চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে বাংলাদেশে অন্তত ৫১৮ জন সাংবাদিক হামলা, হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। একই সময়ে রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার হওয়া ৫ হাজার ৬৪৪ জনের মধ্যে ৪ হাজার ৮২৭ জনই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থক। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির ২৮৮টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২৯৭ জন সাংবাদিক আহত, ৮৭ জন লাঞ্ছিত এবং ৭৭ জন হুমকির শিকার হয়েছেন। আটক হয়েছেন ২০ জন। এ ছাড়া সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর অধীনে ৫১ সাংবাদিককে আসামি করে ১৯টি মামলা করা হয়েছে।
এইচআরএসএসের হিসাবে, নয় মাসে রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৮৬ শতাংশই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থক। এ সময়ে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় অন্তত ২৭০টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৫ হাজার ৮০৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং আরও ৩২ হাজার ৪৩৩ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে ১৮৭ জন, রাজনৈতিক সহিংসতায় ৭৩ জন এবং কারাগারে ৯৫ বন্দির মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
দেশের ১৬টি জাতীয় দৈনিকের সংবাদ, সংগঠনটির নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে এইচআরএসএস।
সাংবাদিক নির্যাতন: নয় মাসেই আগের বছরের প্রায় সমান
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের পুরো বছরে সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির ৩১৮টি ঘটনায় ৫৩৯ জন সাংবাদিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই ২৮৮টি ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫১৮ জন।
অর্থাৎ, ২০২৫ সালের পুরো বছরে যত সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছিলেন, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই সেই সংখ্যার প্রায় ৯৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৯৭ জন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। লাঞ্ছিত হয়েছেন ৮৭ জন এবং হুমকির মুখে পড়েছেন ৭৭ জন। আটক হয়েছেন ২০ জন।
এ ছাড়া সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর অধীনে ১৯টি মামলায় ৫১ সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে।
সংগঠনটির মাসভিত্তিক পর্যবেক্ষণেও সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির ধারাবাহিকতা উঠে এসেছে।
সেপ্টেম্বর মাসে অন্তত ২০টি ঘটনায় ৩৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৬ জন আহত, ১২ জন লাঞ্ছিত এবং তিনজন হুমকির শিকার হয়েছেন। আটক হয়েছেন একজন।
২০ সেপ্টেম্বর যশোরের কেশবপুর প্রেসক্লাব দখলের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়দেব চক্রবর্তী ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ফুয়াদসহ কয়েকজন সাংবাদিক আহত হন।
এর আগে আগস্ট মাসে ৩২টি ঘটনায় ৪৫ জনের বেশি সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ২৬ জন আহত হন।
রাজনৈতিক সহিংসতায় ৭৩ জন নিহত, আহত ৬ হাজার ৪৭৩
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ১ হাজার ১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে ৭৩ জন নিহত এবং ৬ হাজার ৪৭৩ জন আহত হয়েছেন।
এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক সহিংসতার প্রায় ৯১ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং দলটির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৩৪২টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে ৪০ জন নিহত এবং ২ হাজার ৬৩২ জন আহত হয়েছেন।
বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে ৩২১টি সংঘর্ষে ১১ জন নিহত এবং ২ হাজার ১৯০ জন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ৯৩টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ৫৪৫ জন আহত হয়েছেন।
রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭৩ জনের মধ্যে ৪৬ জন বিএনপির, আটজন জামায়াতের এবং ছয়জন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন।
এই হিসাবে, রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ব্যক্তিদের অর্ধেকের বেশি প্রাণ হারিয়েছেন বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে।
২০২৫ সালের পুরো বছরে এইচআরএসএস ৯১৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করেছিল। সেসব ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত এবং ৭ হাজার ৫১১ জন আহত হন।
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা আগের বছরের মোট সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। তবে নিহতের সংখ্যা এখনো গত বছরের তুলনায় কম।
রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার ৫ হাজার ৬৪৪ জন, আওয়ামী লীগের ৪ হাজার ৮২৭
প্রতিবেদনে রাজনৈতিক মামলা ও গ্রেপ্তারের বিস্তারিত তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।
