শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | Columbus |
| Columbus
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

বাংলাদেশের সীমান্ত ডিজিটাল করতে নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?

- ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৮ অপরাহ্ন

বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এখন এমন এক পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে, যার প্রভাব শুধু ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার আধুনিকায়নে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর ওপরও পড়তে পারে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সীমান্ত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সিকিউরিপোর্টের সঙ্গে দেশের সব আন্তর্জাতিক প্রবেশ ও বহির্গমনকেন্দ্রকে একটি সমন্বিত অভিবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আনার বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে। ভার্জিনিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটিকে আগামী ২২ অক্টোবরের মধ্যে বিস্তারিত কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়েছে। এর আগে সিকিউরিপোর্ট এমন একটি সমন্বিত কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে থাকবে জীবপরিচয়ভিত্তিক পরিচয় যাচাই, যাত্রীদের আগাম তথ্য সংগ্রহ, ভ্রমণ-সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ, স্বয়ংক্রিয় সীমান্ত যাচাই এবং আন্তর্জাতিক ও দেশীয় নিরাপত্তা তালিকার সঙ্গে তাৎক্ষণিক মিলিয়ে দেখার ব্যবস্থা। বাইরে থেকে দেখলে এটি ইমিগ্রেশনকে দ্রুত, আধুনিক ও নিরাপদ করার একটি প্রযুক্তিগত উদ্যোগ বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু এর প্রকৃত গুরুত্ব আরও গভীরে। দেশব্যাপী বাস্তবায়িত হলে এই ব্যবস্থা এমন একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল অবকাঠামোয় পরিণত হতে পারে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশ ও বহির্গমনকারী মানুষের পরিচয় যাচাই, ভ্রমণ-তথ্য বিশ্লেষণ এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি শনাক্ত করবে। ফলে মূল প্রশ্নটি আর শুধু এই নয় যে বাংলাদেশের আধুনিক সীমান্ত প্রযুক্তি প্রয়োজন কি না; বরং প্রশ্ন হলো—এই প্রযুক্তি গ্রহণের পরও দেশের তথ্য, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ কতটা ধরে রাখতে পারবে।

ইমিগ্রেশন আধুনিকায়ন থেকে সীমান্ত গোয়েন্দা ব্যবস্থায়

বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আধুনিক করার প্রয়োজন নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক থাকার কথা নয়। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও সমুদ্রবন্দর মিলিয়ে দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাকে একই সঙ্গে বৈধ আন্তর্জাতিক যাতায়াত, অবৈধ অনুপ্রবেশ, মানবপাচার, মাদক ও অন্যান্য চোরাচালান, পরিচয় জালিয়াতি এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলা করতে হয়। প্রচলিত ব্যবস্থায় সীমান্তে পৌঁছানোর পর একজন কর্মকর্তাকে পাসপোর্ট ও অন্যান্য নথি পরীক্ষা করে ভ্রমণকারীর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। নতুন ডিজিটাল কাঠামো সেই প্রক্রিয়ার একটি বড় অংশ সীমান্তে পৌঁছানোর আগেই সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি করবে। যাত্রীর আগাম তথ্য ও ভ্রমণসংক্রান্ত বিবরণ পাওয়া গেলে কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবে; জীবপরিচয় যাচাই পরিচয় জালিয়াতির সুযোগ কমাবে এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা তালিকার সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় মিলের মাধ্যমে সন্দেহজনক ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। ফলে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো উচ্চঝুঁকির ব্যক্তিদের ওপর বেশি মনোযোগ দিতে পারবে, আর সাধারণ ও স্বল্পঝুঁকির যাত্রীরা তুলনামূলক দ্রুত ইমিগ্রেশন পার হতে পারবেন। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এই ব্যবস্থা একই সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবার মান বাড়াতে পারে এবং দীর্ঘদিনের খণ্ডিত ও ম্যানুয়াল পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে।

কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তনটি ঘটবে তখনই, যখন এই ইমিগ্রেশন প্রযুক্তি রাষ্ট্রের বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হবে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় পরিচয়-তথ্য, ভ্রমণ ইতিহাস, জীবপরিচয়ভিত্তিক তথ্য, নিরাপত্তা তালিকা এবং স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি-নির্ণয়ের তথ্য একই ব্যবস্থায় আসতে পারে। বাংলাদেশের প্রধান নিরাপত্তা ও সীমান্ত সংস্থাগুলো—প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এবং বিশেষ শাখা—ইতোমধ্যে নিজ নিজ দায়িত্ব ও তথ্যভিত্তিক কাঠামোর মাধ্যমে কাজ করছে। নতুন ব্যবস্থা তাদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে পারে, আবার বিদ্যমান তথ্যভান্ডারের সঙ্গে দ্বৈততা বা কর্তৃত্বের প্রশ্নও তৈরি করতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোনো বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান যদি ধীরে ধীরে সীমান্ত-নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্যের আদান-প্রদান ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে, তাহলে সেটি আর সাধারণ কোনো প্রযুক্তি সরবরাহকারী থাকবে না; জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর একটি অংশে পরিণত হবে। তাই শুরু থেকেই স্পষ্ট করতে হবে—সিকিউরিপোর্ট কি কেবল প্রযুক্তি সরবরাহ করবে, নাকি ভবিষ্যতে সীমান্ত নিরাপত্তার তথ্যপ্রবাহের একটি অপরিহার্য মধ্যবর্তী স্তর হয়ে উঠবে।

অন্যান্য দেশে সিকিউরিপোর্টের কাজ, বিশেষ করে ফিলিপাইনে প্রস্তাবিত বেসামরিক বিমান চলাচল ও অভিবাসন নিরাপত্তা প্রকল্প, বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক অভিজ্ঞতা হতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো—বিচ্ছিন্ন সীমান্ত কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত প্রযুক্তিগত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। তবে একই অভিজ্ঞতা দেখায়, এমন প্রকল্পে ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি, পারস্পরিক সংযোগ, প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব, ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার মতো বিষয় শুরুতেই খতিয়ে দেখা জরুরি। একটি প্রযুক্তি যত আধুনিকই হোক, যদি সেটি বিদ্যমান সক্ষমতার সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় দ্বৈততা তৈরি করে বা একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা সৃষ্টি করে, তাহলে সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাতীয় স্বার্থের জন্য সর্বোত্তম সমাধান বলা যায় না। বাংলাদেশের তাই শুধু প্রযুক্তিটি কী করতে পারে, সেটিই দেখা যথেষ্ট নয়; বরং এটি দেশের বর্তমান ইমিগ্রেশন, গোয়েন্দা ও সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

ডেটার ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

প্রস্তাবিত ব্যবস্থার সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক সম্ভবত তথ্যের নিয়ন্ত্রণ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংগৃহীত সব তথ্যের পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মালিকানা, দেশে তথ্য সংরক্ষণ, সফটওয়্যারের ধারাবাহিকতা, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, ঝুঁকি ভাগাভাগি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বলে জানা গেছে। এসব শর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি দেশব্যাপী সীমান্ত ব্যবস্থায় পাসপোর্ট ও ভ্রমণ-তথ্যের পাশাপাশি মুখমণ্ডল, আঙুলের ছাপ ও চোখের মণির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল জীবপরিচয়ভিত্তিক তথ্যও থাকতে পারে। এই তথ্য কোনো সাধারণ সরকারি তথ্যভান্ডারের মতো নয়। একটি গোপন সংকেত ফাঁস হলে সেটি বদলানো যায়; কিন্তু একজন মানুষের আঙুলের ছাপ বা চোখের মণির পরিচয় বদলানো যায় না। ফলে এ ধরনের তথ্যের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের প্রভাব তাৎক্ষণিক ক্ষতির অনেক বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তবে তথ্য বাংলাদেশে সংরক্ষণ করলেই প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হয় না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—ব্যবস্থায় কার কার প্রযুক্তিগত প্রবেশাধিকার থাকবে, গোপন সংকেতের চাবি কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, বিদেশি প্রযুক্তিবিদরা রক্ষণাবেক্ষণের সময় দূরবর্তীভাবে ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে পারবেন কি না, উপ-ঠিকাদারদের অধিকার কতটুকু থাকবে, সফটওয়্যার পরিবর্তন বা হালনাগাদ কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে এবং বাংলাদেশ সরকার নিজস্বভাবে ব্যবস্থাটির নিরাপত্তা নিরীক্ষা করতে পারবে কি না। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহায়তা বা নিজস্ব মালিকানাধীন উপাদানের মাধ্যমে কোনো সংবেদনশীল তথ্য পরোক্ষভাবে দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ আছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। মূল নীতি হওয়া উচিত—বাংলাদেশ শুধু তার তথ্যের আইনগত মালিক হবে না; যে প্রযুক্তিগত পরিবেশে সেই তথ্য সংরক্ষিত ও ব্যবহৃত হবে, তার ওপরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে।

