শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ | Boydton |
| Boydton
দ্য ভয়েস নিউজ
কূটনীতি, রাজনীতি ও নীতি — কাছ থেকে
সর্বশেষ

রিকশা থেকে নামতেই মায়ের সামনে গুলি করে হত্যা গৃহবধূকে, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ

- ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৬ পূর্বাহ্ন

খুলনা মহানগরীর লবণচরা এলাকায় মায়ের সামনে গুলি করে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুশি বেগম (২৫) নামের এক গৃহবধূকে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে জিন্নাহপাড়ার বউবাজার এলাকার ৭ নম্বর গলির মুখে এ ঘটনা ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

নিহত খুশি দুই সন্তানের জননী। পুলিশ বলছে, তাঁর স্বামী সুমন হাওলাদার ওরফে ব্লেড বাবুর সঙ্গে মাদক ব্যবসা নিয়ে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। হত্যার কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যায় বাজার শেষে মায়ের সঙ্গে রিকশায় করে বাসায় ফিরছিলেন খুশি। গলির মুখে রিকশা থেকে নামার পর মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে স্বামীর খোঁজ জানতে চান। খুশি স্বামী কোথায় গেছেন, তা জানেন না বলে জানান। এ সময় তাঁর পেছনে থাকা এক ব্যক্তি গুলি করেন। পরে কাছ থেকে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে আরও একবার গুলি করা হয়। খুশি মাটিতে পড়ে গেলে অপর ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁকে কোপান।

স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়। পরে মায়ের সহায়তায় স্থানীয় বাসিন্দারা খুশিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

খুশির মা জানান, হামলাকারীদের একজন তাঁর মেয়েকে গুলি করেন এবং অন্যজন ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেন। পরে তিনি শুনেছেন, হামলাকারীরা আশিক গ্রুপের সদস্য। মেয়ের হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার দাবি করেন তিনি। তবে হামলাকারীদের পরিচয় ও হত্যাকাণ্ডে কোনো গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

লবণচরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সৈয়দ মোশারেফ হোসেন জানান, খুশির মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। খুশি ও তাঁর স্বামী মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে মাদকসংক্রান্ত মামলা রয়েছে বলে জানান তিনি।

পুলিশ সদস্যদের রাতে একা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা

খুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গত ১০ অক্টোবর প্রকাশিত প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ছিনতাইকারীদের হামলায় এক পুলিশ পরিদর্শক গুরুতর আহত হওয়ার পর রাতে একা চলাচল না করতে জেলা পুলিশের সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়।

জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার পুলিশ সুপারের স্বাক্ষরে জারি করা দাপ্তরিক চিঠিতে চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সাম্প্রতিক অপরাধ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার বিষয় উল্লেখ করা হয়। বিশেষ অভিযানসহ অন্যান্য দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাতে একা চলাচল থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ইউনিট ইনচার্জদেরও বলা হয়।

নির্দেশনাটি রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় চলমান বিশেষ অভিযানসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আনে।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৮ অক্টোবর দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে রূপসায় বিশেষ অভিযান শেষে ফেরার পথে খুলনা নগরের খানজাহান আলী সড়কে খুলনা কলেজিয়েট স্কুলের সামনে ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হন পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলম (৪৩)। রিকশায় করে ফেরার সময় তিন ছিনতাইকারী তাঁর পথরোধ করে টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয়। বাধা দিলে ধারালো চাপাতি দিয়ে তাঁর দুই হাতের কবজিতে কোপ দেওয়া হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়।

খুলনার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ সদস্যরা যাতে দায়িত্ব শেষে একা চলাচলের সময় ছিনতাইকারীদের কবলে না পড়েন, সে জন্য সতর্কতামূলক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি চিঠিটিকে পুলিশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।

ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের পর বিশেষ অভিযান

খুলনা জেলা পুলিশ গত ৬ অক্টোবর থেকে অপরাধী গ্রেপ্তার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান শুরু করে। এর আগে রূপসায় ছেলে জয় ঢালী হত্যার প্রায় দেড় মাস পর তাঁর বাবা আক্তার ঢালীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। দিঘলিয়ার ফরমাইশখানা এলাকায় একটি চায়ের দোকানেও এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে।

নগরীতে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় বি-কোম্পানি, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, আরমান গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ, নাসিম গ্রুপ, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ ও টেংকি শাওন গ্রুপের নাম বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, দীর্ঘদিনের দুর্বল নজরদারির সুযোগে এসব গোষ্ঠী বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেছে। এতে নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবকটির বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পুলিশের দাবি, বিশেষ অভিযান ও নজরদারি জোরদারের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। গত ২৩ জুন লবণচরা এলাকা থেকে পারভেজ গাজী (৩২) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, তিনি আশিক গ্রুপের একজন শীর্ষ শুটার।

খুশি বেগম হত্যাকাণ্ডের পর নগরীর নিরাপত্তাব্যবস্থা, অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা এবং পুলিশের চলমান অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তের মাধ্যমে হত্যার প্রকৃত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এখন পুলিশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

মন্তব্য

Scroll to Top