কক্সবাজারের ইনানীতে একটি পর্যটন রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১০ পর্যটক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। নিহতদের অধিকাংশ নারী এবং একাধিক শিশু রয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় অবস্থিত টুপটাপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে এ অগ্নিকাণ্ড ঘটে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দোলন আচার্য ঘটনাস্থল থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
অগ্নিকাণ্ডের পর উদ্ধার অভিযান চলাকালে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কক্সবাজার অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ জানান, রিসোর্টের একটি কক্ষে আরও কয়েকজন আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আগুনে পুড়ে যায় তিনতলা রিসোর্ট
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে অবস্থিত তিনতলা রিসোর্টটিতে শনিবার সকাল সাতটার দিকে আগুন লাগে।
কাঠসহ সহজে দাহ্য বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে নির্মিত ভবনটিতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় রিসোর্টে অবস্থানরত পর্যটকদের অনেকে বের হতে পারলেও কয়েকজন ভেতরে আটকা পড়েন।
আগুনে রিসোর্টটির বড় অংশ পুড়ে যায়। কয়েকজনের মরদেহ এতটাই দগ্ধ হয়েছিল যে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, সকাল আনুমানিক ৭টা ২৫ মিনিটে তাঁরা অগ্নিকাণ্ডের খবর পান।
ঘটনাস্থল থেকে নিকটবর্তী ফায়ার স্টেশনের দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার হওয়ায় অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে।
ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট সকাল আটটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। বেলা ১১টার দিকে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করা হয়।
উদ্ধার অভিযানে ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ, কোস্টগার্ড ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা অংশ নেন।
একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু
অগ্নিকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন রয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্বজনদের সঙ্গে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা আশিকুল ইসলাম রিসোর্টের দ্বিতীয় তলা থেকে লাফ দিয়ে প্রাণে বেঁচে যান। তবে তাঁর স্ত্রী ইশরাত জাহান মালিহা ও স্ত্রীর ছোট বোন লায়লা জাহান নাবিলা আগুনে নিহত হন।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে সাতজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইশরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিস্তা মিম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) ও পাঁচ বছর বয়সী ফাইজান আহমেদ এবং আশুলিয়ার নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৮)।
প্রাথমিকভাবে বাকি তিনজনের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।
আহত ছয়জন হাসপাতালে
অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জনকে কক্সবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়।
তাঁরা হলেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দিন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সাবুকতাগিন মাহমুদ সোহেল জানান, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজনের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
অপর একজন পড়ে গিয়ে আঘাত পান। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
চার মাস আগে সতর্ক করেছিল ফায়ার সার্ভিস
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর অনিয়মের তথ্য সামনে আসে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনায়েদ জানান, গত জুন মাসে রিসোর্টটি পরিদর্শন করে অগ্নিনিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন ত্রুটি চিহ্নিত করা হয়েছিল।
ওই সময় কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে নোটিশও দেওয়া হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছাড়াই রিসোর্টটি পরিচালিত হচ্ছিল।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বলেন, রিসোর্টটি অগ্নিনিরাপত্তার বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করছিল না।
রিসোর্টটির নিচতলায় রেস্তোরাঁ ও রান্নার ব্যবস্থা ছিল। ওপরের তলাগুলো পর্যটকদের থাকার জন্য ব্যবহার করা হতো।
তবে ঠিক কী কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ নির্ধারণে বিস্তারিত তদন্ত প্রয়োজন বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক।
তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় কাঠসহ দাহ্য উপকরণ দিয়ে নির্মিত অনেক রিসোর্ট প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে।
এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানান তিনি।
একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট পর্যটন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক।
রিসোর্টের ব্যবস্থাপক আটক, তদন্ত কমিটি গঠন
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় টুপটাপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুমনকে আটক করেছে পুলিশ।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার শনিবার বিকেলে তাঁকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান এবং হতাহতের ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে প্রশাসন।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এ মান্নান জানান, আগুনের সূত্রপাতের কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তদন্তের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং রিসোর্ট পরিচালনায় অগ্নিনিরাপত্তাসংক্রান্ত বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।

মন্তব্য