এখানে দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিনির্ভরতার ঝুঁকিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা বছরের পর বছর ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে বিপুল পরিমাণ ভ্রমণ-তথ্য, জীবপরিচয়ভিত্তিক রেকর্ড, সফটওয়্যার বিন্যাস, পরিচালন পদ্ধতি এবং অন্যান্য সরকারি ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করবে। ফলে কয়েক বছর পর সেই প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশ তখন আইনগতভাবে তার তথ্যের মালিক থাকলেও বাস্তবে সেই তথ্য ব্যবহারের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার জন্য একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। এই কারণে চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার সুস্পষ্ট ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ যেন তথ্য অন্য ব্যবস্থায় স্থানান্তর করতে পারে, প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতে পারে এবং কোনো কার্যকরী সক্ষমতা হারানো ছাড়াই সীমান্ত ব্যবস্থাপনা চালিয়ে যেতে পারে—চুক্তিতে তার বাস্তব নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

একইভাবে প্রযুক্তি হস্তান্তরের অর্থ শুধু কর্মকর্তাদের জীবপরিচয় যাচাইযন্ত্র বা স্বয়ংক্রিয় ফটক পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হওয়া উচিত নয়। প্রকৃত প্রযুক্তি হস্তান্তর বলতে বোঝাবে—বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো যেন ব্যবস্থা পরিচালনা, নিরাপত্তা নিরীক্ষা, প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান, সাইবার নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন হলে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি পরিবর্তন বা প্রতিস্থাপনের সক্ষমতা অর্জন করে। তা না হলে রাষ্ট্র অবকাঠামোর আনুষ্ঠানিক মালিক হলেও সেটি পরিচালনার মৌলিক প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতেই থেকে যাবে। এ কারণেই কারিগরি মূল্যায়ন, ফি নির্ধারণ এবং সেবার মান, সাইবার নিরাপত্তা, অনুমোদন ও চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার শর্ত নিয়ে গঠিত সরকারের তিনটি কমিটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে কমিটি গঠন করাই যথেষ্ট নয়; তাদের মূল্যায়ন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকে বাস্তবে কতটা প্রভাবিত করতে পারে, সেটিই হবে মূল বিষয়।

স্বচ্ছতা, ভূরাজনীতি ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ

প্রতিবেদনে সিকিউরিপোর্টের সঙ্গে স্ট্যালিয়ন ক্যাপিটালের সম্পৃক্ততার যে বিষয়টি এসেছে, সেটিও এই প্রকল্পের স্বচ্ছতার প্রশ্নকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। স্ট্যালিয়ন ক্যাপিটালকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের ছেলে সৈয়দ ইব্রাহিম আহমেদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সম্পর্ক নিজে কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়; কিন্তু জাতীয় সীমান্ত অবকাঠামো এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল নিরাপত্তা-তথ্যসম্পন্ন একটি প্রকল্পে এমন বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততা থাকলে স্বার্থের সংঘাত ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিশেষ করে সরাসরি ক্রয়প্রক্রিয়ার কথা যখন সামনে এসেছে, তখন সিকিউরিপোর্ট কেন নির্বাচিত হচ্ছে, বিকল্প প্রযুক্তি কতটা যাচাই করা হয়েছে, মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে এবং স্থানীয় অংশীদারদের বাণিজ্যিক ভূমিকা কী—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী প্রকল্পও যদি স্বচ্ছতার ঘাটতিতে জনআস্থা হারায়, তাহলে তার কৌশলগত গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

