রথমে কিছুটা দূরে একটি হাতব্যাগ পড়ে থাকতে দেখেন।
পরে ধানখেতের ভেতরে মাড়ানো গাছের চিহ্ন অনুসরণ করে কিশোরীর মরদেহ দেখতে পান।
স্থানীয় এক ব্যক্তি কাপড় দিয়ে মরদেহটি ঢেকে দেন। এরপর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে নিহত কিশোরীর পরিচয় শনাক্ত হয়। সে নিখোঁজ স্কুলছাত্রী জান্নাতুত তাজমীন।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, ঘটনাস্থলের চার-পাঁচটি ধানখেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হামলাকারীদের হাত থেকে বাঁচতে মেয়েটি পালানোর চেষ্টা করে থাকতে পারে। তবে ঠিক কী ঘটেছিল, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
গলায় গামছা প্যাঁচানো থাকায় শ্বাসরোধে হত্যার সন্দেহ তৈরি হয়েছে। মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে মরদেহ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।
হত্যার আগে তাজমীন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো ফরেনসিক ফলাফল প্রকাশ করেনি পুলিশ।
চট্টগ্রাম থেকে অটোরিকশাচালক গ্রেপ্তার
তাজমীনের মরদেহের কাছে পাওয়া পরিত্যক্ত অটোরিকশার সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
গাড়িটির মালিক আবুল হাশেমকে শনাক্ত করে বৃহস্পতিবার রাতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি পুলিশকে জানান, সুমন নামের এক ব্যক্তি অটোরিকশাটি চালাতেন।
পরে সুমনের অবস্থান শনাক্ত করে শুক্রবার চট্টগ্রামে তাঁর ভাইয়ের বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সুমনের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায়। তিনি কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জয়ানগর এলাকায় বসবাস করতেন।
তদন্তকারীরা জানান, সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার বিকেলে তাজমীনের আইফোন উদ্ধার করা হয়।
মুঠোফোনটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচনা করছে পুলিশ।
তাজমীনের কল রেকর্ড, মুঠোফোনের তথ্য ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তার সর্বশেষ গতিবিধি জানার চেষ্টা চলছে।
এ ঘটনায় সুমনের দুই স্বজনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে তদন্তকারীরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন।
প্রযুক্তিগত তথ্য ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনায় একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। অন্য সন্দেহভাজনদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
তবে হত্যাকাণ্ডে সুমনের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কিংবা অন্য কারও সম্পৃক্ততা সম্পর্কে এখনো চূড়ান্ত তথ্য প্রকাশ করেনি পুলিশ।
বৃহস্পতিবার রাতে তাজমীনের বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
দাদার কবরের পাশে শেষ ঠিকানা
ময়নাতদন্ত শেষে তাজমীনের মরদেহ নেওয়া হয় যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ায়, পরিবারের গ্রামের বাড়িতে।
শুক্রবার সকালে জানাজা শেষে দাদার কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
যে মেয়েকে জীবিত বাড়ি ফিরিয়ে আনতে মা-বাবা মরিয়া হয়ে চেষ্টা করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই মেয়েকেই কবরে রেখে ফিরতে হয়েছে তাঁদের।
বাবার কাছে তাজমীনের শেষ অনুরোধ ছিল, তিনি যেন এসে তাকে বাড়িতে নিয়ে যান। মা-ও বারবার বলেছিলেন, মেয়ে কোথায় আছে জানালেই তিনি নিজে গিয়ে নিয়ে আসবেন।
কিন্তু কারও পক্ষেই মেয়েকে আর জীবিত ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
দাফন শেষে কান্নায় ভেঙে পড়েন কেয়া আক্তার। বারবার মনে করছিলেন মেয়ের সঙ্গে শেষ কথোপকথন।
‘মেয়ে আমার কুমিল্লা পর্যন্ত ফিরে এলো, কিন্তু আর ঘরে ফিরতে পারল না।’
মেয়ের মৃত্যুর বিচার কার কাছে চাইবেন, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
‘এ দেশে দুধের বাচ্চারাও তো নিরাপদ না! আমি আর কার কাছে বিচার চাইব?’
পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করলেও তাতে সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছেন না শোকাহত মা।
তাঁর একটাই চাওয়া—মেয়ের মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ্যে আসুক, অপরাধীরা শাস্তি পাক।
‘আল্লাহ সবকিছু দেখেছেন, তিনিই আমার মেয়ের খুনিদের বিচার করবেন।’
তদন্তে এখনো উত্তর মেলেনি, পদুয়ার বাজারের সিসিটিভি ক্যামেরা থেকে হারিয়ে যাওয়ার পর তাজমীনের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল। বাবাকে শেষবার নিজের অবস্থান জানানোর পর কীভাবে সে পৌঁছেছিল নির্জন ধানখেতে?
আর মেয়েকে কবরে রেখে আসা মায়ের কাছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রশ্নটি রয়ে গেছে—নিজের শহরে ফিরেও কেন ঘরে ফিরতে পারল না তাঁর সন্তান?

মন্তব্য