মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | Columbus |
| Columbus
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

বাংলাদেশের তিন সাংবাদিক এবার ট্রাইব্যুনাল মামলার জালে, প্রশ্নের মুখে স্বাধীন সাংবাদিকতা

- ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০৪:২৯ পূর্বাহ্ন

ঢাকা, ১৮ আগস্ট – বাংলাদেশের  তিন বিশিষ্ট সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল হক বাবু ও ফারজানা রুপাকে নতুন করে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, যে তারা ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কথিত উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে অপরাধ করেছেন।

আইন ও আদালত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের সংবিধানসম্মত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকারের সুরক্ষাকে বড়মাপে প্রশ্ন বিদ্ধ করেছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দীর্ঘ সময় ধরে তিন সাংবাদিকই কারাবন্দি রয়েছেন, যদিও তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট মামলায় না জামিন, না বিচার; কিছুই করা হয়নি। একই সময়ে সমালোচকদের একটি অংশ অভিযোগ করে আসছেন, ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রতীক, প্রতিষ্ঠান ও গৌরবময় ইতিহাসের বয়ানকে ক্রমেই মুছে দেওয়া হয়েছে, সে ধারাতেই স্বাধীনতার স্বপক্ষের এই সকল খ্যাতিমান সাংবাদিকদের কারাগারে আটকে রেখে শাস্তির পদক্ষেপ নিয়েছে।

বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলেও তিন সাংবাদিক এখন নতুন একটি আইনি জটিলতার মুখোমুখি হয়েছেন। সোমবার প্রসিকিউশনের আবেদনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ সংশ্লিষ্ট কারা কর্তৃপক্ষকে আগামী ২৪ আগস্ট শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল হক বাবু ও ফারজানা রুপাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন।

ট্রাইব্যুনালে হাজির করার পর এই মামলায় তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হতে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই মামলা কি কথিত উসকানির জন্য আইনগত জবাবদিহির অংশ, নাকি এর মাধ্যমে সাংবাদিকতা, রাজনৈতিক মতপ্রকাশ এবং ভিন্নমতের পরিসর আরও সংকুচিত করার প্রয়াস?

‘বিকল্প বয়ান’ তৈরির অভিযোগ প্রসিকিউশনের

প্রসিকিউশনের দাবি, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে গণভবনে অনুষ্ঠিত একটি সংবাদ সম্মেলনে তিন সাংবাদিক মামলায় উল্লেখ করা অপরাধে প্ররোচনা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিলেন।

শেখ হাসিনার চীন সফর নিয়ে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে কোটা আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি ‘রাজাকার’ শব্দটি ব্যবহার করে মন্তব্য করেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ওই মন্তব্যকে অবমাননাকর হিসেবে বর্ণনা করেন। এর পর ওই রাত থেকেই বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু হয়।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ১৪ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত তিন সাংবাদিক ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে একটি ‘বিকল্প বয়ান’ তৈরিতে ভূমিকা পালন করেন।

মামলার নথি অনুযায়ী, ওই সময়ে মোজাম্মেল হক বাবু একাত্তর টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক এবং ফারজানা রুপা একই প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। শ্যামল দত্ত ছিলেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।

তবে ট্রাইব্যুনালের সর্বশেষ আদেশটি এখনো অভিযোগের পর্যায়ে রয়েছে এবং এসব অভিযোগের বিচারিক সত্যতা নির্ধারণ হয়নি। এই মামলায় তিন সাংবাদিক এখনো দোষী সাব্যস্ত হননি। তাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, তা শেষ পর্যন্ত উপস্থাপিত প্রমাণ, আইন এবং বিচারিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে।

আরেকটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাতেও বিচারাধীন

মোজাম্মেল হক বাবু ও ফারজানা রুপা ২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বর ও নারায়ণগঞ্জে হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের ওপর সেসময়ের আওয়ামী লীগ সরকারের কথিত দমন-পীড়নের অভিযোগে দায়ের করা আরেকটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাতেও বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন। কোনো প্রমান ছাড়াই হেফাজত দাবি করে, সে রাতে তাদের দু হাজারের বেশী কর্মীদের হত্যা করে গুম করা হয়েছে।

সংবিধানে মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা

এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সাংবিধানিক সীমা।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। একই অনুচ্ছেদ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকেও স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা এবং সংবিধানে নির্ধারিত অন্যান্য স্বার্থে আইনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতার সুযোগও রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সাংবাদিকদের কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়মুক্তি দেয় না। যদি কোনো ব্যক্তির কর্মকাণ্ড প্রচলিত আইনে নির্দিষ্ট অপরাধের আইনি মানদণ্ড পূরণ করে, তাহলে তার বিচার হতে পারে।

কিন্তু একই সঙ্গে কোনো বিতর্কিত রাজনৈতিক মত, সংবাদ পরিবেশনের ধরন, সম্পাদকীয় অবস্থান কিংবা সরকারের সমালোচনা—এসব বিষয়কে একা কোনো অপরাধের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় কি না, সেটিও একটি মৌলিক প্রশ্ন।

মুক্তিযুদ্ধের বয়ান ও রাজনৈতিক ভিন্নমতের প্রশ্ন

তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলার রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও গভীর বলে প্রতীয়মান হয়, যখন বিষয়টি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে যুক্ত বৃহত্তর বিতর্কের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়।

এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট রাখা জরুরি—নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য আইনগতভাবে কাউকে জবাবদিহির আওতায় আনা এক বিষয়, আর কোনো রাজনৈতিক মত বা ঐতিহাসিক অবস্থানকে অপছন্দনীয় মনে করে সেই কণ্ঠকে স্তব্ধ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

প্রথমটি প্রমাণ ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে ন্যায়বিচারের অংশ হতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয়টি হলে তা গণতান্ত্রিক অধিকার ও সাংবিধানিক স্বাধীনতার জন্য একটি গুরুতর প্রশ্ন সৃষ্টি করবে।

মন্তব্য

Scroll to Top