এইচআরএসএসের হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় অন্তত ২৭০টি মামলা হয়েছে।
এসব মামলায় ৫ হাজার ৮০৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও ৩২ হাজার ৪৩৩ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৫ হাজার ৬৪৪ জন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ৪ হাজার ৮২৭ জন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থক। মোট রাজনৈতিক গ্রেপ্তারের প্রায় ৮৬ শতাংশই তাঁরা।
অন্যদিকে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপির ৬০৯ জন এবং জামায়াতে ইসলামীর ১৪৫ জন নেতাকর্মী ও সমর্থক রয়েছেন।
এ ছাড়া রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়ার ৫৮টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে সংগঠনটি। এসব ঘটনায় ৪৩৯ জন আহত এবং ৪৬ জন আটক হয়েছেন।
রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের ওপর পৃথক ৮৮টি হামলার ঘটনায় ৫২ জন নিহত হয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মব সহিংসতায় ১৮৭ জন নিহত, ছাড়িয়েছে ২০২৫ সালের মৃত্যুর সংখ্যা
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে সারা দেশে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ৩৯৮টি ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১৮৭ জন নিহত এবং ৪০১ জন আহত হয়েছেন।
চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ব্যক্তিগত বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে এইচআরএসএস।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের পুরো বছরে মব সহিংসতার ২৯২টি ঘটনায় ১৬৮ জন নিহত হয়েছিলেন।
অর্থাৎ, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই মব সহিংসতায় মৃত্যুর সংখ্যা আগের পুরো বছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বেশি হয়েছে।
একই সঙ্গে ঘটনার সংখ্যাও বেড়েছে। গত বছরের ১২ মাসে ২৯২টি ঘটনার বিপরীতে চলতি বছরের নয় মাসেই ৩৯৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
প্রতিবেদনে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।
জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্বাচনসংক্রান্ত ৪০২টি সহিংসতার ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ২ হাজার ৬২৩ জন আহত হয়েছেন।
নির্বাচনের আগে ও পরে ৬ শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি এবং নির্বাচনি কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
সরকারি হিসাবে অপরাধ কমেছে, মানবাধিকার প্রতিবেদনে ভিন্ন চিত্র
এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা বৃদ্ধির তথ্য উঠে এলেও সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে বেশ কয়েকটি অপরাধের মামলা কমার চিত্র পাওয়া গেছে।
অক্টোবরে প্রকাশিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৬৫৯টি হত্যা মামলা হয়েছে।
সরকারি হিসাবে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের একই সময়ে হত্যা মামলা হয়েছিল ২ হাজার ৯১৩টি।
সেই তুলনায় চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে হত্যা মামলা কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা ৫৩৮টি থেকে কমে ৩৮৭টিতে নেমেছে। এ ক্ষেত্রে হ্রাসের হার প্রায় ২৮ শতাংশ।
একই সময়ে সিঁধেল চুরি বা চুরিসংক্রান্ত একটি শ্রেণির মামলা ১ হাজার ৪৮৩টি থেকে কমে ১ হাজার ৩৭৪টি হয়েছে।
নারী নির্যাতনসংক্রান্ত মামলা ৯ হাজার ২৬২টি থেকে কমে ৮ হাজার ১৭৮টি এবং শিশু নির্যাতনের মামলা ৩ হাজার ৫৯১টি থেকে কমে ৩ হাজার ১৫১টি হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সরকারি অপরাধ পরিসংখ্যান ও এইচআরএসএসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণের তথ্য সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে, এইচআরএসএস সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনা, নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য নথিভুক্ত করে।
ফলে কোনো অপরাধের মামলা কমার অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট সব ধরনের সহিংসতা বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও একই হারে কমেছে।
কারাগারে ৯৫ বন্দির মৃত্যু, ২০ জন আওয়ামী লীগের
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৯৫ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে।
তাঁদের মধ্যে ৪০ জন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি এবং ৫৫ জন বিচারাধীন হাজতি।
মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের ২০ জন, বিএনপির একজন এবং রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ নেই এমন ৭৪ জন বন্দি রয়েছেন।
এই হিসাবে, কারাগারে মারা যাওয়া বন্দিদের প্রায় ৫৮ শতাংশই ছিলেন বিচারাধীন।
কারাগারের মৃত্যুর বাইরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে এবং নির্যাতনের অভিযোগসংক্রান্ত ঘটনায় আরও ১২ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত করেছে এইচআরএসএস।
এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে দুজন এবং বন্দুকযুদ্ধ হিসেবে বর্ণিত ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন।
