সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬ | Moses Lake |
| Moses Lake
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

ইউনূসের গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা দ্রুত পরিশোধের নির্দেশ

- ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৮ অপরাহ্ন

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণের কাছে বকেয়া ৬৬৬ কোটি টাকার বেশি কর যত দ্রুত সম্ভব আইন অনুযায়ী আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

পাঁচ করবর্ষের কর নির্ধারণের বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণের করা দুটি আবেদন খারিজ করে দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সোমবার (১২ অক্টোবর) প্রকাশিত হয়েছে। এসব রায়ে কর আদায়ের নির্দেশনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কর পরিশোধ এড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টার কঠোর সমালোচনা করেছেন আদালত।

আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গ্রামীণ টেলিকম থেকে পাওয়া আয়কে লভ্যাংশ হিসেবে দেখিয়ে এবং কর নির্ধারণের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন মামলা চালিয়ে গ্রামীণ কল্যাণ কর পরিশোধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।

এই রায় ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত একটি সংস্থার বিরুদ্ধে আদালতের এমন পর্যবেক্ষণ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস একসময় গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান ছিলেন।

গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে বিনিয়োগসংক্রান্ত চুক্তির আওতায় অর্জিত আয়ের ওপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর দাবির বৈধতা বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট।

‘কর ফাঁকির ধ্রুপদি উদাহরণ’

বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ১০ সেপ্টেম্বর রায় দেন। এতে পাঁচ করবর্ষের কর নির্ধারণের বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণের করা দুটি আবেদন খারিজ করা হয়।

৩২ ও ১৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় সোমবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বিষয়টিকে ‘নিষ্পত্তিকৃত একটি বিষয় ঝুলিয়ে রেখে কর ফাঁকি দেওয়ার একটি ধ্রুপদি উদাহরণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

আদালতের এই পর্যবেক্ষণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘদিন মামলা চালিয়ে বিপুল অঙ্কের কর পরিশোধ স্থগিত রাখার পক্ষে গ্রামীণ কল্যাণ যে যুক্তি দেখিয়ে আসছিল, তা আদালতের পর্যবেক্ষণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

বকেয়া কর আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় দাবিনামা জারি এবং আইন অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব আদায় কার্যক্রম শুরু করতে এনবিআরকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

একই সঙ্গে কর আদায়ের ক্ষেত্রে আগে দেওয়া স্থগিতাদেশগুলোও প্রত্যাহার করা হয়েছে।

২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষ পর্যন্ত গ্রামীণ কল্যাণের বকেয়া করের পরিমাণ ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৬৬৭ কোটি টাকা।

গ্রামীণ টেলিকম থেকে পাওয়া আয় নিয়ে বিরোধ

এই কর বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের মধ্যে একটি আর্থিক চুক্তি। গ্রামীণ টেলিকমও ইউনূসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান।

দুই প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ চুক্তি অনুযায়ী, গ্রামীণফোনে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্জিত মুনাফার একটি অংশ পেত গ্রামীণ কল্যাণ।

ওই অর্থ লভ্যাংশ হিসেবে গণ্য হবে, নাকি অন্যান্য উৎস থেকে অর্জিত করযোগ্য আয় হিসেবে বিবেচিত হবে—মূল বিরোধ তৈরি হয় তা নিয়ে।

গ্রামীণ কল্যাণের যুক্তি ছিল, গ্রামীণ টেলিকম থেকে পাওয়া অর্থ লভ্যাংশ এবং এর ওপর ইতিমধ্যে উৎসে কর কেটে রাখা হয়েছে। ফলে একই আয়ের ওপর আবার কর দাবি করা যুক্তিসংগত নয়।

তবে কর কর্তৃপক্ষ এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি। তাদের অবস্থান ছিল, ওই অর্থ অন্যান্য উৎস থেকে অর্জিত আয় হিসেবে গণ্য হবে এবং এর ওপর পৃথকভাবে কর দিতে হবে।

বিচারক গ্রামীণ কল্যাণের আবেদন গ্রহণের কোনো আইনগত ভিত্তি না পাওয়ায় কর কর্তৃপক্ষের অবস্থান বহাল রেখেছেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণ থেকে স্পষ্ট, বিরোধটি কেবল কর আইনের ভিন্ন ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আয়কে কৌশলগতাবে উপস্থাপন করে এবং দীর্ঘদিন আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে কর পরিশোধ এড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টারও সমালোচনা করেছেন আদালত।

সরকারি রাজস্ব নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই

কর বিরোধের সূত্রপাত ২০১৭ সালে। সে সময় পাঁচ করবর্ষের কর পুনর্নির্ধারণের পর গ্রামীণ কল্যাণের কাছে বকেয়া অর্থ দাবি করে এনবিআর।

এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটি। আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশের ফলে তাৎক্ষণিকভাবে কর আদায়ের কার্যক্রম আটকে যায়।

এরপর বছরের পর বছর ধরে আইনি লড়াই চলতে থাকে।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ গ্রামীণ কল্যাণের আবেদন খারিজ করে দেন। তবে পরবর্তী সময়ে সেই রায় প্রত্যাহার করা হয় এবং মামলাগুলো অন্য বেঞ্চে পাঠানো হয়। এর মধ্যেই বিভিন্ন ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর নেতৃত্বে সংঘটিত সহিংস আন্দোলনের পর ইউনূস ক্ষমতা গ্রহণ করেন, যে ক্ষমতা গ্রহণকে সমালোচকেরা অসাংবিধানিক বলে বর্ণনা করেছেন। পরে ক্লিনটন সেন্টারের একটি অনুষ্ঠানে ইউনূস ওই আন্দোলনকে ‘নিখুঁত পরিকল্পনা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণের সময়ও ইউনূসের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় দণ্ডাদেশ ছিল, যা সাংবিধানিক ও আইনি বিধান অনুসরণের প্রশ্ন তুলেছিল।

এদিকে নতুন করে দায়িত্ব পাওয়া হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর গ্রামীণ কল্যাণের আবেদনগুলো আবারও খারিজ করে দেন।

এরপর রায় স্থগিত চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে ১৪ সেপ্টেম্বর চেম্বার বিচারপতি পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগে হস্তক্ষেপ করতে রাজি হননি।

এখন পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ায় বকেয়া কর আদায়ের পথে বিদ্যমান আইনি বাধা দূর হয়েছে। তবে গ্রামীণ কল্যাণের সামনে উচ্চ আদালতে আরও আইনি প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ইউনূসের আর্থিক জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন

হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত এবং একসময় তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত গ্রামীণ কল্যাণের আর্থিক কার্যক্রম নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করা ইউনূস দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ব্যবসার ধারণা প্রচার করে আসছেন। এই ধারণার মূল ভিত্তি হলো ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে সামাজিক কল্যাণের উদ্দেশ্যকে যুক্ত করা।

তবে হাইকোর্টের রায়ে সেই ধারণার আওতায় প্রতিষ্ঠিত একটি সংস্থার বিপুল অঙ্কের করসংক্রান্ত বিরোধ সামনে এসেছে।

বিশেষ করে গ্রামীণ কল্যাণের কার্যক্রমকে আদালত যেভাবে কর ফাঁকির প্রচেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, তা প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহির দাবিকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

একটি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান কেন সরকারি রাজস্বের শত শত কোটি টাকা পরিশোধের বিষয়টি প্রায় এক দশক ধরে অমীমাংসিত রেখেছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

মন্তব্য

Scroll to Top