ঢাকা, ১৬ আগস্ট — দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ শিক্ষকের বিরুদ্ধে চলমান সব ধরনের তদন্ত ও শাস্তিমূলক কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পাবলিক ইউনিভার্সিটি প্রগ্রেসিভ টিচার্স’ সোসাইটি। সংগঠনটির অভিযোগ, একটি ‘ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ সংবাদ প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই এসব তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, সম্প্রতি একটি অনলাইন পোর্টালে ‘শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ২২ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ শিক্ষকের গোপন তৎপরতা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সংগঠনটির দাবি, ওই প্রতিবেদনে অসংখ্য তথ্যগত ভুল, অসঙ্গতি এবং মনগড়া তথ্য রয়েছে। এ বিষয়ে প্রমাণসহ তারা ইতোমধ্যে আপত্তি জানিয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
২২ বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্তের উদ্যোগ
শিক্ষক সংগঠনটি জানিয়েছে, ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে তথ্য অনুসন্ধান কমিটি গঠন এবং তদন্ত শুরু হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
সংগঠনটির অভিযোগ, কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তাদের রাজনৈতিক পরিচয়, আদর্শগত অবস্থান কিংবা অতীত রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ চলছে।
এসব পদক্ষেপকে সংগঠনটি ‘অগণতান্ত্রিক, প্রতিহিংসামূলক এবং ন্যায়বিচারের মূলনীতির পরিপন্থী’ বলে অভিহিত করেছে।
‘সংবাদ প্রতিবেদন শাস্তির ভিত্তি হতে পারে না’
কোনো অযাচাইকৃত সংবাদ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শিক্ষকদের হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রশাসনিক ব্যবস্থা কিংবা শাস্তিমূলক কার্যক্রমের মুখোমুখি করা উচিত নয় বলে জানিয়েছে শিক্ষক সংগঠনটি।
তাদের বক্তব্য, কোনো শিক্ষকের রাজনৈতিক মতাদর্শ, অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কিংবা ব্যক্তিগত মতপার্থক্য একা তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ভিত্তি হতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ।
সংগঠনটি রাজনৈতিক পরিচয় বা অযাচাইকৃত অভিযোগের ভিত্তিতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং প্রমাণভিত্তিক তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
একাডেমিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবস্থা নেওয়া হলে এর প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে সতর্ক করেছে সংগঠনটি।
তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তচিন্তা, জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, যুক্তিবাদ ও মতপ্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সেখানে ভয়ভীতি বা হয়রানির পরিবেশ তৈরি হলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম, গবেষণা এবং সামগ্রিক একাডেমিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ওপরও।
একটি সুস্থ ও কার্যকর বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ বজায় রাখতে একাডেমিক স্বাধীনতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করা অপরিহার্য বলে সংগঠনটি উল্লেখ করেছে।
‘আমাদের কার্যক্রম গোপন নয়’
বাংলাদেশ পাবলিক ইউনিভার্সিটি প্রগ্রেসিভ টিচার্স’ সোসাইটি নিজেদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংগঠনটি বলেছে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
তাদের দাবি, সংগঠনের কর্মকাণ্ড সবসময়ই শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ ছিল। ফলে এসব কর্মকাণ্ডকে ‘গোপন তৎপরতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আইনসম্মত রাজনৈতিক বা আদর্শগত কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অসদাচরণ কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কারণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
ছয় দফা দাবি
বিবৃতিতে সংগঠনটি ছয়টি দাবি উত্থাপন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ৪০৪ শিক্ষকের বিরুদ্ধে চলমান সব রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্ত ও শাস্তিমূলক কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করা।
এ ছাড়া মিথ্যা, ভিত্তিহীন বা অপ্রমাণিত অভিযোগের ভিত্তিতে গঠিত তথ্য অনুসন্ধান কমিটি বাতিল এবং কেবল অযাচাইকৃত সংবাদ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শিক্ষকদের হয়রানি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে।
শিক্ষকদের রাজনৈতিক পরিচয়, আদর্শগত বিশ্বাস কিংবা অতীত রাজনৈতিক অবস্থানকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার না করারও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, একাডেমিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শিক্ষকদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
শিক্ষক অধিকার রক্ষায় বৃহত্তর সমাজের প্রতি আহ্বান
তদন্তের মুখে থাকা শিক্ষকদের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তার পক্ষে সোচ্চার হতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, মানবাধিকারকর্মী, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিবৃতিতে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দমন-পীড়নের এই চক্র বন্ধ করুন’— এমন আহ্বান জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আরও বেশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের দাবি জানানো হয়েছে।
সংগঠনটির বক্তব্য, শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক মতপার্থক্য কিংবা অতীত রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এবং ন্যায়সংগত প্রশাসনিক প্রক্রিয়াই কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ভিত্তি হওয়া উচিত।

মন্তব্য