বাহিনীর ধাওয়া খেয়ে পালানোর সময় পৃথক ঘটনায় আরও অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
কারাগারে ৯৫ বন্দির মৃত্যুর হিসাব থেকে এসব ঘটনা আলাদাভাবে দেখানো হয়েছে।
নয় মাসে ২ হাজার ৪০৪ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ২ হাজার ৪০৪ জন নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
তাঁদের মধ্যে অন্তত ৬৫৭ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৯২ জনের বয়স ১৮ বছরের কম।
একই সময়ে ১৩০ নারী ও কন্যাশিশু সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৯ জনকে।
এ ছাড়া ৬৯৬ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।
পারিবারিক সহিংসতায় ৪৫৭ জন নারী নিহত এবং ২৭৯ জন আহত হয়েছেন। এ সময়ে ২১৯ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিশু নির্যাতনের ঘটনাও ব্যাপকভাবে নথিভুক্ত করেছে সংগঠনটি।
নয় মাসে ১ হাজার ৮১০ শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৪৯৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের প্রতিবেদনে এইচআরএসএস জানিয়েছিল, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১ হাজার ৬২১ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪২ জন। সেই তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৫৬ শতাংশ বেড়েছিল।
ওই ছয় মাসে ৪০৪ জন ধর্ষণের শিকার হন, যাঁদের মধ্যে ২৩৮ জন ছিলেন শিশু ও কিশোরী।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা আগের বছরের দ্বিগুণ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ৬২ জন আহত হয়েছেন।
এসব ঘটনায় ২১টি মন্দির, ২০টি প্রতিমা এবং ৪৭টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে।
এ ছাড়া ভূমি দখলসংক্রান্ত ঘটনা এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনাসহ চারটি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে সংগঠনটি।
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের পুরো বছরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ২৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছিল।
সেসব ঘটনায় একজন নিহত এবং ১৬ জন আহত হয়েছিলেন। হামলা ও ভাঙচুরের শিকার হয়েছিল ছয়টি মন্দির, ৩৭টি প্রতিমা এবং ৩৮টি বসতবাড়ি।
গত বছরের পুরো সময়ের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই সংখ্যালঘুদের ওপর নথিভুক্ত হামলার সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে।
শ্রমিক নির্যাতনের ৫৮২ ঘটনায় নিহত ১৪৫
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে শ্রমিক নির্যাতনের ৫৮২টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে এইচআরএসএস।
এসব ঘটনায় ১৪৫ জন শ্রমিক নিহত এবং ১ হাজার ২৬৩ জন আহত হয়েছেন।
এর বাইরে কর্মক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রীর অভাব এবং বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আরও ৩৯০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
দুই ধরনের ঘটনায় মোট ৫৩৫ জন শ্রমিকের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
২০২৫ সালের পুরো বছরে শ্রমিক নির্যাতনের ৩৫৯টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছিল সংগঠনটি। সেসব ঘটনায় ৯৬ জন নিহত এবং ১ হাজার ২১ জন আহত হয়েছিলেন।
সেই হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা গত বছরের পুরো সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন নদী, খাল, বন-জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে ৪৯১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব মরদেহ উদ্ধারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪৬৫টি সন্দেহজনক হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে সংগঠনটি।
ভারত সীমান্তে ১৩ জন নিহত, মিয়ানমার সীমান্তেও হতাহত
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪৩টি হামলা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
এসব ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ৩৯ জন আহত হয়েছেন।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তেও সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে সংগঠনটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় ২৪টি ঘটনায় একজন নিহত, ছয়জন আহত এবং ৮৩ জন আটক হয়েছেন।
এ ছাড়া আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা বলে অভিযোগ ওঠা স্থলমাইন বিস্ফোরণে আরও আটজন নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছেন।
তবে এসব স্থলমাইন স্থাপনের জন্য কারা দায়ী, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি রাজনৈতিক ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, মব সহিংসতা, সাংবাদিক নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, নারী ও শিশু নির্যাতন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, শ্রমিকদের অনিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং হেফাজত ও কারাগারে মৃত্যুর ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
এসব সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেন ইজাজুল ইসলাম।

মন্তব্য