প্রকল্পটির ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা, মিয়ানমারকেন্দ্রিক সীমান্ত পরিস্থিতি এবং বঙ্গোপসাগরের বৃহত্তর নিরাপত্তা পরিবেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা সহযোগিতা, মানবপাচার, চোরাচালান ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় দীর্ঘদিনের সহযোগিতা রয়েছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয় প্রযুক্তিগত কাঠামোয় একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততা স্বাভাবিকভাবেই আঞ্চলিক পর্যায়ে নজর কাড়তে পারে। এখানে বিষয়টি বিদেশি প্রযুক্তি গ্রহণ করা উচিত কি না—এমন সরল প্রশ্ন নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, সংবেদনশীল তথ্য কোথায় থাকবে, কারা তা ব্যবহার করতে পারবে, বিদেশি প্রযুক্তিগত কর্মীদের কোনো কার্যকরী প্রবেশাধিকার থাকবে কি না এবং প্রয়োজন হলে এই ব্যবস্থা বাইরের কোনো তথ্যভান্ডারের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হবে।

সাইবার নিরাপত্তাও তাই প্রকল্পটির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হওয়া প্রয়োজন। বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও সমুদ্রবন্দর যদি একই ডিজিটাল ব্যবস্থায় যুক্ত হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থাই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় পরিণত হবে। একটি সফল সাইবার হামলা তখন শুধু একটি ইমিগ্রেশন কাউন্টার নয়, একাধিক সীমান্তকেন্দ্রকে একই সঙ্গে অচল করে দিতে পারে। একইভাবে নিরাপত্তা তালিকা বা জীবপরিচয়ভিত্তিক তথ্যভান্ডারে কারসাজি হলে নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক পরিণতি তৈরি হতে পারে। স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ভুল তথ্য বা পুরোনো উপাত্ত ভুল সতর্কতা তৈরি করতে পারে, যার ফলে নিরপরাধ কোনো ব্যক্তি অযথা নিরাপত্তা জিজ্ঞাসাবাদ বা অতিরিক্ত যাচাইয়ের মুখে পড়তে পারেন। তাই প্রযুক্তি-উৎপন্ন সতর্কবার্তাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং প্রশিক্ষিত কর্মকর্তার যাচাইযোগ্য একটি সহায়ক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত সিকিউরিপোর্টের প্রস্তাবকে শুধু ইমিগ্রেশন প্রযুক্তির একটি প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব ধরা পড়বে না। এটি একই সঙ্গে বাংলাদেশের তথ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা সক্ষমতা, সাইবার নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণ করতে পারে। বাংলাদেশের আধুনিক সীমান্ত ব্যবস্থার প্রয়োজন বাস্তব, এবং জীবপরিচয়ভিত্তিক পরিচয় যাচাই ও আগাম যাত্রী-তথ্যনির্ভর সমন্বিত ব্যবস্থা নিরাপত্তা ও দক্ষতা—দুই ক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে বাংলাদেশ প্রযুক্তিটি কতটা ব্যবহার করতে পারছে তার চেয়ে বেশি—প্রযুক্তিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ কতটা নিজের হাতে রাখতে পারছে তার ওপর। ২২ অক্টোবরের প্রস্তাব তাই শুধু সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব দেবে না; এটি দেখাবে, বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ঠিক কতটা গভীরে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সম্ভবত এটাই থাকবে—বাংলাদেশ কি একটি আধুনিক ডিজিটাল সীমান্ত তৈরি করছে, নাকি এমন একটি সীমান্ত-নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করছে, যার নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে দেশের বাইরে চলে যেতে পারে?

মন্তব্য

Scroll to Top